আমি ব্যাপারটা সম্বন্ধে কোনো ধারণাই নিতে না পারায় চোখে-মুখে হতাশার ছাপ এঁকে তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে নীরবে তাকিয়ে রইলাম।
আমার অসহায় অবস্থার কথা বুঝতে পেরে বন্ধু লিগ্র্যান্ড আবার বলতে লাগলেন–‘আমিও দিন-কয়েক আপনার মতো হতাশায়, তিমিরেই ডুবেছিলাম। এবার আমার কাজ হলো সুলিভান দ্বীপের ধারে-কাছে ‘বিশপের হোস্টেল’ নামক কোনো বাসস্থান আছে কিনা খুঁজে বের করা। তবে ‘হোস্টেল’ শব্দটার প্রচলিত অর্থটাকে মন থেকে মুছে ফেললাম।
এক সকালে অন্যমনস্কভাবে পায়চারি করতে করতে একেবারেই আচমকা আমার মনে পড়ে গেল, দ্বীপটার উত্তর প্রান্তে, প্রায় চার মাইল দূরবর্তী অঞ্চলে ‘বেসপ নামধারী এক পুরনো পরিবারের একটা পুরনো জমিদার বাড়ির মালিক তো আছে। তার সঙ্গে হোস্টেল শব্দটা জুড়ে দেওয়ায় ‘বিশপের হোস্টেল’ কথাটার উদ্ভব হয়েছে। এটা অস্বাভাবিক নয়।
ব্যস, আমিনিগ্রোদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করতে করতে এক বৃদ্ধার সামনে হাজির হলাম। তিনি বললেনড়বাছা, ‘বেসপ খ ক্যাসল’ নামক একটা জায়গার কথা আমি শুনেছি। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে সঙ্গে করে সেখানে নিয়েও যেতে পারি।’
‘বুড়িমা, তুমিই আমাকে নিয়ে যাবে?
‘বললাম তো, তুমি চাইলেই নিয়ে যাব। কিন্তু বাছা, সেটা কিন্তু আসলে কোনো প্রাসাদ বা দুর্গ কোনোটাই নয়।
‘তবে?’
‘একটা উঁচু পাহাড়ের নাম ‘বসপ-খ ক্যাস।
সে তো নিজে থাকতেই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েই রয়েছে, তার ওপর তার সময় নষ্ট ও পরিশ্রমের মজুরি স্বরূপ কিছু অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেই সে আমাকে নিয়ে বাঞ্ছিত পর্বতটার উদ্দেশে হাঁটা জুড়ল।
আমি তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম।
জায়গাটায় পৌঁছাতে আমাকে বেশি পরিশ্রম করতে হলো না। কাছাকাছি পৌঁছে বাঞ্ছিত জায়গাটার হদিস পেয়ে আমি বুড়িটার হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে তাকে বিদায় করে দিলাম।
আমি লম্বা-লম্বা পায়ে এগিয়ে এমন একটা জায়গায় হাজির হলাম যেখানে ছোট বড় কয়েকটা পাহাড় ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না।
আমি টুকরো-টুকরো অনেক কথা ভাবতে ভাবতে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টার ওপরে উঠে গেলাম। কিন্তু এবার আমার কর্তব্য কি হঠাৎ করে স্থির করে উঠতে পারলাম না।
পর মুহূর্তে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়েই চারদিকে চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিতে নিতে হঠাই আমার চোখে পড়ে গেল পাহাড়ের গায়েরই একটা তাকের দিকে।
আমি মুহূর্তমাত্র দেরি না করে হন্তদন্ত হয়ে পাহাড়টার পূর্বদিককার সে তাকটার কাছে হাজির হলাম।
দেখলাম, তাকটা বাইরের দিকে প্রায় আঠারো ইঞ্চি বেরিয়ে রয়েছে। এক ফুটের বেশি প্রস্থ নয়। আর তার ঠিক ওপরে পাহাড়েরগায়ে একটা কুলুঙ্গি থাকায় সেখানে অবিকল আমাদের পূর্বসূরীদের ব্যবহৃত পিঠওয়ালা চেয়ারের মতো দেখতে।
