আমার ভাষা একেবারেই গ্রাম্য লন্ডনের নিচের তলার ভাষা ঠিক যেমনটা হয়ে থাকে।
সে রূপসি ছিল আমার থেকে বেশ কিছুটা দূরে। এতদূর থেকে কথা বলা সম্ভব নয়, দরকারও নেই। চোখের ইশারায়ই কাজ সারতে হলো।
আমার চোখের দিকে চোখ পড়তেই আমার পাড়ার রূপসির দুচোখের পাতা পতপত করে উঠল।
আমি তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে একইভাবে তাকিয়েই রইলাম।
রূপসি ইতিমধ্যে চোখে একটা আতস কাঁচ লাগিয়ে ভালোভাবে আমাকে দেখে নিল। তারপর ঝট করে জানালা থেকে সরে গেল।
গর্বে আমার বুক ফুলে এত উঁচু হয়ে গেল। কম কথা! প্রথম দর্শনেই, এক নজরেই বাজিমাত করে ফেলেছি, গর্ব হওয়ার তো কথাই বটে।
পরদিন সকাল হলো।
আমি একটু আগেই বিছানা ছেড়ে নেমেছি।
এমন সময় আমার ঘরের দরজার কড়া নড়ে উঠল।
দরজা খুলতেই দেখি, তিন ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এক ফরাসি ভদ্রলোক হাসিমুখে দরজায় দাঁড়িয়ে।
আমি কিছু বলার আগেই সে তার আগমনের কারণ জানাল। সে রূপসির সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। আমি যারপরনাই আশান্বিত ও উল্লসিত হলাম। বাঁধনহারা আনন্দের মধ্যে আমি নিজের ছয়ফুট তিন ইঞ্চি উচ্চতার দেহটাকে ঝটপট সাজিয়ে নিলাম। ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে আগন্তুকের সঙ্গে সে রূপসির বাড়ির দরজায় হাজির হলাম।
দেখলাম, আমার বাঞ্ছিতা রূপসি একটা সোফার ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘর আলো করে বসে রয়েছে। মুখে মিটিমিটি হাসির ঝিলিক।
আমি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে অভিবাদন জানিয়ে তার বা-দিকে ধপাস করে বসে পড়লাম।
আমি বসতে না বসতেই বেটেখাট ফরাসিটাও তার ডানদিকে বসে পড়ল।
তার ধৃষ্টতা দেখে আমি রেগে একেবারে আগুন হয়ে গেলাম। কটমট করে তার মুখের দিকে তাকালাম। আমি মুখে কিছুই বললাম না। কারণ, আমি তো একজন সম্ভ্রান্ত ঘরের পুরুষ মানুষ। হৈ-হল্লা করে তো আমার মানায় না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগলাম।
আমি এবার রূপসির দিকে ফিরলাম। তার দিকে চোখ ও মন নিবদ্ধ করলাম। দু চারটি মিঠে কথা বলার পর তার বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলটা আমার হাতের মুঠোর মধ্যে নিলাম। কিন্তু যেই না আঙুলটাকে আলতোভাবে একটা মোচড় দিলাম, অমনি রূপসি অতর্কিতে এক হেঁচকা টানে আমার হাতের মুঠো থেকে নিচের আঙুলটাকে টেনে নিল।
আমি সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলাম।
সে চোখের তারায় তিরস্কারের সুস্পষ্ট ছাপ এঁকে কটমট করে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমাকে কাঁচাই গিলে খাবে।
না, আমারই ভুল হয়েছে। তার চোখের ভাষা আমি বুঝতে ভুল করেছি। তার আঙুল মুচড়ে দেওয়ার জন্য সে আমার দিকে এমন করে তাকায়নি।
তবে? আকস্মাৎ তার মধ্যে এমন ভাবান্তর ঘটল কেন?
আসলে সে বলতে চাইছে, যা করতে মন চায় কর না কেন, আপত্তি নেই, কিন্তু তাই বলে এ হতচ্ছাড়া ফরাসিটার সামনে! ছি! লজ্জা শরম বলে কিছু নেই!
