লণ্ঠনের শিখা গর্তের ভেতরে পড়ে সিন্দুকের ভেতরের আর হীরা-মুক্তার গায়ে লাগায় অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা যেন চারদিকে ঠিকড়ে পড়তে লাগল। সত্যি বলছি, এমন চোখ ধাঁধানো আলো দেখার সৌভাগ্য ইতিপূর্বে আমার চোখ দুটোর হয়নি।
অভাবনীয় দৃশ্যটার মুখোমুখি হয়ে আমরা সবাই যারপরনাই স্তম্ভিত–যেন বাশক্তি হারিয়ে ফেললাম।
আমার নিজের তখনকার মানসিক অবস্থার কথা না-ই বা বললাম। আকস্মিক ও নিরবচ্ছিন্ন উত্তেজনায় আমার বন্ধু লিগ্র্যান্ড একেবারে ভেঙে পড়লেন; বজ্রাহতের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে দাঁড়িয়ে সিন্দুকটার ভেতরের স্তরে স্তরে সাজানো সোনাদানা আর হীরা-মুক্তোর স্তূপের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন। মুখে একটা শব্দও উচ্চারণ করলেন না। করলেন না বললে হয়তো ঠিক বলা হবে না। আসলে করতেই পারলেন না।
কয়েক মুহূর্তে মনে হলো কোনো অদৃশ্য হাত যেন বুড়োনিগ্রোটার মুখে দোয়াত দোয়াত কালি ঢেলে দিল। তার মুখের দিকে চোখ পড়তেই মনে হলো আকস্মিক আতঙ্কে সে যেন পাথরের মূর্তির মতো, বজ্রাহত রোগীর মতো নিশ্চল-নিথর হয়ে পড়েছে।
জুপিটার গর্তের মধ্যে দাঁড়িয়েই সিন্দুকের ভেতরে হাত দুটোকে সোনা আর হীরা মুক্তোর স্তূপের মধ্যে ঢুকিয়ে মুখে কলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইল। তার কাণ্ড দেখে আমার মনে হলো সে যেন সোনার স্পর্শের অভাবনীয় সুখ-শান্তিতে মন-প্রাণ কানায় কানায় ভরে নিচ্ছে।
কয়েক মুহূর্তে নিশ্চল-নির্বাকভাবে কাটিয়ে দিয়ে এক সময় সে স্বগতোক্তির মতোই প্রায় অস্ফুট স্বরে বলে উঠল–সবই ওই সোনালি ঝি ঝি পোকাটার নাম? আমার আদর সোহাগের পোকা! তাকে আমি কত না ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি।’
আমার বন্ধু আর তার নিগ্রো ভৃত্য জুপিটারের মাথায় এলো ব্যাপারটা নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই দেখে ভাবলাম, আমাকেই তাদের মাথায় ব্যাপারটা ঢোকাতে হবে–ধন-সম্পদের পাহাড়টাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া একান্ত দরকার। এমনিতেই বেশ দেরি হয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ পরই পূর্ব আকাশে ভোরের আলো উঁকি দেবে। অন্ধকার কাটার আগেই যদি ধন-সম্পদগুলো বাড়িতে নিয়ে তোলা না হয় তবে কেলেঙ্কারি ঘটে যেতে পারে।
সিন্দুকের অপরিমিত সোনাদানা হীরা মুক্তোগুলোকে কিভাবে আমার বন্ধুর বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে সে আলোচনা করতে করতেই বেশ কিছু সময় চলে গেল।
শেষমেশ সিন্দুকের ভেতরের দুই তৃতীয়াংশ সোনাদানা বের করে সেটাকে কিছুটা হালকা করে নিলাম। এবার তিনজনে টানা হেচড়া করে কোনোরকমে সেটাকে গর্তের ভেতর থেকে ওপারে তুলে আনতে পারলাম। আর সে সব সোনাদানা একটা ঘন ঝোপের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে কুকুরটাকে পাহারায় রেখে সিন্দুকটাকে নিয়ে আমরা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম।
