উফ! মাথাটাকে ভেতরে ঢোকাতে গিয়ে কী পরিমাণ কসরৎ আর কত যে বুদ্ধি খরচ করতে হয়েছিল, তা আর কারো কাছে বলার মতো না। আর আমার সে কাণ্ডকারখানা দেখলে হাসতে হাসতে তোমাদের পেটে খিল ধরে যেত।
কিভাবে, কোন্ কৌশল অবলম্বন করে আমি দরজার ফাঁক দিয়ে নিজের মাথাটাকে ভেতরে গলিয়ে দিয়েছিলাম, তাই না? বলছি শোন, খুবই সন্তর্পণে, ধীরে ধীরে মাথাটাকে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে গলিয়ে দিলাম। খুবই সন্তর্পণে, যাতে বুড়ো লোকটার ঘুম ভেঙে না যায়। অর্থাৎ কিছুমাত্রও টের না পায়।
ওই ফাঁকা দরজাটা দিয়ে সম্পূর্ণ মাথাটাকে গলিয়ে দিতে আমার একটা ঘণ্টা সময় লেগে গিয়েছিল।
আর এও সত্য যে, খাটের ওপর এলিয়ে শুয়ে-থাকা অবস্থায় তাকে ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছিলাম।
আহা! কোন বিকৃত মস্তিষ্ক কোনো পাগলের পক্ষে কি এমন বিচক্ষণতা ও সতর্কতার সঙ্গে এমন একটা কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব? কোনো পাগলের মাথায় কি এমন পাকা বুদ্ধি থাকা সম্ভব?
তারপরের ব্যাপার স্যাপার বলছি, শোন–আমার মাথাটা যখন দরজার ওই ফাঁকটা দিয়ে ঘরের ভেতরে অনেকখানি ঢুকে গেল, তখন খুবই সাবধানতার সঙ্গে লণ্ঠনটা খুলে দিলাম। উফ্! সে যে কী সতর্কতার সঙ্গে কাজটা করতে হয়েছিল, তা কিভাবে তোমাদের বোঝাতে পারব, ভেবে পাচ্ছি না।
কেন এত সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম? কারণ তো অবশ্যই ছিল। সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, দরজার কজাগুলো কাঁচ-কাঁচ আওয়াজ করে ছিল।
লণ্ঠনটাকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ঠিক এতটুকুই ফাঁক করেছিলাম, যাতে একটামাত্র ক্ষীণ আলোর রেখা শকুন-চক্ষু বুড়োটার ওপর গিয়ে পড়তে পারে।
এক বা দুরাত নয়, দীর্ঘ সাত-সাতটা রাত ধরে আমি ওই কাজটা করেছিলাম। আর প্রতিটি রাতেই ঠিক মধ্যরাতে আমি কাজটা করতাম–কিন্তু রোজই তার সে ভয়ঙ্কর চোখটাকে বোজা অবস্থাতেই দেখতাম, অর্থাৎ সে ঘুমে বিভোর থাকত।
চোখটা বোজা থাকলে তো আর আমার উদ্দেশ্যটা সিদ্ধ করা সম্ভব নয়। আর বুড়ো মানুষটা তো আর আমার শত্রু নয়। বিরক্তির উদ্রেক করে না। আমার যা বিরক্তির কারণ তো তার ওই শকুন-চোখটা। আমার দুচোখের বিষ ওই স্বচ্ছ আবরণে ঢাকা বিবর্ণ নীল চোখটা।
আর রোজ ভোরের আলো ফুটলে আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে গুটি গুটি তার ঘরে ঢুকতাম। আদর করে তার নাম ধরে সম্বোধন করতাম। সুপ্রভাত জানাতাম। ভালো ভালো কথা বলে তার সন্তোষ উৎপাদনের চেষ্টা করতাম। মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে তাকে জিজ্ঞেস করতাম, রাতটা কিভাবে কাটিয়েছে–এরকম আরও কতসব ভালো ভালো কথা বলে তার সঙ্গে সুখালাপ করতাম।
