আমার ধারনাটা সত্য হলেও হতে পারে ভেবে পার্চমেন্ট কাগজটাকে গরম পানিতে ধুয়ে ফেললাম। এবার একটা শুকনো তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে মুছে নিয়ে মড়ার খুলিটাকে নিচের দিকে রেখে সেটাকে একটা টিনের পাতের ওপর পেতে দিলাম। এবার সেটাকে জ্বলন্ত চুল্লিটার ওপর মিনিট কয়েকের জন্য রাখলাম।
অল্পক্ষণের মধ্যেই টিনের পাতটা গরম হয়ে গেলে সেটাকে চুল্লির ওপর থেকে নামিয়ে আনলাম।
ব্যস, কাগজটার দিকে আমার চোখ পড়তেই আমি বিকট চিৎকার করে, পাগলের মতো নাচতে শুরু করলাম।
‘এমন আকস্মিক উল্লাসের কারণ, জানতে পারি কী?
‘আমার উল্লাসের কারণ, পার্চমেন্ট কাগজটার গায়ে এমন কতগুলো বিন্দু স্পষ্ট হয়ে উঠল, সেগুলোকে সারিবদ্ধ কিছু সংখ্যক সংখ্যা বলেই মনে হল। পার্চমেন্ট কাগজটাকে আবার টিনের পাতটার ওপর ভালোভাবে পেতে আরও মিনিটখানেক অপেক্ষা করলাম। তারপর টিনের পাতটা থেকে তুলে চোখের সামনে ধরতেই পুরো চিত্রটা আমার চোখের সামনে ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। আপনি এ মুহূর্তে ঠিক যেমনটা দেখতে পাচ্ছেন।
বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড পার্চমেন্ট কাগজটা আবার টিনের পাতটার ওপর রেখে উপযুক্ত সময় ধরে গরম করে নিয়ে আমার চোখের সামনে মেলে ধরল। তারপর সেটাকে আমার হাতেই তুলে দিল।
আমি কৌতূহল মিশ্রিত উৎসাহের সঙ্গে তার হাতে ধরে-রাখা কাগজটার ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। দেখলাম, মড়ার খুলি আর ছাগলের চিত্রটার মধ্যবর্তী অঞ্চলে লাল রঙবিশিষ্ট প্রায় আড়াই সারি সংখ্যা আর বিভিন্ন চিহ্নের সমন্বয়ে গঠিত একটা চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আমি কপালের চামড়ায় পরপর কয়েকটা চিন্তার রেখা এঁকে এবং জ দুটো কুঁচকে সংখ্যা ও চিহ্নগুলোর মর্মার্থ উদ্ধার করার ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে লাগলাম। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে পার্চমেন্ট কাগজের টুকরোটা বন্ধু লিগ্র্যান্ডের হাতে ফিরিয়ে দিলাম।
কাগজটা তার হাতে তুলে দিয়ে ম্লান হেসে বললাম ‘কিন্তু বন্ধু, আমি তো যে তিমিরে ছিলাম সে তিমিরেই রয়ে গেলাম। একটা বর্ণও যে আমি উদ্ধার করতে পারলাম না।
সে নীরবে ছোট্ট করে হাসল।
আমি বললাম–‘বন্ধু, এ-ধাঁধাটার সমাধান করা সম্ভব হলে যদি সমগ্র বিশ্বের যাবতীয় ধন-রত্ন আমার হস্তগত হত তবুও তা অর্জন করা আমার পক্ষে সম্ভব হত না। এ-কথা আমি বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি।
আমার বন্ধু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বলল দেখুন, সংখ্যাগুলোকে মাত্র এক ঝলক দেখে নিয়ে আপনি যত অবোধ্য ভাবছেন, আসলে কিন্তু মোটেই তা নয়। একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে যে কারোর পক্ষেই ধারণা করে নেওয়া সম্ভব যে, এ সংখ্যাগুলো আসলে সাধারণ মানুষের পক্ষে অবোধ্য এক বিশেষ ধরনের সাংকেতিক চিহ্ন ছাড়া কিছু নয়। আমি বলতে চাচ্ছি, সংখ্যাগুলো একটা বিশেষ নির্দেশ করছে, বুঝেছেন?’
