হ্যাঁ, এরকম চিন্তার ফলেই আমার মাথায় মড়ার খুলির ব্যাপারটা পানির মতোই পরিষ্কার হয়ে গেল। ব্যাপারটার পিছনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লুকিয়ে থাকতে পারে চিন্তাটা আমার মাথায় পাকাপাকিভাবে চেপে গেল। অতএব তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আমি বলে উঠলাম–একটু আগেই আপনি আমাকে বললেন, ঝি ঝি পোকার রেখাচিত্রটা আঁকার সময় পার্চমেন্ট কাগজের গায়ে মড়ার খুলিটার চিহ্নও আপনার চোখে পড়েনি, ঠিক কি না?
লিগ্র্যান্ড সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন–‘অবশ্যই, অবশ্যই দেখতে পাইনি।’
তা-ই যদি সত্য হয় তবে মরার খুলি আর জাহাজটার মধ্যে আপনি যোগসূত্রটা পেলেন কোথায় জানতে পারি কি? আপনার বক্তব্য অনুযায়িই বলছি, মরার খুলিটা আঁকা হয়েছিল আপনার ঝি ঝি পোকাটার রেখাচিত্র আঁকার পর কোনো বা কোনো এক সময়ে। সেটা কে এবং কিভাবে এঁকেছিল তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারেন। ব্যাপারটা যদি একটু খোলসা করে–
আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে তিনি বললেন–‘আরে ভাই, আসল রহস্যটাতো এখানেই।
‘রহস্য? আসল রহস্য?’
‘হ্যাঁ, রহস্য তো বটেই? তবে এও সত্যি যে, যে রহস্যের কিনারা আমি সহজেই কবে ফেলতে পেরেছিলাম। আর এও বলে রাখছি, আমার চিন্তার ধাপগুলো ছিল সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত। আর তাদের ঝাড়াই বাছাই করে একটা মাত্রই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। আমার চিন্তার ধারাটা ছিল এ রকম–আমি পার্চমেন্টে কাগজের চিলতেটার গায়ে ঝি ঝি পোকার রেখাচিত্র আকার সময় তখন তাতে মড়ার খুলির চিত্রটার নাম গন্ধও ছিল না।
আঁকার কাজ সেরেই আমি কাগজের চিলতেটাকে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম, সত্যি কিনা?
‘হ্যাঁ, তা দিয়েছিলেন বটে।’
‘আর সেটাকে আমার হাতে ফিরিয়ে না দেওয়া অবধি আমি আপনার মুখের ওপরেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছিলাম। অতএব আপনি যে মড়ার খুলির ছবিটা আঁকেননি। এ বিষয়ে আমার মনে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকার কথাই নয়।
‘হ্যাঁ, এ রকম দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়াই যেতে পারে।’
‘আর তখন সেখানে তৃতীয় ব্যক্তিও কেউ-ই ছিল না।
তবে নিঃসন্দেহ হওয়া যেতে পারে, কোনো মানুষ সেটা আঁকেনি। ঠিক বলেছি?
‘শতকরা একশো ভাগই সত্য।’
‘কিন্তু কাজটা যে করা হয়েছিল তা-ও তো অস্বীকার করা যায় না, ঠিক কি না?’
আমি নীরবে ঘাড় কাত করে তার বক্তব্যকে সমর্থন করলাম।
‘এবার আমি ভাবনা-চিন্তার এ জায়গাটায় পৌঁছে নীরবে আলোচ্য সময়ের প্রতিষ্ঠিত ঘটনাকে একের পর এক স্মৃতির পাতায় এনে জড়ো করতে চেষ্টা করতে শুরু করলাম। আমার প্রয়াস সার্থকও হয়েছিল। আমি ঠিকই স্মরণ করতে পারলাম। প্রথমেই আমার মনের কোনে উঁকি দিল, সে দিনের আবহাওয়া ছিল বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। আর চুল্লিটাতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল।
আমি চুল্লি থেকে দূরে, টেবিলে বসেছিলাম। কারণ, কঠোর পরিশ্রমের ফলে আমি এমনিতেই গরম বোধ করছিলাম। তাই চুল্লিটা থেকে দূরের টেবিলটায়ই বসেছিলাম।
আর আপনি চেয়ারটাকে টানাটানি করে চুল্লিটার কাছে নিয়ে গিয়ে গাট হয়ে বসলেন, মনে পড়ছে?