অতএব আশা করি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, বুড়ো মানুষটা প্রখর বুদ্ধি ছিল? প্রমাণ কি? এর আর প্রমাণের দরকার আছে কি? কারণ, তার মনে তো সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে, রোজ রাত ঠিক বারোটায় সে যখন ঘুমে বিভোর থাকত তখন আমি তার ওপর কড়া নজর রাখতাম। আর সে নজর রাখতাম খুবই সতর্কতার সঙ্গে।
হতাশা আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এক-এক করে সাতটা রাত কেটে যাবার পর এলো অষ্টম রাত। সে রাতে দরজার পাল্লা খুলতে গিয়ে আমি অধিকতর সাবধানতা অবলম্বন করলাম। মোদ্দা কথা, সতর্কতার চূড়ান্তও বলা চলে। সত্যি কথা বলতে কি, ঘড়ির মিনিটের কাঁটাও বুঝি আমার চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে।
অষ্টম রাতের আগে পর্যন্ত আমার নিজের শক্তি কতখানি, আমার বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা কতখানি তীক্ষ্ণ হতে পারে, তা আমার নিজেরই ভালো জানা ছিল না।
সত্যি কথা বলতে কি, নিজের বিচক্ষণতায় আমি যারপরনাই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই জয়ের আনন্দ উচ্ছ্বাসকে আমার নিজের পক্ষেই চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ব্যাপারটা একবার গভীরভাবে ভেবে দেখ, আমি খুবই সতর্কতার সঙ্গে অল্প অল্প করে দরজার পাল্লা দুটো ফাঁক করছি। কিন্তু আমার এ অত্যন্ত গোপন কাজ বা পরিকল্পনাটার কথা সে ঘুণাক্ষরেও কিছু ভাবছে না। তার সম্বন্ধে এ কথাটা ভাবতে গিয়েই আমি হয়তো একটু হেসে ফেলেছিলাম। আর সে হাসির শব্দটুকু হয়তো বা তার কানে গিয়েছিল। কেন এ-কথা বলছি? কারণ, তাকে খাটে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ সামান্য নড়েচড়ে উঠতে দেখে ছিলাম।
এরকম পরিস্থিতির কথা অনুমান করে তোমরা হয়তো ভেবেই নেবে যে, আমি হঠাৎ সেখান থেকে সরে গিয়েছিলাম–আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়।
ডাকাতের ভয়ে অন্যদিনের মতোই তার ঘরের খড়খড়ি বন্ধ করে রাখা ছিল। আর এরই ফলে তার ঘরে অন্ধকার বিরাজ করছিল। অতএব আমার ভালোই জানা ছিল– নিঃসন্দেহই ছিলাম যে, দরজা ফাঁক-করা বা খোলার ব্যাপারটা অবশ্যই তার নজরে পড়বে না। এরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে আমি দরজার পাল্লা দুটোতে অল্প অল্প করে ধাক্কা দিতে আরম্ভ করলাম। এত বেশি সতর্কতা অবলম্বনের কারণ তো আগেই বলেছি, দরজার পাল্লা খোলার সময় কাঁচ্-কাঁচ্ আওয়াজ করে।
দরজার সিটকিনিটা খুলে, পাল্লা দুটোকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ফাঁক করে ধীরে ধীরে মাথাটা ভেতরে গলিয়ে দিলাম। এবার যেই না লণ্ঠনটা খুলতে যাব অমনি সামান্য অসাবধানতাবশত আচমকা সেটার গায়ে আমার বুড়ো আঙুলটার ধাক্কা লাগল।
ব্যস, ঠিক সে মুহূর্তেই বুড়ো মানুষটা যন্ত্রচালিতের মতো তড়াক করে লাফিয়ে বিছানায় বসে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল–কে? কে?
