স্পষ্ট হয়ে উঠল যাকে প্রথমে একটা ছাগল ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারিনি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিঃসন্দেহ হলাম কোনো একটা কিড (kid)-এর জন্য এটা আঁকা হয়েছিল।
বন্ধুর কথায় আমার দারুণ হাসির উদ্রেক হল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে সুমলে নিয়ে আমি বললাম–‘মি. লিগ্র্যান্ড আপনার কথায় আমার হাসার অধিকার নেই। এ তো আর মিথ্যে নয় যে, পনেরো কোটি টাকা তো আর হেসে উড়িয়ে দেবার ব্যাপার নয়। কিছু মনে করবেন না, কথাটা না বলে পারছি না।’
তিনি বিস্ময়-মাখানো জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আমার মুখের দিকে তাকালেন।
আমি সাহসে ভর করে আচমকা বলে উঠলাম–‘আপনি এবার নির্ঘাৎ জলদস্যু আর ছাগলের মধ্যে একটা যোগসূত্রের কথা পেড়ে বসবেন। তবে আশা করি, আপনার অবশ্যই জানা আছে যে, জলদস্যু আর ছাগলের মধ্যে কোনো সম্পর্কই আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই।’
‘আরে ভাই, আমি তা একটু আগেই আপনাকে বললাম, ওটা ছাগলের মূর্তি নয়।
‘তা যদি হয়ও ছাগল আর ছাগল ছানার মধ্যে কতটুকুই বা পার্থক্য? অনেকটা তো একই রকম।
‘অনেকটা একই রকম আর সম্পূর্ণ অভিন্ন তো আর এক কথা নয়–’
লিগ্র্যান্ড একটু বেশ গম্ভীর স্বরেই কথাটা ছুঁড়ে দিলেন। মুহূর্তের জন্য থেমে তিনিই আবার মুখ খুললেন–আশা করি কোনো এক ক্যাপ্টেন কিডের কথা আপনি শুনেছেন, কী বলেন?
আমি নীরবে ঘাড় কাৎ করে তার কথার জবাব দিলাম।
তিনি বলে চললেন–‘আমি কিন্তু, পার্চমেন্ট কাগজের মড়ার খুলির গায়ের জন্তুটাকে এক বিশেষ দ্ব্যর্থবোধক চিহ্ন বা কারো স্বাক্ষর বলেই মনে করলাম। আমার স্বাক্ষর বলার অর্থ এই যে, পার্চমেন্ট কাগজটার গায়ে তার অবস্থানই আমাকে এরকম ভাবতে উৎসাহিত করেছে। আর একই ধারণার বশবর্তী হয়ে একেবারে কোণাকুণি, বিপরীত দিকে অবস্থিত মড়ার খুলিটাকেও আমি কোনো একটা প্রতীক বা মোহর মনে করেছিলাম। তবে এও খুবই সত্য যে, আমার কল্পিত চিঠির অবশিষ্ট অংশটা পার্চমেন্ট কাগজটার ওপর অনুপস্থিত দেখে আমি মনের দিক থেকে খুবই ভেঙে পড়লাম।
আমি বন্ধুর কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে বললাম–‘মনে হচ্ছে, স্বাক্ষর ও মোহরের মধ্যবর্তী অংশে একটা চিঠি দেখতে পাবেন বলেই আপনার বিশ্বাস ছিল, কী বলেন?
‘হ্যাঁ, প্রায় সে রকমই বটে। মোদ্দা কথা হচ্ছে, বিরাট একটা সম্পত্তি লাভের প্রত্যাশা তখন আমার মন-প্রাণ জুড়ে ছিল। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে কিন্তু আমি সঠিক জবাব আপনাকে দিতে পারব না। কিন্তু ঝি ঝি পোকাটা যে নিরেট সোনার তা কী আপনার জানা আছে?
