‘না। এত বড় একটা কর্মযজ্ঞ একজনের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।’
‘তাই যদি সত্যি আর গুপ্তধন যদি কিডের নেতৃত্বেই ওখানে মাটির তলায় লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে থাকে। যাক গে, যে কথা বলছিলাম, ধন রত্ন মাটির তলায় লুকিয়ে রাখার পর তার মাথায় হয়তো মতলব এসেছিল এ-কাজের যারা সাক্ষী তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে না ফেললে ভবিষ্যতে প্রবঞ্চিত হতে হবে। তখন চোখের পানি ফেলে বুড়ো আঙুল চোষা ছাড়া কোনো উপায়ই থাকবে না। তাই সহযোগিদের হত্যা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর তা অতিসহজেই এবংনির্বিঘ্নেই সম্পন্ন করে ফেলা যেতে পারে। এরকম চিন্তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য কোদালের একটা ঘা-ই যথেষ্ট। তিনি কার্যত তা-ই করেছিলেন কি না তা-ই বা কে জানে। আবার দশ-বারোটা আঘাতও লেগে যাওয়াও অসম্ভব নয়।
দ্য টেল-ট্যালি হাট
সত্যি!
সম্পূর্ণ সত্যি কথা বলছি। আমি খুবই সামান্যই বিচলিত হয়েছিলাম, আর এখনও সে অবস্থাতেই রয়েছি।
আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে; আমি পাগল হয়ে গেছি, এ-কথা তোমরা কেন বলবে?
রোগটা আমার মধ্যে আশ্রয়গ্রহণ করে আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে প্রখর করে তুলেছে। তবে এও অবশ্যই সত্য যে, রোগটা কিন্তু আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে বরবাদ করে দেয়নি– ভোঁতাও করে দেয়নি।
সর্বাধিক লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হচ্ছে, আমার শ্রবণেন্দ্রিয় হয়ে উঠেছিল তীক্ষ্ম, আমি স্বর্গলোক ও মর্ত্যলোক–উভয়লোকের কথাবার্তাই পরিষ্কার শুনতে পেতাম।
অনেকের মুখে আমার নাকটা সম্বন্ধেও বহু কথা শুনতাম। তবে? তাই যদি হয়, তবে আমি কি করে পাগল হলাম, বল তো? উত্তর্ণ হয়ে শোন! ধীর স্থিরভাবে লক্ষ্য কর! কতই না শান্ত-ধীর স্থিরভাবে সম্পূর্ণ কাহিনীটা তোমাদের দরবারে পেশ করতে পারছি; একটাবার ভেবে দেখ তো?
এরকম ধারণাটা কি করে যে আমার মাথায় প্রথম ভর করেছিল তা সঠিকভাবে বলা আমার পক্ষে মুশকিল। তবে কোনোরকমে একবার মাথায় আসামাত্র আমাকে রাত দিন অনবরত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল। সত্যি কথা বলতে কি, আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও টিকতে দিত না।
কোনোরকম আবেগ-উচ্ছ্বাস তো ছিলই না, এমনকি কোনো বস্তুও ছিল না। মোদ্দা কথা, বুড়োটাকে আমি ভালোবাসতাম। অন্তরের সবটুকু ভালোবাসানিঙড়েই তাকে আমি ভালোবাসতাম।
স্বীকার করতেই হবে, সে কোনোদিন ভুলেও আমার এতটুকু অনিষ্ট করেনি। আমার ওপর অন্যায়-অবিচার করেনি। এমনকি কোনোদিন আমাকে অপমান তো করেইনি, অপমান করতে পারে এমন কোনো লোককে এতটুকুও প্রশ্রয় দেয়নি।
সে বুড়ো ছিল প্রচুর সোনাদানার মালিক। কিন্তু তার সে সোনার ওপর আমার এতটুকুও লোপ ছিল না। অর্থাৎ সে দিকে আমর এতটুকু নজরও ছিল না।
তবে? তবে কেন বুড়োটাকে আমি এখন মনে-প্রাণে ভালোবাসতাম?
আমার ধারণা, আসল জিনিসটা হচ্ছে, তার চোখ দুটো-না, দুটো নয়, বিশেষ করে একটা চোখের কথা বলছি।
কেন? তার সে বিশেষ চোখটার বিশেষত্ব কি ছিল যার ফলে সেটা আমার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল? হ্যাঁ, ঠিকই বলছি–শতকরা একশো ভাগ সত্যি।
তার একটা চোখ ছিল শকুনের মতো, অবিকল শকুনের একটা চোখ উপড়ে নিয়ে এসে বুঝি বা তার চোখের কোটরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্যাকাশে নীল চোখ। তার ওপর স্বচ্ছ আবরণ।
সে চোখে আমার দিকে তাকালেই আমার বুকের ভেতরে ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে যেত, আর গায়ের রক্ত হিম হয়ে যেত।
সে জন্যই তো আমার চরমতম আতঙ্কের কারণ সে বুড়োটাকে চিরদিনের মতো শেষ করে দেবার জন্য আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বসলাম। আর তার মৃত্যুর মাধ্যমেই আমি সে চোখের ভয়ঙ্কর দৃষ্টি থেকে চিরদিনের মতো অব্যাহতি পেয়ে যাব। হ্যাঁ, তাকে প্রাণে মারার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই আমি নিয়ে নিলাম।
আর এটাই আসল বক্তব্য।
তোমরা তো নিশ্চিত যে, আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে, আমি পাগলই হয়ে গেছি। পাগলরা তো কিছুই জানে না। আরে বাবা, তোমরা তো আমাকে দেখেছ। আর এও তো অবশ্যই দেখেছ, কেমন বিজ্ঞের মতো আমি দৃঢ়ভাবে কতই না সতর্কতার সঙ্গে আমি অগ্রসর হয়েছি, কত দৃঢ় দৃষ্টির সঙ্গেই না প্রতিটা ধাপ অগ্রসর হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আর কতখানি কপটতার সঙ্গে কাজে লেগে রয়েছি।
আমি তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই নিয়ে নিয়েছি, বুড়ো লোকটাকে খতম করে দেবার আগে পুরো সপ্তাহটা ধরে তার প্রতি আমি যতটা সদয় ব্যবহার করেছি, মমত্ববোধের পরিচয় দিয়েছি, সেরকম তো ইতিপূর্বে কোনোদিনই করিনি।
প্রতি রাতে, প্রায় মধ্য রাতে, তার দরজার সিটকিনিটা খুবই যত্নের সঙ্গে, কৌশলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটাকে খুলেছি। কত যে সতর্কতার সঙ্গে, কতই না ধীরে ধীরে সেটাকে আমার পক্ষে ভোলা সম্ভব হয়েছিল, উফ! কী পরিস্থিতিতে যে আমাকে কাজটা সারতে হয়েছিল, তা আমি ছাড়া কেউই জানে না, কাউকে বলে বোঝানোও যাবে না।
সিটকিনিটা কোনো রকমে খোলার পর যখন মাথাটাকে ভেতরে গলিয়ে দেবার উপযুক্ত একটা ফাঁক তৈরি করা সম্ভব হলো তখন পুরোপুরি ঢাকা অন্ধকার একটা লণ্ঠন ওই ফাঁকটা দিয়ে ঘরের ভেতরে গলিয়ে দিলাম। পুরোপুরি ঢাকা অন্ধকার লণ্ঠন ব্যবহার করার উদ্দেশ্য যাতে এতটুকু আলোও বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে।
হ্যাঁ, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছে। এবার দরজার ওই ফাঁক দিয়ে খুবই সন্তর্পণে আমার মাথাটাকে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম।
