আমি আর একটা লম্বা লাফ দিয়ে একেবারে তার খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আচমকা একটা হেঁচকা টান দিয়ে তাকে বিছানা থেকে মেঝের ওপর ফেলে দিলাম। তারপর যন্ত্রচালিতের মতো ভারী বিছানাটা খাটের ওপর থেকে নামিয়ে তার ওপর চাপা দিয়ে দিলাম। এবার বিছানাটা টানাটানি করে তার আপাদমস্তক ঢেকে দিলাম।
কাজটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারায় আমার মধ্যে খুশির জোয়ার খেলে গেল। মুখেও ফুটে উঠল হাসির রেখা।
বুকের ধুকধুকানি কিন্তু থামল না। বুড়োটাকে বিছানা-চাপা দেবার পরও মিনিট কয়েক ধরে হৃদযন্ত্রের মৃদু শব্দটা অনবরত চলতেই লাগল। তবে এও সত্য যে, এতে কিন্তু আমি এতটুকুও বিরক্ত হলাম না।
আর এও চিন্তা করলাম, তার বুকের ধুকপুকানির শব্দটা অনবরত চলতে থাকলেও আর যা-ই হোক, সেটা দেওয়ালটা ভেদ করে অবশ্যই ওপরে যেতে পারবে না।
এক সময় বুকের অবাঞ্ছিত শব্দটা থেমে গেল। বুড়োটার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল। সে মারা গেল।
এবার হাত বাড়িয়ে তার গা থেকে বিছানাটা সরিয়ে ফেললাম। তার ওপরে সামান্য ঝুঁকে সে সত্যি সত্যি মারা গেছে কি না বোঝার চেষ্টা করলাম। হাত দিয়ে তার গা-টা পরীক্ষা করলাম। ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। আর সর্বাঙ্গ ক্রমেই শক্ত হয়ে পড়ছে, বুঝতে পারলাম। নিঃসন্দেহ হলাম, বুড়োটা সত্যি সত্যি মারা গেছে।
বুড়োটা মারা গেছে। তা সত্ত্বেও তার বুকের ওপর আলতো করে হাতটা রাখলাম। বেশ কয়েক মিনিট ধরে হাতটা সেখান থেকে সরালাম না, রেখেই দিলাম। না, বুকের ওঠা-নামা সত্যি সত্যি বন্ধ হয়ে গেছে। আর কেনই বা তা হবে? তার আত্মা যে অনেক। আগেই দেহটা ছেড়ে গেছে। তার দেহটা সত্যি সত্যি পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
আমি এবার নিশ্চিত যে, তার ভয়ঙ্কর চোখটা আর কোনোদিন মুহূর্তের জন্যও আমাকে ভয় দেখাতে পারবে না, কোনোদিনই না।
এতকিছু শোনার পরও তোমাদের মনে যদি সন্দেহ থাকে, আমি পাগল হয়ে গেছি, তবুও মৃতদেহটাকে গায়েব করে ফেলার জন্য আমি যে সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কওে, যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছি, সে কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করার পর কিন্তু আমার ওপর তোমাদের ধারণাটা পাল্টে যাবে। অর্থাৎ তখন আর অবশ্যই তোমরা মনে করবে না, আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে।
রাত প্রায় পোহাতে চলেছে। আমিও মুখ বুজে যতটা দ্রুত হাতে কাজ সারতে আরম্ভ করলাম।
আমার প্রথম কাজ হলো বুড়োর মৃতদেহটা কাঁচি দিয়ে কুঁচি কুঁচি করে কেটে ফেলা। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজটা সেরে ফেলতে পারলাম। গোড়াতেই তার মাথা আর হাত-পাগুলোকে কেটে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলাম। তারপর দেহকাণ্ডটা কুঁচোতে মেতে যাই।
এবার মাংসের টুকরোগুলোকে গায়েব করে ফেলার কাজে হাত দিলাম। গোড়াতেই ঘরটার মেঝেয় একটা একটা করে তিনটা গর্ত খুড়ে ফেললাম। এবার বুড়োর দেহের টুকরোগুলোকে তার মধ্যে চালান করে দিলাম। তারপর ওগুলোকে আবার একটা একটা করে যথাস্থানে বসিয়ে মেঝেটাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনলাম। নিখুঁত-কাজটা সম্পূর্ণ নিখুঁত হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার জন্য অনুসন্ধিসু চোখে বার বার সে বিশেষ জায়গাটা দেখতে লাগলাম। দীর্ঘসময় ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর নিঃসন্দেহ হলাম, কোনো মানুষের চোখে, এমন কী তার চোখেও কিছু সন্দেহ করার মতো কিছুই ধরা পড়বে না।
এমনকি ধুয়ে-মুছে সাফসুতরা করার মতো কিছু চোখে পড়ল না। কোনো দাগ মানে সামান্যতম রক্তের দাগও নেই, যে ধোয়াধুয়ি করতে হবে। আসলে আমি তো গোড়া থেকেই প্রতিটা কাজের ক্ষেত্রে যারপরনাই সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম, যার ফলে এমন কোনো চিহ্নই সৃষ্টি হয়নি যে, ধোয়ামোছা করার দরকার পড়তে পারে।
আসলে একটা বালতি আনতে গেলেই যে ধরা পড়ে যেতে হতো। ব্যস, আমার কর্মযজ্ঞের ব্যাপার-স্যাপার ফাঁস হয়ে পড়ত। কিন্তু পাকা হাতে হা! হা! হা! কার বাপের সাধ্য যে আমার–
আমি ব্যস্ত হাতে কাজটার একের পর এক ধাপ সেরে যখন পুরোপুরি মিটিয়ে ফেললাম, তখন ঘড়িতে চারটি বাজে। তখনও অন্ধকার রয়েছে, মধ্যরাতের গাঢ় অন্ধকার।
ঢং-ঢং করে চারটার ঘণ্টা বাজল। ঘণ্টা বাজতে না বাজতেই রাস্তার দিকের দরজায় টোকা পড়ল। ঠক্ ঠক্ ঠক্! শব্দ আমার কানে এলো।
দরজা খোলার জন্য হালকা মনে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলাম, দরজাটা খুলে দেওয়ার জন্য। ভয়? না, কাজ তো সুষ্ঠুভাবেই মিটিয়েই ফেলেছি, ভয় কীসের?
আমি দরজা খুলতে না খুলতেই হুড়মুড় করে তিন তিনজন ঘরে ঢুকে এলো।
আগন্তুক তিনজন নিজেদের পুলিশ-অফিসার বলে পরিচয় দিল। রাতে কোনো এক প্রতিবেশী তীব্র আর্তস্বর শুনতে পেয়েছিল। একটা অসৎ কাজ সম্পাদনের সন্দেহ করছে।
সন্দেহজনক ব্যাপারটা সম্বন্ধে পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশ দপ্তর এ তিনজন পুলিশ অফিসারকে ব্যাপারটার তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে। তারা বাড়িটাতে চিরুণি তল্লাসি চালাবার জন্য বদ্ধ পরিকর।
ব্যাপারটার কথা শুনে আমি আপন মনে হেসে উঠলাম। ভয়? আমার ভয়? আমার আর ভয় কীসের?
আমি দরজা খুলে আগন্তুকদের স্বাগত সম্ভাষণ জানালাম। পুলিশ অফিসারদের প্রশে।নর উত্তরে আমি মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে স্বাভাবিক কণ্ঠেই জবাব দিলাম–আরে ধৎ! ব্যাপার কিছু নয়। আমিই আর্তনাদ করেছিলাম।’
