আর মুদ্রাগুলো ছাড়া যত সব হীরা-মুক্তা পেলাম তাদের মূল্য নির্ধারণের বৃথা চেষ্টা আমরা করতে পারলাম না। আসলে আমাদের সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলোয়নি।
শুধু কি মুদ্রা আর হীরা-মুক্তাই? নিরেট সোনার গহনা যে কত তার হিসেব করা গেল না। আর যা-কিছু পেলাম তাদের মধ্যে কানের দুল, আংটি–অন্তত ত্রিশটা ইয়া মোটা মোটা গলার হার আর কত রকমের গয়না আর জিনিস তার ইয়ত্তা নেই।
শেষপর্যন্ত অনুমান-নির্ভর ভুলে ভরা হিসেব-নিকাশ সারার পর আমাদের চরম উত্তেজনা যখন একটু একটু করে প্রশমিত হতে হতে মোটামুটি থিতিয়ে পড়ল তখন আমার বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন, আমি তার এমন অগাধ ধনরত্ন সমৃদ্ধ গুপ্তধনের আবিষ্কার তিনি কিভাবে করলেন, এমন একটা রহস্যের সমাধান তিনি কী করে সম্ভব করলেন, সেটা জানার জন্য কৌতূহল আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করছে।
তাই আমার কৌতূহলনিবৃত্ত করতে বন্ধুবর তার রহস্যটার সমাধানের একটা সংক্ষিপ্ত অথচ মনোজ্ঞ বিবরণ আমার সামনে তুলে ধরলেন–
দু ঠোঁটের ফাঁকে একটা চুরুট আঁকড়ে ধরে লিগ্যান্ড তাতে অগ্নি সংযোগ করলেন। একগাল ধোয়া ঘরময় ছড়িয়ে দিয়ে এবার বলতে শুরু করলেন–‘আশা করি সে রাতটার কথা আমার ভালোই মনে আছে যখন ঝি ঝি পোকাটার একটা রেখাচিত্র আমি আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম? আর আশা করি এও আমার স্মৃতি ভ্রষ্ট হয়নি যে, আপনি বলেছিলেন রেখাঁটি এটা একটা মরার খুলির মতো দেখতে, আপনার মুখে এ কথা শুনে আমি তখন খুবই বিরক্ত হয়েছিলাম।’
দেখুন, সত্যি কথা বলতে কি, আপনার মুখে প্রথম ও কথাটা শোনার পর আমি ভেতরে ভেতরে রাগে গজগজ করছিলাম। কারণ আমি নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম যে, আপনি আমার সঙ্গে মস্করা করছেন।
কিন্তু একটু পরেই যখন পোকাটার পিঠের বিন্দু দুটোর কথা মনে পড়ে গেল তখনই আপনার সম্বন্ধে আমার ভুলটা ভেঙে গেল। এবার মনে হলো আপনার কথায় কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে। তবুও আমার শিল্পকীর্তি নিয়ে রসিকতা করার বিরক্তিটুকু মন থেকে মুছে ফেলতে পারলাম না। এরও যথেষ্টই কারণ রয়েছে। আমার পরিচিতজনদের মতে শিল্পকর্ম সম্বন্ধে আমার দক্ষতা যথেষ্টই রয়েছে। আর আপনি কিনা শিল্পী হিসেবে আমাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না!
তাই রেখাচিত্রটার ওপর মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়েই আপনি যখন চোখে-মুখে বিতৃষ্ণার ছাপ এঁকে কাগজটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তখন আমি রাগে একেবারে কাই হয়ে গিয়ে সেটাকে দলা পাকিয়ে জ্বলন্ত চুল্লিটায় ফেলে দিতে গিয়েছিলাম, মনে পড়ছে।
আমি মুচকি হেসে নীরবে ঘাড় কাৎ করলাম। তিনি এবার ঠোঁটের চুরুটটায় লম্বা একটা টান দিয়ে হাসতে হাসতেই বললেন। সত্যি, আপনার ওপর আমি তখন রাগে একেবারে ব্যোম হয়ে গিয়েছিলাম।
আমি কপালের চামড়ায় পর পর কয়েকটা ভজ এঁকে বললাম–‘বোধ হয় ওই ছেঁড়া কাগজের চিলতেটার কথা আপনি বলছেন, তাই না?
