এক সময় মাকড়শার জালের সূতোর মতোই সূক্ষ্ম একটা আলোর রেখা লণ্ঠনটার বর্ধিত ফাঁকটা দিয়ে বেরিয়ে এলো।
লণ্ঠনাটাকে সামান্য ঘোরাতেই আলোর রেখাটা বুড়ো লোকটার শকুন-চোখের ওপরে গিয়ে পড়ল। আমি যা চেয়েছিলাম কার্যত ঘটলও ঠিক তাই।
লণ্ঠনের আলোয় আমি দেখতে পেলাম, বুড়োর সে বিশেষ চোখটা খোলা সম্পূর্ণ খোলা। ঢ্যাবা-ঢ্যাবা চোখে সে ঘরের ছাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
তার খোলা-চোখটার দিকে নজর যেতেই আমার মাথায় খুন চেপে যাওয়ার জোগাড় হলো। আমি রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে লাগলাম। উপায়ন্তর না পেয়ে মনে মনে তার চৌদ্দ-পুরুষ উদ্ধার করতে লাগলাম।
আর করব না-ই বা কেন, বলতে পার? লণ্ঠনের আলোর রেখাটার দৌলতে আমি একেবারে স্পষ্টই দেখতে পেলাম, চোখটার নীল মনিটার ওপরে হালকা একটা আবরণ। ভয়ঙ্কর সে আবরণটা তার শকুন-চোখটাকে আরও অনেক, অনেক বেশি বীভৎস করে তুলেছে।
বীভৎস সে চোখটার ওপরে আমার চোখ পড়তেই আমার হাড়ের ভেতরের মজ্জা পর্যন্ত জমে বরফ হয়ে যাবার উপক্রম হলো।
ব্যস, কেবলমাত্র সে চোখটা ছাড়া বুড়োর শরীরের অন্য কোনো অংশই আমার নজরে ধরা পড়ল না, পড়ার কথাও নয়। কারণ, লণ্ঠনের আলোর রেখাটা যে খুবই ক্ষীণ। আবার এমনও তো হতে পারে, আমি নিজের প্রবৃত্তির শিকার হয়েইনিতান্ত তৎপরতার সঙ্গে আলোর রেখাটাকে তার বীভৎসবুক-কাঁপানো শকুন-চোখটার ওপর ফেলেছিলাম। তা যদি না-ই হতো তবে আমি কেনই বা এমনটা করতে যাব?
আমি তো তোমাদের আগেই বলে রেখেছি, তোমরা আমার এ আচরণকে মস্তিষ্ক বিকৃতির ফল, নিছকই আমার পাগলামি বলে ভুল করছ, আসলে কিন্তু তা নিছকই আমার ইন্দ্রিয়গুলোর অতি তীক্ষ্ণতা ছাড়া অন্য কিছুই নয়।
এখন আমি তোমাদের কাছে ব্যক্ত করছি, ঠিক সে মুহূর্তে, অর্থাৎ সেই মুহূর্তে আমি লণ্ঠনের আলোর রেখাটাকে বুড়োটার বীভৎস খোলা-চোখটার ওপর ফেলেছিলাম ঠিক সে মুহূর্তেই একটা মৃদু, একঘেয়ে, খুবই দ্রুততালে একটা শব্দ আমার কানে এলো, তুলা চাপা দেওয়া কোনো ঘড়ি থেকে যেমন শব্দ বেরিয়ে আসে!
