তিন-তিনজন মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে অচিরেই পাঁচ ফুট গভীর একটা গর্ত কাটা হয়ে গেল। কিন্তু হায়! কোথায় গুপ্তধন, কোথায়ই বা বন্ধুবর লিগ্র্যান্ডের বহু আকাঙ্ক্ষিত সোনা।
হতাশায়নিগ্রো জুপিটার আর আমার হাত শিথিল হতে হতে এক সময় পুরোপুরি থেমে গেল।
আমরা হাত থেকে কোদালটা নামিয়ে রাখলে কি হবে, লিগ্র্যান্ড কিন্তু মোটেই আশাহত হলেন না। তিনি আগের মতো পুরোদমে কোদাল চালিয়েই চললেন। বাঁ হাত দিয়ে ঘামে ভিজে ওঠা কপালটিকে মুছে নিয়ে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে কোদাল চালাতেই লাগলেন।
বার ফুট ব্যাসযুক্ত গর্তটাকে তিনি একাই আরও কিছু বড় করে গভীরতা আর দুফুট বাড়িয়ে ফেললেন। এতেই আমি নিঃসন্দেহ হলাম, তিনি হতাশ তো নন বরং আরও উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে কাজ করছেন।
না, তবুও আকাঙ্ক্ষিত বস্তুর হদিস মিলল না।
এক সময় দেখা গেল স্বর্ণসন্ধানী ও স্বর্ণলোভাতুর নিজেই চোখে মুখে হতাশার ছাপ এঁকে ঘামে জবজবে শরীরে গর্তটা থেকে উঠে এলেন।
তিনি আমাদের সঙ্গে একটাও কথা বললেন না। আমরাও গর্তটার প্রসঙ্গে তো দুরের কথা অন্য কোনো প্রসঙ্গেও তার সঙ্গে কোনো কথা বললাম না।
বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড গর্তটা থেকে উঠে হাত দিয়ে পিঠের ঘাম বার কয়েক মুছে নিয়ে বিষণ্ণ মুখে কোটটা পরতে লাগলেন।
জুপিটার মনিবের নির্দেশ পেয়ে যন্ত্রপাতিগুলো গুছিয়ে কাঁধে ও হাতে তুলেনিল।
কুকুরটাকে মুখের বাঁধন খুলেনিদারুণ অস্বস্তি থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হল।
আমরা নিঃশব্দে পদচারণ করতে করতে বাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম।
আমরা হয়তো বড়জোর দশ-বারো পা এগিয়ে গেছি, এমন সময় লিগ্র্যান্ড আচমকা তীব্র স্বরে একটা গর্জন করে উন্মাদের মতো দৌড়ে গিয়ে জুপিটারের গলাটা চেপে ধরলেন।
আকস্মিক আক্রমণের কারণ বুঝতে না পেরে হতভম্ভের মতো মনিবের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার হাত ও কাঁধ থেকে কোদালগুলো মাটিতে পড়ে গেল। আর সে নিজে হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল। কিন্তু তার মনিবের এমন অভাবনীয় কারণ জানার জন্য সামান্যতম চেষ্টাও করল না।
আমার বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড দাতে দাঁত ঘষতে ঘষতে বলতে লাগল–নচ্ছাড় শয়তান! বল, বল নচ্ছাড়! এখনই এ মুহূর্তেই আমার প্রশ্নের জবাব চাই।’
ব্যাপারটা সম্বন্ধে সামান্যতমও ধারণা করতে না পেরে বুড়োনিগ্রোটা নিতান্ত অপরাধীর মতো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে ক্রোধান্মত্ত মনিবের মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইল।
লিগ্র্যান্ডের তর্জন গর্জন অব্যাহত রইল। তিনি ক্রোধে যুঁসতে ফুঁসতেই এবার বলেন–‘শয়তান’, বল, তোর বা চোখ কোনটা? এক্ষুনি বলতে হবে কোনটা তোর বাঁ চোখ?’
কপালে করাঘাত করে জুপিটার বলল–‘হায় ঈশ্বর! হুজুর এটাই কী আমার বাঁ চোখ নয়, আপনিই বলুন?
কথা বলতে বলতে সে ডান চোখটার ওপর হাত রাখল।
ব্যস, আর যাবে কোথায়, জুপিটারের কথাটা কানে যেতেই আমার বন্ধুবর বদ্ধ উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠে সজোরে এক লাফ দিলেন। নাচতে নাচতে বললেন– ‘আমিও এরকমটাই অনুমান করেছিলাম। কালো শয়তানটা যে এমন একটা ভুল করে বসতে পারে, মোটমুটি ধরেই নিয়েছিলাম।’ কথাটা বলতে বলতে তিনি চাকরের সামনেই এমন বিশ্রি অঙ্গভঙ্গি করে নাচতে আরম্ভ করলেন যে, ভাষার মাধ্যমে তা দশজনের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা না করাই ভালো, যথাযথভাবে প্রকাশ করাও সম্ভব নয়।
জুপিটার ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে একবার মনিবের মুখের দিকে, পরমুহূর্তেই আবার আমার মুখের দিকে পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল।
মিনিট দু-তিনের মধ্যেই লিগ্র্যান্ড নাচ থামিয়ে মুহূর্তের জন্য আমাদের মুখের ওপর চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন–‘এসো চলে এসো।
আমি স্ববিস্ময়ে বললাম–‘চলে আসব মানে? কোথায় যাবে?
‘আবার ফিরে যেতে হবে। আবার সেখানে, সেই গাছতলায়ই যেতে হবে।’
‘কেন? ফিরে যেতে হবে কেন?
আমার হাত দুটো ধরে জোরে জোরে দু-তিনটি ঝাঁকুনি দিয়ে সে বলে উঠল– ‘আরে, কাজ এখনও শেষ হয়নি।’
তিনি আগে আগে পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে আবার সুদীর্ঘ টিউলিপ গাছটার তলায় নিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। গলা নামিয়ে প্রায় স্বগতোক্তি করলেন ‘আমি আগেই ভেবেছিলাম, কালো আহাম্মকনিগ্রোটা গণ্ডগোল করেছে, ডান চোখকে ভুল করে বা চোখ ভেবে নিয়েই তো গণ্ডগোলটা বাঁধিয়েছে।
এবার জুপিটারের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি বললেন–‘এই যে, কালো মানিক, একবারটি আমার কাছে এসো তো।
জুপিটার মুখ কাচুমাচু করে কয়েক পা এগিয়ে এলো।
লিগ্র্যান্ড বললেন–‘বাছাধন, ভালো করে ভেবে নিয়ে বল তো, মাথার খুলিটা গাছের ডালের সঙ্গে মুখটাকে বাইরের দিকে রেখে, নাকি গাছের ডালের দিকে মুখ রেখে পেরেক দিয়ে আটকানো ছিল?
‘হুজুর খুলির মুখটা বাইরের দিকে ছিল। আমার মনে হয়, কাকগুলো যাতে অনায়াসেই তার চোখ দুটোকে দেখতে পায় সে জন্যই এরকমটা করেছিল।
‘চমৎকার! চমৎকার! এবার আরও ভালো করে ভেবে নিয়ে আমার কথার জবাব দাও–এই চোখ, নাকি ওই চোখটার ভেতর দিয়ে তুমি সোনালি ঝিঁঝি পোকাটাকে গলিয়ে দিয়েছিলে? বল, কোনটা দিয়ে?’ কথাটা বলার সময় লিগ্র্যান্ড হাত বাড়িয়ে জুপিটারের একের পর এক চোখে হাত রাখলেন।
