আমি মুখে কলুপ এঁটে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। টু-শব্দটাও না। পুরো একটা ঘণ্টার মধ্যে একটা মাংসপেশীও নাড়লাম না।
আমি নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো বুড়োর গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলাম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! এতটা সময়ের মধ্যে সে যে আবার শুয়ে পড়েছে, এরকম শব্দও আমি শুনতে পেলাম না। আসলে সে বসেই আছে, নাকি শুয়ে পড়েছে তাই বোঝা সম্ভব হলো না।
আমি অনুমানে বুঝতে পারলাম, বুড়ো মানুষটা তখন বিছানায় বসে উৎকর্ণ হয়েছিল। আমি যেমন দেওয়ালের মৃত্যু-ঘড়ির দিকে কান পেতে একের পর এক রাত। কাটাই ঠিক তেমনিভাবেই সে-ও খাটের ওপর বসে কাটাচ্ছিল।
মুহূর্তকালের মধ্যে আমার কানে মৃদু একটা আওয়াজ এলো। একজন মানুষ বিছানায় পড়ে কাতরালে যেমন আওয়াজ হয়, ঠিক সে রকমই একটা আওয়াজ! আর কেউ অকস্মাৎ অস্বাভাবিক ভয় পেয়ে গেলে যেমন করে কাতরায় ঠিক সেরকমই একটা আওয়াজ। আতঙ্কের কাতরানি, মোটেই কোনো ব্যথা-বেদনার বা শোক সন্তাপের কাতরানি নয়। আকস্মিক তীব্র আতঙ্কের শিকার হয়ে পড়লে তার বুক থেকে যেমন ভয়ঙ্কর আর্তস্বর বেরিয়ে আসে, যেমন অস্থিরতা ভর করে ঠিক তেমনি অবস্থায় সে পড়েছে।
সে আর্তস্বর আমার খুবই পরিচিত।
ঠিক মধ্যরাতে পৃথিবীর মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে ঠিক তখনই সে আর্তস্বর আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসে।
তখন সে আতঙ্কের ভয়ঙ্করতা আমার ভয়-ভীতিকে আরও অনেক, অনেক বেশি গভীর করে তোলে।
অসহনীয় সে আতঙ্কে আমি কেমন যেন অস্থির হয়ে পড়ি। তাই তো আমি আগেই বলেছি, সে আওয়াজটার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে–ভালোই পরিচয় আছে।
স্বীকার না করে পারছি না, বুড়ো লোকটার প্রতি যে আমার মধ্যে কিছুমাত্রও মমত্ববোধ ছিল না, তা-ও কিছু সত্য নয়। তার তখনকার অনুভূতিটাকে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে আমি যে আনন্দ পেতাম, খুবই সত্য কিন্তু তার সে পরিস্থিতির জন্য আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে দয়ামায়াও কম হতো না।
একটা ব্যাপার আমি এখন অনুমান–না, অনুমান বলা ঠিক হবে না, বরং বুঝতে পারছি বলাই ঠিক হবে–বুড়ো লোকটা প্রথমবার শব্দটা শোনামাত্রই জেগে ওঠে, ঘুম। চটে যায়। ব্যস, তারপর থেকেই সেনিঘুম অবস্থায় মড়ার মতো বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকে। এমন কোনো ভাবই তার মধ্যে প্রকাশ পায় না যাতে মনে হতে পারে, সে জেগে ঘুমের ভান করে পড়ে রয়েছে।
আর তার সে আতঙ্ক দিনের পর দিন ক্রমেই উৰ্দ্ধমুখি হচ্ছে। তা বাড়তে বাড়তে তার মধ্যে অস্থিরতার সঞ্চার করছে।