উত্তর্ণ হয়ে সে আওয়াজটা শুনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আর দরকার হলো না। আসলে এ আওয়াজটা আমার কাছে নতুন তো নয়ই, বরং খুবই পরিচিত। কীসের সে আওয়াজ, তাই না? কোথা থেকেই বা তার উৎপত্তি? বুড়ো লোকটার হ্রদযন্ত্র থেকে। হ্যাঁ, তার হৃদযন্ত্রটানিঙড়ে সে শব্দটা যে বেরিয়ে আসছে তা আমি সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ।
বুড়োটার হৃদযন্ত্রের আওয়াজটা আমার ক্রোধকে দ্রুত একেবারে তুঙ্গে তুলে নিয়ে গেল।
তা সত্ত্বেও আমি মুখে কলুপ এঁটেই রইলাম। টু-শব্দটিও করলাম না। জোওে নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে ভরসা হলো না।
আমার হাতের লণ্ঠনটা থেকে আগের মতোই ক্ষীণ আলোর রেখা বিচ্ছুরিত হতে লাগল। নিষ্কলঙ্ক আলোর রেখা।
আমি যথাসাধ্য প্রয়াস চালাতে লাগলাম, যাতে আলোর রেখাটা আগের মতোই স্থিও নিবন্ধ থাকে।
এদিকে হৃদযন্ত্রের নারকীয় টিক্ টিক্ আওয়াজ-ধুকপুকানি ক্রমেই দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে লাগল। প্রতি মুহূর্তেই সেটা অধিকতর দ্রুত হচ্ছে, স্পষ্টতরও হচ্ছে বটে।
আমি বুড়ো লোকটার চোখ-মুখের ওপর দৃষ্টিনিবন্ধ রেখে ভাবতে লাগলাম,নির্ঘাৎ তার আতঙ্ক চরম থেকে চরমতর হয়ে উঠছে। হ্যাঁ, আমি বলছি, সেটা চরম, অপেক্ষাকৃত চরম, প্রতিটা মুহূর্তে আরও চরমে উঠে চলেছে!
কি, আমার দিকে ভালো করে নজর রাখছ তো? আমি তো আগেই বলেছি, আমার স্নায়ু দুর্বল–খুবই দুর্বল। আর তা এতই দুর্বল যে, কাউকে বলে বুঝাতে পারব না, সম্ভবও নয়। সত্যি-সত্যি ঠিক তাই।
আর এখন? রাত শেষ প্রহরে পুরনো জরাজীর্ণ বাড়িটার ভয়ঙ্করনিস্তব্ধতার মধ্যে, এমন অদ্ভুত, একেবারেই বিচিত্র ধরনের একটা শব্দ আমার কানে আসার ফলে আমার আতঙ্ক যে কোথায় গিয়ে পৌঁছল, তার পরিমাপ করা, কারো কাছে সঠিকভাবে ব্যক্ত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তা সত্ত্বেও আমি সেখান থেকে একটা পা-ও নড়তে পারলাম না। ফলে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই আমি আরও মিনিট-কয়েক সেখানে স্থির মতো নিশ্চল-নিথর ও নির্বাকভাবে দাঁড়িয়েই রইলাম।
হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তো এতটুকু কমলই না বরং ক্রমেই বেড়ে চলল। আর সে শব্দটাও হয়ে চলল ক্রমেই উৰ্দ্ধমুখি।
এতক্ষণ তা-ও একরকম ছিলাম, এবার নতুনতর একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমার মধ্যে ভর করল। চাপা দীর্ঘ শ্বাস আমার ফুসফুস নিঙড়ে বেরিয়ে এলো। আপন মনে বলে উঠলাম–উফ্! এ কী হতে চলেছে! এ শব্দটা যে কেবলমাত্র আমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে কি না তাই বা কে বলতে পারে? প্রতিবেশীদের কানেও তো এ শব্দটা যেতে পারে! তবে? তাই যদি সত্যি হয় তবে তো কেলেঙ্কারির চূড়ান্তই হয়ে যাবে। বুড়োটার সময় তো এমনিতেই ঘনিয়ে এসেছে।
আমার পক্ষে আর নিজেকে সামলে-সুমলে রাখা সম্ভব হলো না। অব্যক্ত একটা যন্ত্রণা, অবর্ণনীয় এমন একটা অস্থিরতা আমার মধ্যে ভর করল যা সহ্য করা আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব হয়ে উঠল।
আমি অকস্মাৎ গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠলাম। যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত লণ্ঠনটা খুলে ফেললাম। চোখের পলকে লম্বা একটা লাফ দিয়ে একেবারে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়লাম।
মুহূর্তের মধ্যেই বুড়ো লোকটা বিকট চিৎকার করে লাফিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। একবার, মাত্র একবারই সে চিৎকার করে উঠল।
