আমি যে মুহূর্তে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত সেখান থেকে উঠে পড়লাম। আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম, একেবারে একা না হতে পারলে রহস্যটা ভেদ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। হাতের পার্চমেন্ট কাগজটাকে নিরাপদ স্থানে রেখে দিয়ে আমি অস্থিরভাবে ঘরময় পায়চারি করতে লাগলাম।
নিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে রাতটুকু কাটিয়ে দিলাম। ভোরের আলো ফুটলে আপনি নিজের বাড়ি যাবার জন্য পা বাড়ালেন। জুপিটার তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি বাঞ্ছিত সুযোগ পেয়ে গেলাম। এমন একটা সুযোগ আমি অবশ্যই হাতছাড়া করলাম না। পার্চমেন্ট কাগজটা নিয়েনিবিষ্ট মনে নতুন করে ভাবনায় মেতে গেলাম। গোড়াতেই ভাবলাম, পার্চমেন্ট কাগজটা কিভাবে আমার হাতে পড়েছিল।
দ্বীপটার মাইল খানেক পূবদিকে মুল ভূখঞ্জে সমুদ্রতীরের লাগোয়া একটা অঞ্চল থেকে আমরা ঝি ঝি পোকাটাকে পেয়েছিলাম। সেটাকে ধরার জন্য আমি আদাজল খেয়ে লেগে গেলাম। সেটাকে ধরার সময়ই আমার আঙুলে খুব জোরে কামড়ে দিয়েছিল। আকস্মিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে আমি সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম।
আমার বুড়ো ও অভিজাত নিগ্রো ভৃত্য জুপিটার খুবই সাবধানী প্রকৃতির। সে পোকাটাকে চেপে ধরার উপযোগ্য কোনো গাছের পাতা বা ক্রমশই কোনো একটা জিনিসের খোঁজে বারবার এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। ঠিক সে মুহূর্তেই তার ও আমার উভয়েরই চোখে পার্চমেন্ট কাগজের টুকরোটা ধরা পড়ল। আমরা তখন সেটাকে খুবই মামুলি একটা কাগজ ভেবেছিলাম।
পার্চমেন্ট কাগজটার অর্ধেক মাটিতে পোঁতা অবস্থায় ছিল। বাইরে থেকে একটা কোন্টা সমেত বাকি অর্ধেকটি দেখা যাচ্ছিল।
পার্চমেন্ট কাগজটা যেখানে ছিল তার কাছেই কোনো একটা জাহাজের সংবোট এর খোলের ভাঙা অংশবিশেষ পড়েছিল। প্রথম দর্শনেই আমার মনে হয়েছিল, দীর্ঘ দিন সেটা সেখানে পড়ে রয়েছে। কারণ, সেটাকে দেখে মনেই হচ্ছিল না যে, সেটা কোনো জাহাজের অংশ।
থাক, যে কথা বলছিলাম, জুপিটার পার্চমেন্ট কাগজটা তুলে সেটা দিয়ে ঝি ঝি পোকাটাকে মুড়ে হাতে তুলেনিল। তারপর সে হাতেই সেটাকে আমার হাতে দিল।
এবার আমরা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। কিছুটা পথ পাড়ি দিতেই লেফটেন্যান্ট জি-র সঙ্গে আমাদের মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। তিনি পোকাটিকে আমার হাতে দেখে উৎসাহ প্রকাশ করলেন। তিনি সেটাকে দুর্গে, তার আবাসস্থলে নিয়ে যেতে চাইলেন।
আমি তার প্রস্তাবে আপত্তি করলাম না, বরং এক কথাতেই পোকাটাকে পার্চমেন্ট কাগজে মোড়া অবস্থাতেই তার ওয়েস্টকোটের পকেটে পুরে দিতে চাইলাম। তিনি মুচকি হেসে আমার হাতে থেকে নিয়ে পোকাটাকে কোটের পকেটে চালান দিয়ে দিলেন। আর পার্চমেন্ট কাগজটা আমারে ফিরিয়ে দিলেন। হয়তো বা ভালো-মন্দ কোনো চিন্তা না করেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি পার্চমেন্ট কাগজের টুকরোটা নিজের জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম।
লেফটেন্যান্ট জি এবার দুর্গের দিকে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে লাগলেন, আর আমরা বাড়ির পথ ধরলাম।
অনেকক্ষণ ধরে এক নাগাড়ে কথা বলে বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড মুহূর্তের জন্য থেমে দম নিয়ে আবার বলতে লাগলেন–‘আশা করি আপনি অবশ্যই ভুলে যাননি, ঝি ঝি পোকাটার রেখাচিত্র আঁকার জন্য কাগজের খোঁজে আমি টেবিলটার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে দেরাজ খুলে ঘাটাঘাটি করলাম না। ব্যবহারোপযোগী কোনো এক চিলতে কাগজও পেলাম না। তাই নিতান্ত অন্যান্য পায় হয়েই যে কোনো একটা পুরনো চিঠির খোঁজে জ্যাকেটের পকেটে হাত চালিয়ে দিয়েছিলাম। পকেট হাতড়ে পার্চমেন্ট কাগজের চিলতেটাকে বের করে আনলাম।’– ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তিনি এবার বললেন- ‘আমার মুখে এরকম কথা শুনে আপনি হয়তো আমাকে অস্বাভাবিক ভাবপ্রবণ বলেই ভাবছেন, ঠিক কি না? আসল ব্যাপার হচ্ছে, সে মুহূর্তেই আমি এসব ঘটনা পরম্পরার মধ্যে একটা যোগসূত্রের হদিস পেয়েছিলাম। নিজের মনে দুটো চিন্তা-শৃঙ্খলের দুটো বিশেষ অংশে পাশাপাশি জুড়ে দিলাম। ভাবলাম, সমুদ্রের ধারে একটা জাহাজের ভাঙা অংশকে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। আর তারই কাছাকাছি পেয়েছিলাম এক চিলতে পার্চমেন্ট কাগজ। মামুলি একটা কাগজের একটা টুকরো অবশ্যই নয়–পার্চমেন্ট কাগজ। আর তার গায়ে আঁকা ছিল একটা মড়ার খুলি।’
এবার মুখ তুলে সরাসরি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন–খুবই সঙ্গতকারণেই আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, এখানে আমি যোগসূত্রের গন্ধ কি করে পাচ্ছি, ঠিক কি না?
আপনার জিজ্ঞাসা দূর করতে আমি বলব, মড়ার মাথার খুলি জলদস্যুদের বহুল ব্যবহৃত একটা প্রতীক চিহ্ন। তাদের সব জাহাজের মাথাই ওড়ে মড়ার খুলি আঁকা পতাকা। হয়তো এ দৃশ্য আপনার চোখেও পড়ে থাকতে পারে।
আর একটা কথা আমি তো সবেই বলেছি, এক চিলতে পার্চমেন্ট কাগজ, মামুলি একটা কাগজ নয়। কার না জানা আছে যে, পার্চমেন্ট কাগজ দীর্ঘস্থায়ীই কেবল নয়, অক্ষয় বললেও অত্যুক্তি করা হবে না।
অতএব সহজেই অনুমান করা যেতে পারে, মামুলি কোনো কাজ করতে গিয়ে কেউ পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহার করে না। আরও আছে, ছবি আঁকা বা এরকম কোনো কাজে পার্চমেন্ট কাগজের চেয়ে সাধারণ কাগজ বেশি উপযোগি। এতে রঙ আর তুলিতে মনের মতো ছবি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়।
