আর বর্তমানে সে জায়গা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যে সব ভয়ঙ্কর বিপদজনক ঘটনা ঘটেছে–তার আদ্যোপান্ত বিবরণ উল্লেখ করছি। উপযাচক হয়ে যে কাজটা আমি হাতে নিয়েছি, তা যে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হব, আমাকে যারা জানেন চেনেন তাদের মনে এ ব্যাপারে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে করি না।
বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি আর মুদ্রার ওপর নির্ভর করে আমি এ-কথা রীতিমত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি ভন্ডারভিট্টিমিটি নগরটার পরিস্থিতি সম্প্রতিকালে যেমন লক্ষিত হচ্ছে সুপ্রাচীনকালেও পরিস্থিতি একইরকম ছিল। বর্তমানে কিছুমাত্রও হেরফের হয়েছে বলে মনে হয় না।
তবে এ-কথাও সত্যি যে, নগটরটার উৎপত্তিকাল সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো ধারণা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু এটুক অন্তত বলা যেতে পারে, নগরটার প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে যে কোনো সুদূর অতীতের কাল্পনিক চিত্র মনে মনে এঁকে নেওয়া যেতে পারে। তবে এ-কথা অবশ্যই মনে করে নেওয়া যেতে পারে সম্প্রতি নগরটার অবস্থা যেমন নজরে পড়ছে, চিরদিন একই রকম অবস্থা ছিল। কেবলমাত্র আমার কথাই বা বলি কেন? নগরের প্রাচীনতম বাসিন্দাটিও নগরটার কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধনের কথা স্মৃতিতে আনতে পারেন না। উপরন্তু এ নগরটার কোনোরকম পরিবর্তন যে ঘটা সম্ভব, এমন কোনো কথাকেও অপমানজনকই জ্ঞান করেন।
যাক গে, যে কথা বলতে চাচ্ছি, জায়গাটা পরিপূর্ণ বৃত্তাকার একই উপত্যকায় অবস্থান করছে। সিকি মাইলের কাছাকাছি এর পরিধি। আর শান্ত পাহাড়ের ঘেরা, সবুজে ঢাকা এক মনোরম পরিবেশ নগরটাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে।
পাহাড়গুলোর চূড়া খুবই উঁচু আর রীতিমত খাড়াই। আর সে সঙ্গে গভীর পার্বত্য বনানীর বাধা বন্ধনের সমস্যা তো আছেই। হয়তো বা এই কারণেই স্থানীয় বাসিন্দারা সাহসে ভর করে কোনোদিনই পাহাড়গুলোর চূড়ায় উঠতে উৎসাহি হয়নি। পাহাড়গুলোর দুর্গমতা ছাড়াও তার আর একটা ধারণাকে গুরুত্ব দিয়েই ও-পথ কোনোদিন মাড়ায়নি। তাদের বিশ্বাস পাহাড়গুলোর বিপরীত দিকে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
সমতল উপত্যকাটাকে কেন্দ্র করে চারিদিকে ছোট ছোট ষাটটা বাড়ি অবস্থান করছে। রাস্তাঘাট পাথরের, মনে হয় টালি বিছিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
সবগুলো বাড়িই পাহাড়কে পিছনে রেখে তৈরি, আর সামনের অঞ্চলটা বাড়ির প্রথম ফটক থেকে ঠিক ষাটগজ দূরে গাছগাছালির সমন্বয়ে তৈরি একটা করে সূর্যঘড়ি।
