আমি অন্যন্যোপায় হয়ে সামান্য প্রসঙ্গ নিয়ে সাধ্যমত গলা চড়িয়ে জোর তর্ক জুড়ে দিলাম আর গলা চড়িয়ে অদ্ভুতভাবে অঙ্গভঙ্গি করতে লাগলাম। মোদ্দা কথা, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমি নিতান্তই অহেতুক পরিবেশটার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
তবু হায়! এ কী অবিশ্বাস্য কাণ্ড! শব্দটা যে ক্রমেই উৰ্দ্ধমুখি হয়ে চলেছে। থামার কোনো লক্ষণই দেখলাম না। কিন্তু কেন–শব্দটা থামছে না কেন? এর উৎসই বা কোথায়?
আমার অস্থিরতা আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল। কর্তব্য স্থির করতে না পেরে আমি মেঝেতে জোরে জোরে পা ঠুকে হাঁটাহাটি শুরু করলাম। যাকে বলে, ঘরময় অস্থিরভাবে পায়চারি করা।
কিন্তু হায়! এ কী তাজ্জব ব্যাপার! শব্দটা যে একই গতিতে অনবরত বেড়েই চলল।
আমি আপন মনে আর্তনাদ করে উঠলাম–‘হায়! হায় ঈশ্বর! এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! আমি এখন কি করব!
আমি উন্মাদের মতো অনর্গল বকতে লাগলাম। একে অর্থহীন প্রলাপও বলা চলে। অকারণে বার বার দিব্যি কাটতে লাগলাম। অনর্গল বকবক করার ফলে আমার মুখ দিয়ে ফেনা ঝরতে আরম্ভ করল।
আমি উন্মাদের মতো ঘরময় দাপাদাপি করতে করতে এক সময় আমার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারটার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বকবকানি কিন্তু চালিয়েই যেতে লাগলাম। এবার ঝট করে চেয়ারের হাতল দুটো শক্ত করে ধরে মাথার ওপরে তুলে নিলাম। পরমুহূর্তেই সেটাকে উন্মাদের মতো আবার তক্তার ওপর দুম করে শব্দ করে বসিয়ে দিলাম।
আমার এ আকস্মিক পরিবর্তনের দিকে পুলিশ অফিসারদের কোনো খেয়াল নেই। তারা আগের মতোই চুটিয়ে গল্প করে চলেছে। কথাবার্তা, হাসাহাসি আর আনন্দ সমান তালেই চালিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা স্বস্তি পেলেও নিশ্চিন্ত অবশ্যই হতে পারলাম না।
আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। পুলিশ অফিসারদের আচরণে আমি সত্যি সত্যি খুবই অবাক হলাম। কারণ, আমি এতক্ষণ ধরে যে নিরবচ্ছিন্ন শব্দটা শুনছি। সে অবাঞ্ছিত শব্দটা আমার মধ্যে উন্মাদনার সঞ্চার করেছে, আমাকে উন্মাদ করে তুলেছে, তারা তিন-তিনটি প্রাণীর মধ্যে কেউই শব্দটা শুনতে পাচ্ছে না। এমনটা কি কখন হতে পারে, নাকি বিশ্বাস করতে উৎসাহ পাওয়া যায়।
হায় পরমপিতা! হায় সর্বশক্তিমান ঈশ্বর। না, অবশ্যই না, এটা হতেই পারে না। তবে কি তারা শুনতে পেয়েছে? শুনতে পেয়েছে অবাঞ্ছিত সে শব্দটা? তবে কি তারা সন্দেহ করছে! এও কোনোদিন হতে পারে! তারা শুনেছে! শুনতে পাচ্ছে! তারা সন্দেহ করছে! নীরবে লক্ষ্য করছে! তারা জেনে ফেলেছে!