এ রকম পরিস্থিতিতেও সে মাঝে-মধ্যে নিজের মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতেও চেষ্টা করে। মনকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করত, নিতান্ত অহেতুকই সে এমন আতঙ্কের শিকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু সে পারত না। সে নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়ে পড়ত, নিরবচ্ছিন্ন হতাশা আর হা-হুঁতাশের শিকার হয়ে আরও বেশি অস্থির হয়ে পড়ত।
বুড়ো লোকটা নিজেকে প্রবোধ দিতে গিয়ে আপমন মনে বলত–‘আরে ধৎ! ওই–আওয়াজটা নিয়ে আমি মিছেই ভেবে মরছি। ওটা প্রকৃতপক্ষে চিমনিটার কারসাজি ছাড়া কিছুই নয়। ইদানিং চিমনির বাতাস এমন মিশ্রি আওয়াজ করে বেরোচ্ছে যা আমার মধ্যে অকারণে আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। হ্যাঁ, নির্ঘাৎ চিমনির আওয়াজই বটে।
নিতান্তই যদি চিমনির আওয়াজ না হয়ে থাকে তবে ইঁদুরের ব্যাপার স্যাপার হওয়াও কিছুমাত্রও আশ্চর্যের নয়। ইঁদুর মেঝের ওপর দিয়ে ছুটোছুটি করলেনিস্তব্ধ গভীর রাতে এমন আওয়াজ শোনা যায়। আর তা-ও যদি না হয়, ঝিঁঝি পোকার ডাকও হতে পারে। তারা যখন প্রথম মৃদুস্বরে ঝিঁঝি করে ডাকতে আরম্ভ করে।
খুবই সত্য বটে, সে এমন সব অনুমান-নির্ভর কারণ খতিয়ে খতিয়ে নিজেকে প্রবোধ দিতে চেষ্টা করে।
কিন্তু হায়! তার সব চেষ্টাই বৃথা। নিতান্তই নিষ্ফল চেষ্টা। কেন? কেননিঙ্খল চেষ্টা? কারণ কি? কারণ খুবই স্বাভাবিক। যমরাজ স্বয়ং সে বুড়ো লোকটার দিকে এগোতে এগোতে সামনে কালো ছায়া বিস্তার করেছে। সে ঘন কালো ছায়া দিয়ে নিজের শিকারকে ঢেকে দিয়েছে।
ছায়া! ঘন কালো ছায়া। যমরাজের সৃষ্ট সে ঘন কালো অপ্রত্যক্ষ ছায়ার শোকাবহ প্রভাবের কারণেই নিজের চোখে ভীতি সঞ্চারকারী কিছু না দেখেও, নিজের কানে কিছু না শুনেও বুড়োটা যেন ঘরের ভেতরে আমার মাথাটার উপস্থিতি অনুমান করতে অনুমান নয়, স্পষ্ট বুঝতেই পারত। এ যে কী সমস্যা তা সে নিজে ছাড়া অন্য কারো পক্ষে কিছুমাত্রও ধারণা করা সম্ভব নয়।
আমি এভাবে, নিশ্চল-নিথর-নির্বাক পাথরের মূর্তির মতো দীর্ঘসময় ধরে অবস্থান করার পরও যখন তার নড়াচড়া, অর্থাৎ শুয়ে পড়ার কোনো আওয়াজই কানে এলো না। তখন ভেবে-চিন্তে স্থির করে ফেললাম, লণ্ঠনের ছোট ফাঁকটাকে আরও কিছুটা বড় করে দেব। কিন্তু কাজটা সঙ্গত হবে কি না, আর তাতে কোনো ফল পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে আবারও একটু ভাবলাম।
শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নিয়ে নিলাম, খুবই সতর্কতা অবলম্বন করে লণ্ঠনের ফাঁকটা কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে বুড়ো লোকটার পরিস্থিতিটা নিজের চোখে পরখ করে নেব।
শেষপর্যন্ত করলামও তাই। কিন্তু কত সন্তর্পণে, কত চুপি চুপি যে আমি কাজটা সম্পন্ন করেছি, তা তোমাদের পক্ষে ধারণা করাও সম্ভব নয়।
