‘হুজুর, এ-চোখটা। এই যে এ বাঁ চোখটা। আপনি তো এটার কথাই বলেছিলেন, তাই না? কথাটা বলার সময় সে নিজের ডান চোখটায় হাত রাখল।
‘ব্যাস, আর বলার দরকার নেই, এতেই আমি পুরো ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছি। আমরা আবার কাজে লাগব, চেষ্টা করে দেখব।
আমার বন্ধুটি আবার কোটের পকেট থেকে মাপার ফিতেটা বের করে মাপজোক শুরু করে দিলেন। আগের জায়গাটা থেকে বেশ কয়েক গজ দূরে একটা জায়গা নির্ধারণ করলেন। তারপর আগের চেয়ে বড় ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট একটা বৃত্ত এঁকে ফেললেন।
আমি এবারও নীরব চাহনি মেলে বন্ধুর কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম।
মাপঝোঁক সেরে নিয়ে তিনি এবার আমাদের লক্ষ্য করে বললেন–‘আর একবার আমাদের গায়ের ঘাম ঝরাতেই হবে। আসুন, আবার কোদাল নিয়ে গর্ত তৈরির কাজে মেতে যাই।
জুপিটার আর আমি উভয়েই নিঃশব্দে কোদাল হাতে তুলে নিয়ে তার সঙ্গে গর্ত খোঁড়ার কাজে মেতে গেলাম।
আমার শরীর ও মন উভয়েই তখন ক্লান্ত। এত কিছু সত্ত্বেও কেন যে বন্ধুর কাজটার প্রতি এবার আমার আগ্রহ হঠাৎ অস্বাভাবিক বেড়ে গেল–আমি নিজেই জানি না। এমনও হতে পারে বন্ধুর হঠকারী কথাবার্তা ও হাবভাবের মধ্যেও এবার কম-বেশি চিন্তা-ভাবনার ছাপ আমি উপলব্ধি করতে পেরে গেছি। তাই এবার আমি অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে কোদাল চালাতে আরম্ভ করলাম।
সত্যি আমি নির্দিদায় স্বীকার করছি, তখন আমার মধ্যেও আশার সঞ্চার হতে আরম্ভ হয়েছে। আর এটিও সত্য যে, এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে আমি সঠিক জবাব দিতে পারব না।
এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে মাটি কোপানোর পর আমাদের সঙ্গি কুকুরটা গলা ছেড়ে তর্জন গর্জন আরম্ভ করে দিল। কি যেন একটা অজানা আক্রোশে সে এমন ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু করছে।
বুড়ো নিগ্রো জুপিটার মুখ বুজে মাটি কোপাতে থাকলে ক্রোধোন্মত্ত কুকুরটা তাকে বাধা দিতে লাগল। সে গর্জন করতে করতে অতর্কিতে গর্তটার মধ্যে লাফিয়ে পড়ে সামনের থাবা দুটো দিয়ে পাগলের মতো মাটি আঁচড়াতে শুরু করল।
পাগলের মতো মাটি খুঁড়ে কুকুরটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই এমন একটা হাড়ের পাঁজা বের করে ফেলল, সেগুলো জোড়া দিয়ে দিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ নরকঙ্কাল তৈরি করা যেতে পারে।
আরও আছে। হাড়ের স্তূপটা ছাড়া সে উদ্ধার করল প্রায় মাটিতে পরিণত হয়ে যাওয়া কিছু পশম আর অক্ষত কয়েকটা ধাতব বোতাম।
আমরা কোদাল চালানোর কাজ অব্যাহত রাখলাম। আরও ঘা কতক কোদাল মারতেই মাটির সঙ্গেই উঠে এলো অতিকায় একটা খেপনীর ছুরির ফলা। অবাক হলাম।
আর কিছুটা খোঁড়াখুঁড়ি করতেই তিন-চারটি সোনা ও রূপার মুদ্রা উঠে এলো। ব্যাপারটা আমার মধ্যে যারপরনাই উৎসাহের সঞ্চার করল।
মাটির তলা থেকে উঠে-আসা বস্তুগুলো দেখে জুপিটার যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবার জোগাড় হল। তার বেড়ানো গালের হাসির রেখাটুকুই আমাকে এরকম ভাবতে উৎসাহিত করল।
কিন্তু আমার বন্ধুকে ব্যাপারটা মোটেই সন্তুষ্ট করতে পারল না। তার চোখে মুখে দেখা দিল গভীর অসন্তোষ। তা সত্ত্বেও তিনি আমাদের কোপানোর কাজ অব্যাহত রাখতে নির্দেশ দিলেন। তার কথা শেষ হবার আগেই আমি কি যেন একটা বস্তুতে আচমকা হোঁচটা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। ব্যস্ত হাতে মাটি সরিয়ে ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম, মাটির ভেরে থেকে উঁকি মারা একটা লোহার আংটায় আমার জুতার সামনের দিকটা ঢুকে যাওয়ার জন্যই সমস্যাটা বেঁধেছিল।
ব্যাপারটা আমাদের সবার মধ্যেই অবর্ণনীয় উৎসাহ জাগিয়ে তুলল। ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে আমরা নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কাজে মেতে গেলাম। মাটিতে দমাদম কোদালের ঘা মারতে লাগলাম।
একটা মিনিট পার হতে পারেনি, আমরা এরই মধ্যে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করে একটা কাঠের সিন্দুক আবিষ্কার করে ফেললাম। এতে আমাদের মনে কী অপার আনন্দ জেগে উঠল তা ভাষায় বর্ণনা করা বাস্তবিকই সাধ্যাতীত।
বাক্সটার দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন ফুট, প্রস্থ তিন ফুট আর গভীরতা আড়াই ফুট। আর তার চারদিকে পেটা লোহার পাত দিয়ে দৃঢ়ভাবে মুড়ে দেওয়া হয়েছে। আর সিন্দুকটার গায়ে আটকানো রয়েছে মোট ছটা আংটা–দুদিকে তিনটি করে। আর সেগুলো এমনভাবে সিন্দুকটার গায়ে আটকে দেওয়া হয়েছে যাতে দুজন শক্তভাবে মুঠো করে সিন্দুকটাকে ধরে তুলতে পারে।
আমরা সবাই মিলে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে, দাঁতে দাঁত চেপে টানাটানি করে সিন্দুকটাকে সামান্য নাড়াতে পারলাম–ব্যস, এর বেশি নয়।
আমরা নিঃসন্দেহ হলাম, সিন্দুকটা এত ভারী যে, এটাকে এখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়।
ভাগ্য ভালো যে, সিন্দুকটার ডালার পেটিগুলো দুটো হুড়কোর সঙ্গে শক্তভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দারুণ হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে কোনোরকমে হুড়কো দুটোকে খুলে ফেলতে পারলাম।
আরে বাবা! একি অকল্পনীয় অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! চোখে ধাঁধা লেগে যাওয়ার জোগাড় হল। আর সে সঙ্গে আমার বুকের ভেতর যেন ক্রমাগত হাতুড়ির ঘা পড়তে লাগল। আমাদের চোখের সামনে অগাধ ধন সম্পদ আচমকা ঝলমলিয়ে উঠল। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কিছু পরিমাণ সোনা দানা সিন্দুকটাতে রক্ষিত আছে। কিন্তু এ যে দেখছি সাত রাজার ধন সম্পদ এক সঙ্গে জড়ো করলেও এমন একটা স্তূপ তৈরির করার কল্পনাও করা যায় না। সোনা। সোনা। যেন কাটা সোনার একটি স্তূপকে সিন্দুকটার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে।