সবগুলো বাড়ির গঠনশৈলী অবিকল একইরকম। আর প্রাচীনত্বের জন্য নগরটার ভাস্কর্যশৈলী কিছুটা বিচিত্র প্রকৃতির হলেও বাড়িগুলোর সৌন্দর্য কিছুমাত্রও বিঘ্নিত হয়নি।
কড়া করে পোড়ানো ইট স্তরে স্তরে সাজিয়ে বাড়িগুলোর দেওয়াল গাঁথা হয়েছে। তাদের রং লাল আর চারদিক বিশিষ্ট। ইটের বিচিত্র রংয়ের জন্যই বাড়িগুলো কালো রং দেখলে মনে হয়, বড়সড় দাবার ঘুটি বুঝি বসিয়ে রাখা হয়েছে। প্রতিটা বাড়ির কার্নিশ সমান উচ্চতায় অবস্থিত আর পাশপালিগুলো সামনের দিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জানালাগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট আর তাদের গায়ে বড় বড় কাঁচ ব্যবহার করা হয়েছে। আর কাঠের আসবাবপত্রগুলোর গায়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য করা। হাতের কাজ এতই সূক্ষ্ম যে, যে কোনো শিল্পরসিকের বিস্ময়ের উদ্রেক করার ক্ষমতা রাখে। তবে সে সব কারুকার্যের মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য অবশ্যই নজরে পড়বে। এর কারণও রয়েছে যথেষ্টই। ব্যাপারটা হচ্ছে, সুদূর অতীত স্মরণাতীত কাল থেকে ভান্ডারভট্টিমিটিস নগরের কাঠমিস্ত্রি খোদাইকারকরা সব জায়গায় এবং সব সময় দুটোমাত্র চিত্রই খোদাই করেছে। তাদের মধ্যে একটা হচ্ছে, বাঁধাকপি আর দ্বিতীয়টা ঘড়ি। তবে স্বীকার করতেই হবে, এ কাজটায় তারা খুবই দক্ষ, চমৎকার করে।
এদিকে বাড়িগুলোর বাইরের দিক যেমন লক্ষ্যণীয় ঠিক তেমনই ভেতরের অংশও কম আকর্ষণীয় নয়। যাবতীয় আসবাবপত্র একই পরিকল্পনা মাফিক তৈরি। প্রত্যেক মেঝে একই রকম চতুষ্কোণ টালি বসিয়ে বসিয়ে তৈরি। আসবাবপত্রগুলো একই রকম আবলুস কাঠের মতো কালো কাঠ দিয়ে তৈরি আর পাগুলো সরু ও বাঁকানো।
এমনকি চুল্লির তারগুলো পর্যন্ত সমান চওড়া আর সবগুলোই একই উচ্চতা বিশিষ্ট। তার সেগুলোর প্রত্যেকটার গায়ে যে কেবলমাত্র বাঁধাকপি আর ঘড়িই খোদাই করা আছে তাই নয়, মধ্যস্থলে, সবচেয়ে ওপরে একটা করে সত্যিকারের ঘড়ি রক্ষিত আছে। আর সে ঘড়ি অদ্ভুত আওয়াজ করে করে বাজে।
আর প্রত্যেক ঘড়ি আর বাঁধাকপির মাঝখানে রক্ষিত আছে একজন করে চীনা মানুষের মূর্তি। সেটা দাঁড়ানো আর ভুড়িটা ইয়া বড়। আরও আছে। লোকটার ভুড়ির গর্তটার ভিতর দিয়ে একটা ঘড়ির ডায়ালপেট নজরে পড়ে। মোদ্দা কথা, ঘড়ির ভেতরের সবকিছুই বিচিত্র ধরনের।
এবার চুল্লিগুলো সম্বন্ধে কিছু বলা যাক। সেগুলো বেশ বড়সড় আর গভীরতাও যথেষ্টই। চুল্লির ভেতরের গর্তে অনবরত লকলকে আগুন জ্বলে চলেছে। সে আগুনের ওপরে একটা বড় পাত্র বসানো। ভেতরে মাংস রয়েছে–সিদ্ধ হচ্ছে।
বাড়ির মানুষগুলোর মধ্যে গৃহকত্রী সবচেয়ে ভালো। ভালো মানুষ যাকে বলে তিনি ঠিক তাই। তিনি সব সময়ই কাজের মধ্যে ডুবে থাকেন। তিনি মোটাসোটা ও বেটে খাটো আর বুড়ি। তার মুখটা, বিশেষ করে গাল দুটো লাল আর চোখের মণি দুটো নীল।