আমি তার মনের কথা বুঝতে পারলাম।
ব্যস, এক মুহূর্তও দেরি না করে আমি সোফার পিছনের দিকে ডান হাতটা চালান দিয়ে দিলাম।
হ্যাঁ, যা ভেবেছি, তা-ই ঘটল। উদ্দেশ্য সিদ্ধ হলো।
রূপসি ইতিমধ্যেই তার ডান হাতের কড়ে আঙুলটাকে সোফার পিছন দিকে বাড়িয়ে রেখেছে। তবে পুরোপুরি হতচ্ছাড়া ফরাসিটার অলক্ষে।
আমি মনের সুখে হরদম তার কড়ে আঙুলটা মর্দন করতে মেতে গেলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, বে-আক্কেল নচ্ছাড় ফরাসিটা অসভ্যের মতো ঘেঁষতে ঘেঁষতে রূপসির দিকে সরে আসতে আরম্ভ করেছে। ইতিমধ্যে সে অনেকটা সরেও এসেছে।
আমি হুমকি দিয়ে উঠতেই সুন্দরী ঝট করে সোফা থেকে উঠে গটগট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমি আপন মনে বলে উঠলাম–হ্যায়! এ কী আজব কাণ্ড! এটা কি করে সম্ভব! আমি যে এখনও তার কড়ে আঙুলটা আগের মতোই মর্দন করে চলেছি! আমি চেঁচিয়ে উঠলাম–এ কী করছ সুন্দরী! তোমার কড়ে আঙুলটা আমার মুঠোর মধ্যে রয়ে গেল যে!
সে কিন্তু দাঁড়ানো তো দূরের কথা, আমার কথা শুনে পিছন ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। আর আমি রাগ সামলাতে না পেওে যন্ত্রেও মতো দ্রুততার সাথে সোফার পিছনে দৃষ্টি দিয়ে থেমে গেলাম। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আপন মনে বলে উঠলাম–হায় ঈশ্বর! আমি যে মুঠো করে বসে আছি সেটা তো নচ্ছাড় ফরাসিটার আঙুল!
আমি রাগে গজরাতে লাগলাম আর আঙুলটা এমনভাবে মর্দন করলাম যে, সেটা কট করে ভেঙে গেল।
একটু পরেই রূপসির দারোয়ান এসে আমাদের দুজনকেই টেনে-হিঁচড়ে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেল। তারপর জোরে জোরে দুটো লাথি মেরে আমাদের দুজনকেই সিঁড়ির ওপর থেকে ফেলে দিল। আমরা অসহায়ভাবে গড়াতে গড়াতে আধ-মরা অবস্থায় একেবারে নিচে এসে পড়লাম।
তারপর থেকে ফরাসি অপদার্থটা বাঁ-হাত কাপড় দিয়ে জড়িয়ে গলার সঙ্গে সর্বক্ষণ ঝুলিয়ে রাখতে লাগল। আসল কারণটা কী? কাউকেই মুখ ফুটে বলতে পারল না। এমন লজ্জার কথা কি কাউকে বলা যায়?
দ্য ডেভিল ইন দ্য বেলফ্রাই
ভন্ডারভট্টিমিটিস!
ভন্ডারভটিমিটি এক ওলন্দাজ নগর। এটা যে বিশ্বের সুন্দরতম স্থান তা সবারই মোটামুটি জানা আছে। আজকের দিনে না হলেও এক সময় অন্তত এ নগরটা পৃথিবীর সুন্দরতম স্থান হিসেবে গণ্য হত।
জায়গাটা খুবই ছোট, অখ্যাত-অজ্ঞাত। আর রাজপথ থেকে বহু দূরে এর অবস্থান। তাই অনেকের কাছেই সে জায়গাটা অজানা-অচেনা। এ কথা বিবেচনা। করেই জায়গাটা সম্বন্ধে কিছু বিবরণ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।