লিগ্র্যান্ড সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলেন–‘ধ্যুৎ! কী বাজে কথা বলছেন ভাই! ওটা ছেঁড়া ফাটা বাজে কাগজ অবশ্যই ছিল না। তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, গোড়ার দিকে আমিও সেটাকে বাজে কাগজ বলেই ভেবেছিলাম। আর তার গায়ে রেখাচিত্রটা আঁকতে গিয়ে নিঃসন্দেহ ওটা সাধারণ কাগজ না, উন্নতমানের পার্চমেন্ট কাগজ। এ পর্যন্ত বলে তিনি মুখ তুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন–‘আশা করি আপনার অবশ্যই মনে আছে যে, কাগজটা খুবই নোংরা ছিল। আর একটা কথা, কাগজটাকে হাতে নিয়ে মুঠোর মধ্যে দলা পাকানোর সময় যে কাগজটা আপনি দেখেছিলেন, তার ওপর যেখানে ঝি ঝি পোকার রেখাচিত্রটা আমি এঁকেছিলাম ঠিক সে জায়গাই একটা মড়ার মাথা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়ি।
আমার তো খুব ভালোই জানা ছিল, যে রেখাচিত্রটা আমি এঁকেছিলাম, এ আঁকাটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকৃতির। তবে এও মিথ্যে নয়, উভয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্য থাকলেও সুদৃশ্যও কম ছিল না।’
আমি কেমন একটা অবর্ণনীয় ধন্ধে পড়ে গেলাম। রহস্যটা ভেদ করার জন্য আমি একটা মোমবাতি নিয়ে ঘরের এক কোণে চলে গেলাম। কাগজটা বার বার উলটেপাল্টে ছবিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। এবার নজরে পড়ল, ঝি ঝি পোকাটাকে আমি যেখানে এঁকেছিলাম তার ঠিক নিচেই মড়ার মাথাটা আঁকা হয়েছে।
আমি যার পর নাই অবাক হলাম, আমার আঁকা ছবিটা যেন অবিকল মরার মাথার খুলিটারই মতো। যাকে বলে যেন একেবারে কার্বন কপি। আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না।
একেবারে আমার মনের কথাই বলছি। ছবি দুটোর মধ্যে সাদৃশ্যটুকু চাক্ষুষ করে আমার বুদ্ধিসুদ্ধি যেন কেমন ভোঁতা হয়ে গেল। কিন্তু সে ঘোর কেটে গেলে আমার স্পষ্টই মনে পড়ে গেল। আমি যখন পার্চমেন্ট কাগজটার গায়ে ঝি ঝি পোকার রেখাচিত্রটা আঁকি তখন তার গায়ে কোনো চিত্র তো দূরের কথা, একটা দাগও আঁকা ছিল না। হ্যাঁ, এ ব্যাপারে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই।
মড়ার মাথার খুলির চিত্রটা নিয়ে আমার এত মাথাব্যথা কেন, আর কেনই বা আমি এমন আগ্রহী হয়ে পড়েছি, তাই না? আমি ঝি ঝি পোকার রেখাচিত্রটা আকার সময় ময়লা কাগজটার গায়ে একটুখানি পরিষ্কার জায়গা খুঁজতে গিয়ে সেটা বার বার এদিক ওদিক উলটেপাল্টে দেখেছিলাম। মড়ার খুলির ছবিটা যদি তার গায়ে আঁকা থাকতই তবে তো আমার চোখে পড়তই পড়ত। এমন জটিল একটা রহস্যের কুলকিনারা আমি কিছুতেই করতে পারলাম না, কোনো ব্যাখ্যা করাই সম্ভব হলো না।
