‘আপনি? বলছেন কি, আপনি আর্তনাদ করেছিলেন?
‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। আমিই ঘুমের ঘোরে হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠেছিলাম।
‘বুড়ো লোকটা কোথায়?
‘এখানে নেই।’
‘নেই? এখানে নেই? এ কী কথা–‘
‘ঠিকই বলছি, তিনি বহুদিনই এখানে নেই।
আমি পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়িটা দেখালাম।
তারা অনুসন্ধিৎসু চোখে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। আমিও বললাম–‘দেখুন, সব জায়গা ভালো করে দেখেনিন।
তারা আগ্রহের সঙ্গে সর্বত্র তন্ন তন্ন করে তল্লাসি চালাল। খাটের তলা আর প্রতিটা আনাচে কানাচে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখল। হতাশ হলো। সন্দেহজনক কিছুই পেল না।
আমি এবার তাদের নিয়ে তার ঘরে গেলাম। বাক্স পেটরা আর আলমারি দেখালাম। তারা দেখল, টাকা পয়সা, দলিল আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবই ঠিক-ঠাক আছে। সেগুলো আত্মসাৎ করা তো দূরের কথা কেউ হাত দিয়েছে বলেও মনে করল না।
এবার আমি আত্মবিশ্বাসের অত্যুগ্র বিশ্বাসে টানাটানি করে তিনটি চেয়ার এনে ঘরের মাঝখানে রাখলাম। তাদের অনুরোধ করলাম কিছু সময় বিশ্রামের মাধ্যমে ক্লান্তি অবদমন করে নিতে। আর মাত্রাতিরিক্ত চাতুর্যের মাধ্যমে চেয়ারটাকে টেনে এনে সে জায়গাটায় পাতলাম, যেখানে আমারই হাতেনিহত বুড়োকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমার মনটা বিজয় উল্লাসে উথাল পাথাল করছে। এমন একটা কাজনির্বিঘ্নে সম্পন্ন করে পুলিশের চোখে ধুলো দিতে পারলে অন্তরের অন্তঃস্থলে খুশির জোয়ার বয়ে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। হ্যাঁ, ঠিক সে জায়গাটার ওপরেই আমার চেয়ারটাকে পেতে দিলাম।
পুলিশ অফিসাররা সবকিছু দেখে, দীর্ঘসময় ধরে তল্লাসি চালিয়ে যারপরনাই খুশি। আমার আচার ব্যবহার কথাবার্তায় তারা খুবই প্রীত। তার ওপর এতক্ষণ যে হেসে হেসে সহজ সরল ভঙ্গিতে কথা বললাম, এতে তো কারো মনে এতটুকু সন্দেহ দানা বাধার কথাও নয়।
আমার সনির্বন্ধ অনুরোধে তারা চেয়ার টেনে বসল। তারা আসন গ্রহণ করলে আমিও নিজের জন্য রক্ষিত চেয়ারটা টেনে তাদের মুখোমুখি বসলাম।
তারা আমাকে এক-এক করে বহু প্রশ্নই করল। আমি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাদের সন্তোষ উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম।
তারা এবার বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ জমাতে শুরু করল।
আশ্চর্য ব্যাপার! আমি যেন ক্রমেই মিইয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগলাম। বার বারই মনে হতে লাগল, তারা আরও দেরি করছে কেন, কাজ তো মিটিয়েই ফেলেছে। এখন এখান থেকে কেটে পড়ক। কেন অহেতুক এখানে বসে থেকে আমাকে এভাবে বিব্রত করছে!
আমার মাথার ভেতরে ঝিমঝিমানি শুরু হয়ে গেল। তারপর শুরু হলো মাথার যন্ত্রণা। ক্রমে তা বাড়তে বাড়তে অসহ্য হয়ে উঠল। কানের লতি দুটো গরম হয়ে গেল। তারপর কানের মধ্যে বোঁ-বো করতে লাগল।
আশ্চর্য ব্যাপার! আশ্চর্যই কেবল নয়, ব্যাপারটা যারপরনাই বিরক্তিকরও বটে। পুলিশ অফিসারগুলো বাড়ি ছেড়ে যাওয়া তো দূরের ব্যাপার সামান্য নড়াচড়াও করল না। চেয়ার আঁকড়ে বসেই রইল। আর কথা? একের পর এক প্রসঙ্গ টেনে এনে অনর্গল কথা বলে যেতে লাগল।
আর এদিকে আমার কানের ভেতরের বোঁ-বোঁ শব্দটা ক্রমেই বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ে উঠে যেতে লাগল। অসহ্য! আমি আপন মনে বিরক্তভাবে বলে উঠলাম–‘উফ! কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল রে বাবা!
কানের বিরক্তিকর ভাবটাকে ভুলে থাকার জন্য আমি জোর করে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে হেসে হেসে স্বাভাবিকতার ভান করে তাদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলাম।
‘কিন্তু হায়! এ কী মহা সমস্যায় পড়া গেল! কানের ভেতরের শব্দটা ক্রমে যে বেড়েই চলেছে। আর তা ক্রমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে পড়তে লাগল।
হঠাৎ, হা হঠাই আমার যেন মনে হলো বো-বো শব্দটা আমার কানের ভেতরে হচ্ছে না। একটু নীরবতার মধ্যে দিয়ে গভীরভাবে লক্ষ্য করলাম। হ্যাঁ আমার অনুমান। অভ্রান্তই বটে। শব্দটা অবশ্যই আমার কানের ভেতরে হচ্ছে না। তবে?
ইতিমধ্যেই আমার মুখ যে ফ্যাকাশে, চকের মতো ফ্যাকাশে হতে শুরু করেছে। এতে এতটুকুও সন্দেহের অবকাশ নেই।
আমার চোখ-মুখের বিবর্ণ ভাব, ক্রমেই মিইয়ে-যাওয়া অবস্থাটা যাতে পুলিশ অফিসারদের নজরে না পড়ে, তার জন্য আমি অনর্গল কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম। আর গলা ক্রমশ চড়াতেও ভুললাম না।
তবু শব্দটা কমার কোনো লক্ষণ তো দেখলামই না, বরং ক্রমে বেড়েই চলল। এর জন্য আমার আর কী-ই বা করার থাকতে, পারে? আমি যে পরিস্থিতির চাপে পড়ে নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়েছি।
তবে শব্দটা খুবই মৃদু আর দ্রুতগতিতে হয়ে চলেছে। কোনো ঘড়িকে তুলা-চাপা দিয়ে রাখলে যেমন মৃদু শব্দ নির্গত হয় ঠিক তেমনই একটা টি-টি শব্দ অনবরত হয়েই চলেছে। এতটুকু হ্রাস-বৃদ্ধি নেই, বিরামও নেই মুহূর্তের জন্যও।
আমার মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলল। আমি হাঁপাতে শুরু করলাম। একনাগাড়ে হাঁপিয়েই চলেছি। আমার এ আকস্মিক পরিবর্তনটুকু পুলিশ অফিসারদের নজরে পড়ল না, কিছু শুনতেওপেল না।
আমি আরও গলা চড়িয়ে, বেশ জোরে জোরে কথা বলতে লাগলাম। চেষ্টা করলাম, যাতে মুহূর্তের জন্যও আমাকে কথা বলা বন্ধ করতে না হয়।
অবাঞ্ছিত শব্দটা নিরবচ্ছিন্নভাবে হয়েই চলল। আর তা বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে চলল।