অমানুষিক পরিশ্রম করে গায়ের ঘাম ঝরাতে ঝরাতে আমরা রাত একটার কাছাকাছি সময় সিন্দুকটা বয়ে নিয়ে বন্ধুবর লিগ্র্যান্ডের বাড়ির দরজায় পৌঁছাতে পারলাম।
এক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্রাম ও আহারাদি সেরে আমরা আবার রাত দুটো নাগাদ পাহাড়টার পাদদেশের গর্তটার উদ্দেশে ব্যস্ত পায়ে হাঁটা জুড়লাম। সঙ্গে করে বেশ বড়সড় বস্তা নিয়ে গেলাম।
জায়গামতো পৌঁছে আমরা মালপত্র তিনটি বস্তায় প্রায় সমানভাবে বোঝাই করে ফেললাম। এবার কোদাল দিয়ে মাটি ফেলে ফেলে গর্তটা ভালোভাবে বুজিয়ে শুকনো লতাপতা ছড়িয়ে এমনভাবে ঢেকে দিলাম যাতে সহজে কারো নজরে না পড়ে। আর জনমানবশূন্য অঞ্চলটায় যাবেই বা কে যে নজরে পড়বে।
সোনাদানা বোঝাই বস্তাগুলো মাথায় করে বয়ে আমরা যখন দ্বিতীয়বার বাড়ি ফিরলাম তখন গাছের মাথার ওপর দিয়ে পূব-আকাশের ভোরের রক্তিম আভা সবে উঁকি দিতে শুরু করেছে।
এবার আমরা ক্লান্তিতে সত্যি সত্যি ভেঙে পড়েছি। শরীর যেন আর চলতে চায় না। হাত-পাগুলো বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায়। দীর্ঘ সময় একটানা বিশ্রাম করলে হয়তো ক্লান্তি অপনোদন করা সম্ভব হত। কিন্তু যে অন্তহীন অবর্ণনীয় উত্তেজনা আমাদের মধ্যে ভর করেছে তা-তো আমাদের স্বস্তিতে বিশ্রাম করতেও দেবে না। সত্যি কথা বলতে কি আমি, না আমি একা নই আমরা সবাই নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার শিকার হয়ে রীতিমত ছটফট করছি।
শরীর টলতে লাগল। নিতান্ত অনিচ্ছায়, ধরতে গেলে অনন্যোপায় হয়েই আমরা তিন-চার ঘণ্টা আশান্ত ঘুমের ঘোরে কাটিয়ে এক এক করে হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম।
এবার আমরা তিনজন ঘরের দরজা বন্ধ করে পাশাপাশি বসে সোনাদানা আর হীরা-মুক্তোর হিসাব-নিকাশ করতে মেতে গেলাম।
সিন্দুক বোঝাই ধনরত্ন। সবগুলো মেঝেতে পাঁজা করে নিয়ে একটা একটা করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মোটামুটি দাম করতে করতে পুরোটা দিন তো গেলই, এমনকি রাতেরও বেশ কিছুটা অংশ কেটে গেল।
যত সহজে ব্যাপারটাকে বললাম আসলে কাজটা কিন্তু এত সহজে সারা সম্ভব হয়নি। সোনাদানা আর হীরা-মুক্তাগুলোকে প্রথমে যত্ন করে আলাদা আলাদা ভাগে ভাগ করে ফেললাম। এবার আমরা নিঃসন্দেহ হলাম, আমরা একটু আগে পর্যন্ত ধন সম্পদের দাম সম্বন্ধে যে অনুমান করেছিলাম, প্রত্যাশা করেছিলাম আসলে এদের দাম অনেক, অনেক বেশি। বিচার করে দেখলাম, তাতে আছে বেশ কিছু সংখ্যক বৃটিশ গিনি, আর বাকি সব বিচিত্র মুদ্রার পাহাড়-জার্মানি, ফরাসি, স্পেনীয় প্রভৃতি দেশিয় গিনি, আর অবশিষ্ট গিনিগুলো যে কোনো দেশিয় তার হিসেব আমাদের কারোরই জানা নেই। একটা কথা খুবই সত্য যে গিনির পাহাড় ঘাটাঘাটি করে, তন্নতন্ন করে খুঁজে একটাও মার্কিন মুদ্রা হাতে পেলাম না।