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বন্ধুর এ অর্থহীন কথাগুলো আমার কল্পনাকে দারুণ প্রভাবিত করেছিল। তা ছাড়াও একের পর এক কতগুলো আকস্মিক ঘটনা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক–একে রীতিমত অসাধারণ ছাড়া আর কি-ই বা বলা যেতে পারে? এবার আমার দিকে তাকিয়ে একেবারে সরাসরিই কথাটা ছুঁড়ে দিল’-আর একটা ব্যাপার কি আপনার নজরে পড়েছে যে, এতগুলো ঘটনা একের পর এক যেদিন ঘটে গেল সেদিন ঠাণ্ডা এমনই জাঁকিয়ে পড়েছিল যে, চুল্লিতে আগুন না জ্বেলে ঘরে বসাই দায় হয়ে পড়েছিল? এবার ভেবে দেখুন তো চুল্লিটা জ্বালা না থাকলে আপনি চুল্লিটার কাছে না বসলে, আমার প্রিয় কুকুরটা ঘরে ঢুকে লাফিয়ে আপনার কাঁধে উঠে না পড়লে কি আপনি পার্চমেন্ট কাগজটাকে আগুনের কাছে নিয়ে যেতেন, বলুন? আর আপনি যদি তা না-ই নিতেই তবে মড়ার খুলির কথা আমার পক্ষে জানা সম্ভব হত না। আর অগাধ ধন সম্পদের অধিকারীও আমরা কিছুতেই হতে পারতাম না।’
‘মি. লিগ্র্যান্ড, চালিয়ে যান। চালিয়ে যান! আমার পক্ষে আর ধৈর্য ধরা সম্ভব হচ্ছে । যা বলার তাড়াতাড়ি বলে আমার উৎকণ্ঠা দূর করুন।
‘ঠিকআছে! আমি সাধ্যমত আপনার জিজ্ঞাসা দূর করার চেষ্টা করছি। ক্যাপ্টেন কিড আর তার সাগরেদরা আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলবর্তী কোনো এক স্থানে অপরিমিত ধন-সম্পদ মাটির তলায় লুকিয়ে রেখেছে–এরকম হাজার হাজার মুখরোচক গল্প আর গুজব অবশ্যই আপনার শোনা থাকবে, আমি বলব, এসব প্রচলিত গল্পের বাস্তব সত্যতা অবশ্যই ছিল আর আজও আছে। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক
কেন সে সব মাটির তলার ধন-সম্পদ–গুপ্তধন আজ অবধি অনাবিস্কৃতই রয়ে গেছে। আর যদি আবিষ্কৃত হয়েও থাকে তবে তার বিবরণ আজ অবধি পাওয়া যায়নি। সত্যি করে বলুন তো, সমুদ্র উপকূলবর্তী কোনো অঞ্চল থেকে গুপ্তধন আবিষ্কারের কোনো কাহিনী কী আপনার কানে কোনোদিন এসেছে?
আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলাম না। তবে অন্য কেউ শুনেছে কিনা জানা নেই, আমি অন্তত শুনিনি।
‘তবে এও সত্যি যে ক্যাপ্টেন কিডের ধন-সম্পত্তি অগাধ ছিল তা সবারই জানা আছে। তাই আমিও নিঃসন্দেহই ছিলাম সে তার অগাধ ঐশ্বর্য আজও মাটির তলায় রয়ে গেছে। আশা করি আপনি শুনে অবাক হবেন না যদি আমি বলি আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে একটা আশার সঞ্চার ঘটেছিল। মনে করতে পারেন, দৃঢ় আর প্রায় নিশ্চিত আশা।
‘আশা? কিন্তু কী সে আশা?’
‘আশাটা হচ্ছে, যে অদ্ভুত উপায় আর পরিস্থিতিতে পার্চমেন্ট কাগজটা, সে গুপ্তধনেরই খোলা-যাওয়া নথি–দলিল।
‘চমৎকার! তারপর? তারপর আপনি কোন পথ ধরলেন?’
‘তারপর? আগুনের তাপ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়ে পার্চমেন্ট কাগজের চিতেটা যতটা সম্ভব তার কাছাকাছি নিয়ে গেলাম। হতাশই হতে হল। না, কিছুই চোখে পড়ল না, কাগজটাকে দু-একবার উলটেপাল্টে দেখে নিয়ে ভাবলাম, কাগজটার গায়ে ময়লার প্রলেপ পড়ায় এ ব্যাপারটা ঘটেছে।