তবে? তবে কি তারা আমার মধ্যে উদ্ভুত আতঙ্কটা নিয়ে মস্করায় মেতেছে। মজা করছে আমাকে নিয়ে।
আমি এরকমই ভেবেছি। এখনও একই ভাবনা আমার বুকের ভেতরে খস্ খস্ করে চলেছে।
উফ্! কী যন্ত্রণা! নিরবচ্ছিন্ন যন্ত্রণায় আমি দগ্ধে মরছি। হায় ঈশ্বর। এ কী যন্ত্রণা যাঁতাকলে আমাকে পিষে মারছ! এরকম অসহ্য যন্ত্রণায় তিলে তিলে দগ্ধে মরার চেয়ে অন্য যে কোনো পরিস্থিতি এর চেয়ে অনেক, অনেক ভালো ছিল। সুতীক্ষ্ম অস্ত্রের আঘাতের চেয়েও অসহনীয় বিদ্রূপ আমাকে দগ্ধে মারতে লাগল। উফ্! এ বিদ্রুপের পরিবর্তে অন্য যা-কিছু যন্ত্রণা সবই সহনীয়?
না, আর সহ্য করতে পারলাম না! গায়ে জ্বালা-ধরা কপট হাসি আমার পক্ষে আর এক মুহূর্তও বরদাস্ত করা সম্ভব হলো না! আমি গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠব, আর তা যদি না হয় তবে অনিবার্য মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। মরেই যাব আমি!
আবারও ওই যে, আবার! ওই শোন! জোরে আরও জোরে আরও, আরও জোরে।
আমার মধ্যে চূড়ান্ত অস্থিরতা ভর করল। আমি গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম–‘হতচ্ছাড়া! নচ্ছাড়গুলো! ছলচাতুরী বন্ধ কর! আমি অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি, আমি
হ্যাঁ, আমিই কাজটা করেছি।’
উন্মাদের মতো ঘরময় দাপাদাপি করতে করতে আমি আবার গলাছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম–‘নচ্ছারগুলো, এ তক্তাগুলো উঠিয়ে ফেল। এখানে এই যে, এ তক্কাগুলো। হ্যাঁ, এ তো তারই হৃদযন্ত্রের স্পন্দন। ওই, ওই শোন–‘
দ্য ডিউক ভিলা ওমলেট
সমালোচনা সাংঘাতিক ব্যাপার।
সমালোচনার দৌলতে বড় বড় মানুষকেও কুপোকাৎ হয়ে যেতে হয়।
রাজা ওমলেট।
মহাপ্রতাপশালী রাজা ওমলেট।
সমালোচনার দৌলতে তাঁকে একেবারে ল্যাজে-গোবড়ে হতে হয়েছিল।
যে রাতের কথা বলছি, সে রাতে তিনি সোফার ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে শুয়ে অলসভাবে সময় কাটাচ্ছিলেন। স্পঞ্জের মতো নরম একটা বালিশের ওপর তিনি আলতোভাবে মাথাটা রেখে আরাম-আয়েশে ডুবেছিলেন। ঘরে তিনি একাই ছিলেন।
এমন সোনার খাঁচার মধ্যে সযত্নে রক্ষিত পেরুদেশের সে অদ্ভুত পাখিটা রাজা ওমলেটের সামনে হাজির হলো।
পাখিটা এতদিন রানি কাছে, তারই তত্ত্বাবধানে ছিল। মহানন্দেই সেটা সেখানে ছিল।
এমন সোনার খাঁচাটাসমেত পাখিটাকে রাজার কাছে নিয়ে আসা হলো।
পাখিটাকে কারা রাজার সামনে হাজির করল?
রাজ্যের ছয়জন জ্ঞানী ব্যক্তি পাখিটাকে নিয়ে এলো।
ব্যাপারটা সহ্য করা রাজা ওমলেটের পক্ষে সম্ভব হলো না। তার মধ্যেনিদারুণ। অস্থিরতা ভর করল।
অস্থিরচিত্ত রাজা শেষপর্যন্ত একটা গোটা জলপাই ফল মুখে পুরে দিলেন। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে দমবন্ধ হয়ে তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন। রাজা ওমলেট চরম বিতৃষ্ণা বুকে নিয়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে অনন্ত সুন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
