সত্যি ওই সাদা দাগটাকে নিয়ে আমি রীতিমত ধন্দে পড়ে গেলাম। এবার মুশকিল আসানের জন্য দূরবীক্ষণ যন্ত্রের ফোকাসটাকে যথাসাধ্য ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করলাম। তারপর আবার যন্ত্রটায় চোখ লাগিয়েই চমকে উঠলাম। আপন মনেই বলে উঠলাম, এ কী! এ একটা মাথার খুলি!’ নিঃসন্দেহ হবার জন্য আবারও সে দিকে তাকালাম। দেখলাম, সত্যি মাথার খুলিই বটে।
এতখানি এগিয়ে, এতকিছু আবিষ্কার করার পর আমি তা মোটামুটি নিঃসন্দেহই হয়ে পড়লাম, ধাঁধাটার সমাধান হয়েই গেল। কারণ, প্রধান শাখা থেকে সপ্তম প্রশাখা আর পূর্বদিকে’ বলা একমাত্র গাছটার ওপর মড়ার খুলিটা যেখানে রয়েছে সে জায়গাটা নির্দেশ করা। হতে পারে। এবার রইল ‘মড়ার খুলির বাঁ চোখ থেকে গুলি করার ব্যাপারটা, ঠিক কিনা?
আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলাম—
‘হ্যাঁ।’
‘নির্দেশ আছে মড়ার খুলির বাঁ চোখ থেকে গুলি কর’। সবগুলো কথা এক সঙ্গে জড়ো করলে খোঁজ খবর সম্বন্ধে একটা মাত্র অর্থই বেরিয়ে আসে।
সবকিছু বিচার-বিবেচনা করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, মড়ার খুলির বাঁ চোখের কোটরের ভেতর দিয়ে একটা বন্দুকের গুলিকে গলিয়ে গলিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে হবে। সেটা গাছটার গোড়া থেকে যত দূরে, যেখানে পড়বে সে পর্যন্ত একটা সরল রেখা টানলে এবং সেটাকে পঞ্চাশ ফুট পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলে বিন্দুর উদ্ভব হবে সেটাই বাঞ্ছিত স্থান যার তলায় গুপ্তধন পোঁতা রয়েছে।
আমি সবিস্ময়ে বলে উঠলাম–আরে বাবা! তোমার উদ্ভাবনী শক্তির প্রশংসা না করে পারছি না বন্ধু।
সে চুরুটটার শেষাংশ লম্বা একটা টান দিয়ে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে বলল–‘আগেই তো বলেছি, গোড়ার দিকে ধাঁধাটা নিয়ে আমি খুবই সমস্যায় পড়েছিলাম। পরে কাজে নামার পর একটা একটা করে গিঁট খুলতে গিয়ে দেখলাম, এটাকে যতটা কঠিন ভেবেছিলাম আসলে তা নয়।’
আমি চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপটুকু অব্যাহত রেখেই বললাম–সবই আমার কাছে খোলসা হয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটা কৌশলের জালে জড়িয়ে রাখা হলেও প্রকৃতপক্ষে কিন্তু খুবই সহজ-সরল। একটু ধৈর্যের সঙ্গে, বুদ্ধি খরচ করে রহস্যটার সমাধান করার চেষ্টা করলে কাজ হাসিল হবেই হবে। আর একটা কথা, আপনি তো বিশপের হোস্টেল ছেড়ে গেলেন। তারপর।
একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি, বিশপের হস্টেলে আমি একা যাইনি। সঙ্গি হিসেবে নিগ্রো ভৃত্য জুপিটার ছিল। আসলে তখন সে আমাকে একা কোথাও যেতে দিত না।
কিন্তু পরদিন সূর্য ওঠার মুখে মুখে আমি তাকে কিছু না বলে লুকিয়ে পাহাড়টার উপরে চলে যাই। দীর্ঘ সময় ধরে, বহু কষ্ট স্বীকার করে হণ্যে হয়ে খোঁজাখুঁজির পর বাঞ্ছিত গ্রন্থটাকে খুঁজে বের করতে পারলাম।