চেয়ার-আসন! চেয়ারটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই আমি ভাবতে লাগলাম, পাণ্ডুলিপিটায় যে ‘অপদেবতার আসন’-এর উল্লেখ রয়েছে, এ-চেয়ারটাই তার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ব্যস, আসনের রহস্যটাও আমি উদ্ধার করে ফেললাম। এবার আমার নজর পড়ল ভালো কাঁচ কথাটার দিকে। ভাবলাম, ‘ভালো কাঁচ’ বলতেনির্ঘাৎ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কথাই বলা হয়েছে। আমি জানি, অন্য কোনো অর্থ বোঝাতে জাহাজের নাবিকরা কাঁচ শব্দটা ব্যবহার করে না।
আমি যখন ‘কাঁচ’ আর দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কথা ভাবছি ঠিক তখনই নজরে পড়ল বিশেষ পদ্ধতিতে একটা বড়-সড় একটা দূরবীক্ষণ যন্ত্রকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।
আর আমি নির্দিধায় বিশ্বাস করে নিলাম, দূরবীক্ষণ যন্ত্রটাকে বসাবার দিক নির্দেশ করার জন্যই একচল্লিশ ডিগ্রি ও ত্রিশ মিনিট আর উত্তর ও উত্তরপূর্ব কথাগুলো বলা হয়েছে।
এবার এসব আবিষ্কারের ফলে আমি দ্রুত বাড়ি ফিরে গেলাম। তখন আমার সবচেয়ে বড় কাজ একটা দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে পাহাড়ের ওপর হাজির হওয়া। করলামও তা-ই।
তারপর আমি পাহাড়ের ওই তাকটার ওপর নেমে গেলাম। নামার পর বুঝতে পারলাম, বিশেষ একটা কায়দায় ছাড়া সেখানে কিছুতেই বসা সম্ভব নয়। আমার অনুমান অনুযায়ীই প্রকৃত ব্যাপারটা মিলে গেল।
আমার এবারের কাজ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটাকে নির্দেশ অনুযায়ী স্থাপন করা। ‘একচল্লিশ ডিগ্রি আর ত্রিশ মিনিট কথা দুটোর কথা ভেবে দেখলামনির্ঘাৎ দিকচক্ররেখা থেকে উচ্চতার পরিমাপের কথাই নির্দেশ করেছে। এ ছাড়া অন্য কোনো কিছু তো নয়। যদি উত্তর-পূর্ব কথাটার কথা বিবেচনা করা হয় তবে দেখা যাবে, দিকচক্রের কথাই স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। অবশ্যই, এ ছাড়া অন্য কিছু তো ভাবাই যায় না।
ব্যস, আর এক মুহূর্তও দেরি না করে জ্যাকেটের পকেট থেকে কম্পাস যন্ত্রটা বের করে নিলাম। সেটার সাহায্যে বাঞ্ছিত উত্তর-পূর্ব দিকটানির্ণয় করে ফেললাম।
দিক নির্ণয়ের কাজ তো হল। এবারের শব্দ দূরবীক্ষণ যন্ত্রটাকে একচল্লিশ ডিগ্রি কোণের উচ্চতায় ধরে সতর্কতার সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ওঠা-নামা করাতে লাগলাম।
এভাবে দূরবীক্ষণের মুখটাকে বারবার ওঠা-নামা করাতে করাতে গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে একটা বেশ বড়সড় ফাঁকা জায়গা নজরে পড়ল। আর সেটার দিকে গভীর আগ্রহে অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে থাকার পর একটা সাদা দাগের দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। গোড়ার দিকে ব্যাপারটা মোটেই আমার মাথায় ঢুকল না।
