রাজা মশাই তো পৃথিবী ছেড়ে পরলোকে পাড়ি জমালেন, কিন্তু মৃত্যুর তিন দিন পর এক অত্যাশ্চর্য–একেবারেই অবিশ্বাস্য এক কাণ্ড ঘটে গেল। হঠাৎ-ই তিনি বিকটস্বরে হেসে উঠলেন। সে কী হাসি! প্রাসাদের দেওয়াল চৌচির হয়ে যাওয়ার যোগাড় হলো।
বিকটস্বরে হেসে, শয়তান রাজার হাসির পাল্টা জবাব দিল। তার মেজাজ খুবই গরম। মরা হাসবে তার স্বরে। এ কী বরদাস্ত করা যায়, নাকি করা উচিত?
রাজা সাহেব আবার একই রকম বিশি স্বরে, রীতিমত খেঁকিয়ে উঠলেন–এটা হচ্ছে কি শুনি!
হি-হি-হি! কেন? কী বলতে চাইছি, বুঝছ না? হি-হি-হি! শয়তান হাসতে হাসতে রাজার কথার জবাব দিল।
রাজা এবার বললেন–মস্করা করছ! আমার সঙ্গে ইয়ার্কি পাপ করে থাকলে। বেশ করেছি। দরকার হলে একবার নয়, আরও হাজারবার পাপ করব।
বেশ করেছ? পাপ করে আবার বুক ফুলিয়ে গলা চড়িয়ে কথা বলছ!
কিন্তু আমাকে এ বর্বরের মতো শাস্তি দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে তোমাকে?
অধিকার? হি-হি-হি! অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। অধিকার আদায় করে নিতে হয়।
এত বড় কথা তুমি আমার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে তোমার বুক এতটুকুও কাঁপছে না! জানো আমি তোমাকে
আমাকে তুমি কি করতে পার, তা না হয় পরে ভেবে-চিন্তে করবে। হি-হি-হি!
হাসি থামাও! আমার সামনে দাঁড়িয়ে ধূর্ত শেয়ালের মতো এমন খাক-খ্যাক করে হাসবে না, সাবধান করে দিচ্ছি!
আমাকে সাবধান করার আগে তুমি আগে নিজেকে সামলাও। যাক গে, এখন যা বলছি, তাড়াতাড়ি করে ফেল তো।
কী? তোমার আবার কি বলার থাকতে পারে? হো-হো-হো! রাজা আগের মতোই বিকটস্বরে হাসতে হাসতে বলে উঠলেন।
তাড়াতাড়ি প্যান্ট খুলে আমার সামনে দাঁড়াও।
কী? কী বললে? আমাকে তুমি প্যান্ট খুলতে বলছ? তোমার স্পর্ধার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে দিচ্ছি!
কথা না বাড়িয়ে যা বলছি, লক্ষিসোনার মতো ঝটপট করে ফেলো। খোলো প্যান্ট খুলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়।
তোমার হয়তো জানা নেই, আমি কে। তা যদি জানতে জানি। খুব ভালোই জানি। হি-হি-হি!
না, কিছু জানেন না। তুমি কচু জানো। মাজুরকিয়াদ বইটা লিখে আমি কত নাম-যশ পেয়েছি, জানো কী?
হি-হি-হি!
আমি অ্যাকাডেমির একজন সম্মানীয় সদস্য, জানো?
হি-হি-হি! এমন একজন নামকরা লোককে তুমি বলছ কিনা প্যান্ট খুলতে! তোমার স্পর্ধা–বলিহারি স্পর্ধা তোমার! তুমি বললে, আর আমি সুরসুর করে প্যান্ট খুলে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ব! কি ভেবেছ তুমি? কিছুতেই না।
খুলবে না? প্যান্ট খুলবে না তুমি।
না। কিছুতেই না। আহাম্মক কোথাকার! তুমি যদি জানতে, এ-প্যান্টটা আমার রাজ্যের সবচেয়ে সেরা দর্জি দিয়ে করানো। এটা তো আমি খুলবই না–এমনকি হাতের দস্তানা জোড়াও কিছুতেই খুলব না।
হি-হি-হি! এতক্ষণ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। কিন্তু আর নয়।
কে তুমি? তুমি কে, এটাই তো আমি জানতে চাচ্ছি?