কাজ হাসিল করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। আমাকে দেখেই জুপিটার তো রেগে একেবার অগ্নিমূর্তি ধারণ করল। এমনকি একটা লাঠি নিয়ে তেড়ে এলো। মারবে বলে রীতিমত শাসাল। হয়তো মেরেই বসত। কিন্তু আমি মুখ কাচুমাচু করে এমন অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম যা দেখে সে মাথার ওপর থেকে লাঠিটাকে নামিয়ে না নিয়ে পারল না। যা কোনো রকমের সে যাত্রায় বেঁচে গেলাম।
মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি এবার বললেন–‘যাক গে, অভিযানের যা-কিছু কথা তো আপনিও জানেন।
‘হ্যাঁ তা জানি বটে। তারপর আমি না বলে পারছি না, আপনার বাগ্মিতা আর ওই ঝি ঝি পোকাটাকে নিয়ে যা-কিছু করেছেন তা কি অদ্ভুত নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমরা; বিশেষ করি আমি তো রীতিমত নিঃসন্দেহই হয়ে পড়েছিলাম, আপনার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। একটা কথা জানার জন্য আমি উৎকণ্ঠা বোধ করছি মি. লিগ্র্যান্ড আপনি কি অনুগ্রহ করে
তিনি মুচকি হেসে বললেন–এত ভনিতার কি আছে, বুঝছি না তো? কি আপনার জিজ্ঞাস্য নির্দিধায় বলতে পারেন?
‘মড়ার খুলির চোখের কোটরের ভেতর দিয়ে বন্দুকের গুলির পরিবর্তে ঝি ঝি পোকাটাকে মাটিতে ফেলার জন্য আপনার এত জোরাজুরি করার কারণ কী ছিল? সেটাকে নাচালেনই বা কেন? ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই আমার নজর এড়ায়নি যে, আমার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্বন্ধে আপনি এত বেশি সন্দেহ করতে লাগলেন যা দেখে আমি ভেতরে ভেতরে খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লাম। আর এরই জন্য আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে সাধ্যাতীত রহস্যমণ্ডিত করে তুলে, আপনাকে গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে আপনাকে একটু শাস্তি দেব। আর একই কারণে, কিছুমাত্র প্রয়োজন ছাড়াই আমি ঝি ঝি পোকাটাকে দীর্ঘ সময় ধরে নাচিয়েছিলাম। আর একই কারণে সেটাকেই মড়ার খুলির চোখের কোটরের ভেতর দিয়ে মাটি ফেলার ব্যবস্থা করেছিলাম। আশা করি এবার আপনার জিজ্ঞাসা দূর করতে পেরেছি।’
‘হ্যাঁ। তবে পুরোপুরি নয়, আংশিক।’
‘আংশিক। আপনি আর কী জানতে চাইছেন?
‘ওই নরকঙ্কালটার ব্যাপারে আমার একটা জিজ্ঞাস্য আছে।
তিনি হেসে বললেন ‘হ্যাঁ, নরকঙ্কালটার ব্যাপারে আমি কোনোই আলোকপাত করিনি বটে। ভালো কথা, ওটার ব্যাপারে কী জানতে চাইছেন, বলুন?
‘ওখানে, মাটির তলায় নরকঙ্কাল কী করে এলো?’
‘দেখুন, এটা যেমন আপনার কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে, আমার কাছেও ঠিক তাই। আসলে এর উত্তর আপনার মতো আমারও জানা নেই। তবে চিন্তা-ভাবনা করে এরও একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু ব্যাপারটা এমনই নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক যে, বিশ্বাস করা বড়ই কঠিন। একটা কথা তো অবশ্যই স্বীকার্য যে, ক্যাপ্টেন কিড একদম একা এত বড় একটা কাজ করেননি। এক বা একাধিক সহযোগি অবশ্যই তার ছিল, ভুল বলছি?