আমি সে মুহূর্তে এ কথার কি জবাব দেব ভেবে না পেয়ে নীরবে তার পরবর্তী বক্তব্য শোনার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় রইলাম।
তিনি বলে চললেন–দেখুন ভাই, ক্যাপ্টেন কিড সম্বন্ধে যেটুকু শুনেছি, তিনি যে খুব কঠিন গাণিতিক ধাঁধা তৈরি করতে পারতেন বলে আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। তাই আমি ছকটা দেখামাত্রই বুঝে নিলাম, ধাঁধাটা খুবই সহজ-সরল। তবে এও স্বীকার করতেই হবে, একজন ভোতা বুদ্ধি নাবিকের পক্ষে এমন একটা ধাঁধার সমাধানের সূত্রটা একেবারেই অজানা থাকলে অর্থ বের করা সম্ভব নয়–একেবারেই নয়।
একটা কথা, আপনি কী সত্যি সত্যি ধাঁধাটার সমাধান করেছিলেন মি. লিগ্র্যান্ড?
‘আরে ভাই, মুহূর্তের মধ্যেই।
আমি স্ববিস্ময়ে বললাম–‘মুহূর্তের মধ্যেই!
‘অবশ্যই। সত্যি কথা বলতে কি, এর চেয়ে দশ হাজার গুণ শক্ত ধাঁধার সমাধান আমি ইতিপূর্বে বহুবারই করেছি। একটা কথা তো আর অস্বীকার করার নয় যে, মানুষের যে-মাথা ধাঁধার জন্মদাতা, সেই মানুষই সঠিক পথে ধৈর্যের সঙ্গে অগ্রসর হলে তার সমাধান অনায়াসেই করা সম্ভব। আসল কথা হচ্ছে, সঠিক পথটা খুঁজে বের করা।’
‘কিন্তু সঠিক পথটাই তো ধরা’
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে লিগ্র্যান্ড বলে উঠলেন–‘এবার এ ধাঁধাটার ব্যাপারে, প্রকৃতপক্ষে যাবতীয় সাংকেতিক চিহ্নের ব্যাপারেই সাংকেতিক চিহ্নটার সমাধানের উপায়টা স্থির করাই প্রথম ও প্রধান বাধা। আমাদের আলোচ্য ধাঁধাটার যত কিছু বাধা সবই ওই স্বাক্ষরটাই সমাধান করে দিয়েছে। আর এর কিড শব্দটার মধ্যে যে দু-দুটো অর্থ লুকিয়ে রয়েছে, কেবলমাত্র ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় বুঝে অর্থ নির্ণয় করা সম্ভব হত না। আমি যদি গোড়াতেই এ শব্দটার অর্থ উদ্ধার করতে না পারতাম তবে আমাকে হয়তো ফরাসি বা স্পেনীয় ভাষাই হাতড়ে বেড়াতে হত।
‘এত ভাষা থাকতে ফরাসি আর স্পেনীয় ভাষার কথা বলার কারণ কি, জানতে পারি কী?
‘কারণ অবশ্যই আছে, আমার বন্ধু ছোট্ট করে হেসে বললেন–কারণটা কি বলছি, স্পেনীয় জলদস্যুদের পক্ষে এরকম সাংকেতিক চিহ্ন ওই দুটো ভাষার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, তবে এ ব্যাপারে আমি অবশ্য ইংরেজি ভাষাটাকেই অবলম্বন করেছিলাম।
আমি দীর্ঘ সময় ধরে ধাঁধাটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে যে অর্থ উদ্ধার করলাম তা হচ্ছে–‘অপদেবতার আমলের বিশপের হোস্টেলের ভালো কাঁচ এক টুকরো। একচল্লিশ ডিগ্রি ত্রিশ মিনিট উত্তর-পূর্ব আর উত্তর প্রধান ডালের সপ্তম ডালের পূর্ব দিকে, মড়ার মাথার খুলির বাঁ চোখ থেকে গুলি চালিয়ে দাও। গাছটা থেকে মৌমাছির রেখার পঞ্চাশ ফুট দূরে।’
