রাজা আবার চোখের মণি দুটো ঘুরিয়ে ভালো করে দেখে নিলেন। তিনি কোথায় এসেছেন–এখন কোথায় অবস্থান করছেন, জানা দরকার। কিছুটা অন্তত ধারণা তার হলো।
চার দেওয়ালে ঘেরা একটা ছোট্ট ঘর। ঘর না বলে একে বরং একটা খুপড়ি বলাই উচিত। চারটি দেওয়ালের মধ্যে বৈচিত্র কিছু নেই। বৈচিত্র যেটুকু লক্ষিত হচ্ছে, তা মাথার ওপরে। যেটার কড়িকাঠের অস্তিত্ব নেই। কড়ি কাঠের পরিবর্তে মাথার ওপরে টুকরো টুকরো আচ্ছাদনের মতো লাল মেঘ অনবরত চক্কর মারছে।
রাজা এবার সোজা ওপরের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। দেখলেন, লাল মেঘের ফাঁক দিয়ে অনেক, অনেক ওপর থেকে রক্তের মতো লাল, অজ্ঞাত এক ধাতুর তৈরি বেশ মোটা একটা শেঁকল সোজা নেমে এসেছে।
শেঁকলটার একটা প্রান্ত হয়তো আকাশের সঙ্গে লেগে রয়েছে, আর বিপরীত প্রান্তে একটা চুনি পাথর ঝুলছে। চুনি পাথরটার গা থেকে অত্যুজ্বল দ্যুতি যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। এমন তীব্র দ্যুতি যে, তাকাতেই কষ্ট হচ্ছে, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।
চুনি পাথরটাকে দেখেই রাজা নিঃসন্দেহ হলেন। এমন অত্যাশ্চর্য পাথর এর আগে কেউই দেখে নি, কল্পনাও করতে পারেনি। অতএব পাথরটার দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়েই তিনি মনে মনে ভূয়সী প্রশংসাই করতে লাগলেন।
এবার ঘরের চারকোণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাজা দেখলেন, চারকোণে চার রকমের চারটি পাথরের মূর্তি রয়েছে। প্রতিটা দানবাকৃতি বিশিষ্ট।
পাথরের মূর্তিগুলোর তিনটিতে লক্ষিত হচ্ছে, মিশরের দৈহিক বিকৃতি, গ্রীসের দেহসৌষ্ঠব আর ফরাসির সবকিছু।
চতুর্থ মূর্তিটাকে বোরখা দিয়ে এমনভাবে আবৃত করে রাখা হয়েছে, যাতে ক্রমে সরু হয়ে আসা হাটু আর পায়ের জুতা জোড়া ছাড়া আর কিছু রাজার নজরে পড়ল না।
ব্যস, এটুকু দেখেই রাজার মুখটা রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। মনে হলো হঠাৎ যেন কেউ তুলি দিয়ে রক্তের ছোপ দিয়ে দিয়েছে তার সারা মুখে।
আর ঘরের এখানে-ওখানে হাজার খানেক ছবি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ছবিগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়েই রাজার মনে হলো চিত্রশিল্পী র্যাফেলকেও বুঝি কোনো না-কোনো সময়ে এ ঘরে আনা হয়েছিল। দেওয়ালের গায়ে সর্বত্র বিলাসিতার ছাপ সুস্পষ্ট।
রাজা কিন্তু এতকিছু দেখেও এতটুকুও দমে যাননি। নিজেকে সামলে সুমলেই রেখেছেন।
কিন্তু একটামাত্র পর্দাবিহীন জানালা দিয়ে নরকের আগুনের হল্কা দেখে ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে তার কানে এলো বিকট আর্তস্বর। যন্ত্রণার চিল্লাচিল্লির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনবরত বেজে চলেছে যন্ত্র-সংগীত। একে যন্ত্র-সংগীত না বলে বরং যন্ত্রণা-সংগীত বললেই যথার্থ বর্ণনা দেওয়া হবে।
সে বাজনার শুরু বা শেষ কিছুই নেই। জানালার মায়াচ্ছন্ন কাঁচের ফাঁক দিয়ে অনবরত সে বিদাসময় বাজনা ভেসে আসছে। যন্ত্রণা! দুঃসহ যন্ত্রণার সংগীত।
রাজা যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। দুম্ করে বসে পড়লেন। পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল-নিথরভাবে বসেই রইলেন।
অন্যান্য জাতির মতো ফরাসিরা ঝট করে সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে না। আর ওমলেটের রাজা লোক হাসিয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটাকে মোটেই বরদাস্ত করতে পারেন না। তাই মুহূর্তের মধ্যেই তিনি নিজেকে সামলে স্বাভাবিক হয়ে নিলেন।
বসে থাকা অবস্থাতেই চোখ ঘুরিয়ে টেবিলের দিকে তাকালেন। দেখলেন, সেখানে কয়েকটা সুতীক্ষ তরবারি পড়ে রয়েছে। তরবারি চালানোয় রাজা খুব ওস্তাদ। যুদ্ধ ভালোই জানেন। এক সময় যোদ্ধা হিসেবে তার খ্যাতিও নেহাৎ কম ছিল না।
তিনি হাত বাড়িয়ে দুটো তরবারি তুলে নিলেন। আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে তার তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করে নিলেন।
হাতের তরবারি দুটো বার কয়েক বন্ বন্ করে ঘুরিয়ে রাজা এবার শয়তানকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলেন।
হায়! এ কী মহা ফ্যাসাদ! শয়তানটা যে তরবারি চালাতে জানে না, যুদ্ধ করবে কি করে! এখন উপায়!
বহুৎ আচ্ছা! তরবারি না হয় বাদই দেওয়া যাক। তবে তাসের লড়াই শুরু হোক। দেখা যাক, কার হিম্মৎ বেশি।
রাজার হুঙ্কারে শয়তান রাজি হয়ে গেল।
লড়াইয়ের শর্ত শয়তান হেরে গেলে মরা রাজা হবেন জ্যান্ত-নরক থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন।
ব্যস, তাদের লড়াই শুরু হয়ে গেল।
শয়তান তাস চালতে চালতে যখন হাই তুলতে আরম্ভ করল আর মদের বোতল গলায় ঢালতে লাগল। সে সময় মওকা বুঝে রাজা হাত সাফাইয়ে লেগে গেলেন।
শয়তান হি-হি-হি করে হেসে উঠল।
যুদ্ধজয়ী রাজা ঝট করে উঠে দাঁড়াল। দিগ্বিজয়ী বীরের মতো না হলেও বিবাগী ডায়োজিনির মতো কাঁটামারা বুটে ঘটঘট আওয়াজ তুলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
তাসের জুয়ার মাধ্যমে রাজা মুক্তিপণ আদায় করলেন। যমরাজার দরবার থেকে তিনি হাসিমুখে ফিরে এলেন।
হোয়াই দ্য লিটল ফ্রেঞ্চম্যান ওয়ারস হিজ হ্যান্ড ইন এ স্লিভ
একবার একজনের মুখে পাড়ারই এক রূপসি সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছিলাম। এক সকালে আমি জানালায় দাঁড়িয়েছিলাম। ছয়ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা শরীরটাকে নিয়ে, আমি রাস্তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম। তখন একেবারে হঠাৎই রাস্তার বিপরীত দিকের জানালায় সে সুন্দরীকে দেখতে পেলাম।
আমি হচ্ছি একজন জমিদার–ডাকসাইটে জমিদার। আমার খেতাবও নেহাৎ ছোটখাট নয়–খুবই লম্বা।