আমি ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলে ঘাড় কাৎ করে তার বক্তব্য সমর্থন করলাম।
তিনি বলে চললেন–‘আমি পার্চমেন্ট কাগজটা আপনার হাতে তুলে দিলাম। আপনি সেটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন। ঠিক সে মুহূর্তেই আমার প্রিয় কুকুর শিউফাউন্ড ল্যান্ড লেজ নাড়তে নাড়তে ঘরে ঢুকে এক লাফে বার-কয়েক আদর করে। ছোট্ট একটা ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলেন। আর তখনই আপনার ডান হাতটা, যে হাতে পার্চমেন্ট কাগজটা ধরা ছিল সেটা ঝুলে আগুনের কাছাকাছি চলে গেল। মনে হলো কাগজটার গায়ে বুঝি আগুন লেগে গেল।
ব্যাপারটা আমার নজরে পড়তেই আমি আপনাকে সতর্ক করে দিতে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে সে সম্বন্ধে আপনাকে সতর্ক করে দেবার আগেই আপনি নিজেই কাগজটা সমেত হাতটাকে তুলে নিলেন। পর মুহূর্তেই পার্চমেন্ট কাগজটাকে আবার মুখের সামনে ধরলেন।
আপনি আমার কথা কতখানি বিশ্বাস করবেন, জানি না। তবুও বলছি। সে ঘটনার মুহূর্তে আমি কিন্তু ভুলেও ভাবিনি, অর্থাৎ মুহূর্তের জন্য আমার মনে তিলমাত্র সন্দেহ জাগেনি, যে তাপশক্তিই কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ তাপশক্তির বলেই পার্চমেন্ট কাগজটার গায়ে মড়ার খুলির ছবিটা ধীরে ধীরে ফুটে উঠেছিল।
আমি স্থবিরের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে রুদ্ধশ্বাসে বন্ধুর কথাগুলো শুনতে লাগলাম।
সে বলে চলল–‘আপনার তো ভালোই ধারণা আছে যে, ক্রমশ মিশ্রণের অস্তিত্ব আছে। বহু যুগ থেকেই আছে। কাগজ বা ভেলাসের গায়ে যা দিয়ে লেখা সম্ভব যা কেবলমাত্র আগুনের সংস্পর্শে নিলে স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে, চোখে দেখা সম্ভব। আবার যার গায়ে কিছু আঁকা হয় বা লেখা হয় তা ঠাণ্ডা হয়ে গেলেই অদৃশ হয়ে যায়। আবার যখনই তাপের সংস্পর্শে নেওয়া যাবে তা স্পষ্ট হয়ে পড়ে জানা নেই?
‘অবশ্যই অবশ্যই জানি।
‘ব্যস, এবার আমি সাধ্যমত যত্নসহকারে মড়ার খুলিটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে মেতে গেলাম। পার্চমেন্ট কাগজটার কিনারার রেখাগুলো অন্যান্য রেখার তুলনায় অনেক, অনেক বেশি স্পষ্ট। কেন বলুন তো?
আমি ব্যাপারটা ধরতে না পেরে তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
আমার অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনিই আবার মুখ খুললেন ‘ব্যাপারটা হচ্ছে, রাসায়নিক পদার্থের ওপর তাপের ক্রিয়া সব জায়গায় সমানভাবে না পড়ার জন্যই এমনটা ঘটেছে–এটাই স্বাভাবিক। তখনই আগুন জ্বেলে পার্চমেন্টের সম্পূর্ণ জায়গায় সমানভাবে তাপ প্রয়োগ করলাম। ফলে সবার আগে মড়ার খুলিটার রেখাগুলো ক্রমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠল। এবার বার বার কাগজটাকে আগুনের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ায় মড়ার খুলিটার বিপরীত কোণে ক্রমশ একটা মূর্তি