স্বয়ং শয়তান! স্বয়ং শয়তান তোমার সামনে দাঁড়িয়ে, এখন পর্যন্ত তোমার প্যানপ্যানানি বরদাস্ত করে যাচ্ছে, শুনে রাখো।
তুমি শয়তান! হো-হো-হো!
খবরদার! হাসি থামাও। এমন হো-হো করে হেসে আমার মেজাজটা আর খারাপ করে দিও না, বলে দিচ্ছি! আরও খোলসা করে আমার পরিচয় দিচ্ছি, শোনো–আমার নাম বাল-জিবাব, মাঝিদের সম্রাট আমি। একটু আগেই আমি তোমাকে ওই কফিনটা থেকে বের করে এনেছি। ওই দেখো, রোজ উদেরে তৈরি, হাতির দাঁতের কারুকার্য করা কফিনটা পড়ে রয়েছে।
রাজা ঘাড় ঘুড়িয়ে মুহূর্তের জন্য কফিনটার দিকে তাকালেন।
শয়তান আগের মতোই বিশ্রি স্বরে বলে চলল–তোর গা দিয়ে ভুরভুর করে সুগন্ধ বেরোচ্ছিল। আর এক চিলতে কাগজের গায়ে স্পষ্টাক্ষরে সব বৃত্তান্ত লেখা ছিল।
তুমি, তুমি আমাকে, কফিন থেকে বের–
রাজার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শয়তান আবার একই স্বরে বলে উঠল–হ্যাঁ, আমিই তোমাকে কফিনটা থেকে বের করেছি। তোমাকে কে পাঠিয়েছে, বলতে পারো?
রাজা ফ্যালফ্যাল করে নীরবে শয়তানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শয়তান নিজেই তার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলল–তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে আমারই বেতনভুক্ত কবরখানা-ইন্সপেক্টর।
কবরখানা-ইন্সপেক্টর?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। শোনো, তোমাকে যখন আমি খরিদ করে নিয়েছি তখন তোমার পরনের ওই প্যান্টটাও তো আমারই, তাই না? খোলো, শিগগির প্যান্টটা খুলে ফেল।
ওমলেটের রাজা রাগে একেবারে কাঁপতে কাঁপতে বললেন–তুমি ঘুঘু দেখেছ, তার ফাঁদ দেখনি শয়তান। তুমি শুনে রাখো, এমন একটা ন্যাক্কারজনক অপমানের বদলা আমি নেবই নেব না।
হি-হি-হি!
তোমার ধৃষ্টতা আমি এতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে বরদাস্ত করেছি। অসহ্য! একেবারেই অসহ্য! এ অপমানের প্রতিশোধ আমি নেবই নেব। এখন আমি বিদায় নিচ্ছি। নমস্কার!
শয়তানকে নমস্কার জানিয়ে ঘর ছেড়ে বেরোতে গিয়েই রাজা দরজার সামনে মোক্ষম একটা ধাক্কা খেলেন। এক ধাক্কায় তাকে ফেলে দেওয়া হলো শয়তানের সামনে–একেবারে তার মুখোমুখি।
রাজা কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বার কয়েক চোখ দুটো রগড়ে, পর-পর হাই তুলে কাঁধ দুটোকে ঝাঁকুনি দিয়ে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে একটু আঁচ করে নিলেন।
পরমুহূর্তেই তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। শয়তানের কথার সত্যতা যাচাই করে নিলেন। এবার পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হলেন, তিনি সত্য সত্যই মড়া।
