‘খুলিটার বাঁ-চোখটা কী খুলিরও বা-হাতের দিকে হবে?
‘আরে ধৎ! খুলিটার আবার বাঁ-হাত’
তার কথা শেষ হবার আগেই জুপিটার বলে উঠল–‘হুজুর, এটাই তো মহাধন্ধ! খুলিটার যে আবার বাঁ বা ডান কোনো হাতই নেই। যাক গে, ঘাবড়াবেন না। পেয়েছি পেয়ে গেছি।
‘পেয়েছ? কি-কি পেয়ে গেছ জুপিটার?
‘বাঁ-চোখ, এই তো বাঁ চোখ। এবার কী করতে হবে বলে দিন।
‘চমৎকার! চমৎকার! বাঁ-চোখটা পেয়ে গেছ! এবার এক কাজ কর, ঝি ঝি পোকাটাকে খুলির বাঁ-চোখটার মধ্যে ঢুকিয়ে দাও।’
‘কতদূর? কতটা ভেতরে?
‘যতদূর পর্যন্ত দড়িটা যায় পোকাটাকে ততদূর পর্যন্ত ঢুকিয়ে দাও। খবরদার দড়িটাকে যেন ভুলেও হাত থেকে ছেড়ে দিও না। দড়ির বিপরীত প্রান্তটা শক্ত করে ধরে রাখ।
‘হুজুর, আপনি যা-যা বলেছেন সবই তো করেছি। আরে পোকাটাকে গর্তের ভেতরে সিঁধিয়ে দেওয়া তো সহজ, খুবই মামুলি একটা কাজ নিচ থেকে একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলেই আপনি নিজেই ব্যাপারটা দেখতে পাবেন। দেখতে পাচ্ছেন কি হুজুর।’
এবার কথাবার্তা বিনিময়ের সময় বুড়ো নিগ্রো জুপিটারের শরীরের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু খুলির ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া পোকা বেরিয়ে দড়ির প্রান্তটা দেখা যেতে লাগল।
বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভা পোকাটার গায়ে পড়ায় সেটা রীতিমত ঝলমলিয়ে উঠল। কাঁচাসোনার গা থেকে যেন অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা ঠিকরে বেরোতে লাগল।
আমি নিচে দাঁড়িয়ে ঝকমকে পোকাটার দিকে তাকিয়ে তার গা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে-আসা আলোকচ্ছটার শোভা উপভোগ করতে লাগলাম। সে মুহূর্তে আমার মনে হলো পোকাটি কোনোক্রমে ফসকে নিচে পড়ে গেলে একেবারে আমাদের পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পড়বে।
বন্ধুরা লিগ্র্যান্ডের মধ্যে দারুণ ব্যস্ততা লক্ষ্য করলাম। সে আমাদের চারদিকের কিছুটা অংশের জঙ্গল পরিষ্কার করতে মেতে গেল।
জঙ্গল মোটামুটি পরিষ্কার করা হয়ে গেলে সে এবার ওপরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল–‘জুপিটার, এবার দড়িটাকে হাত থেকে ছেড়ে দিয়ে তুমি নিচে নেমে এসো।
জুপিটার মনিবের নির্দেশ পালন করল।
জুপিটার দড়ির প্রান্তটা হাত থেকে ছেড়ে দিতেই ঝি ঝি পোকাটা যখন আছাড় খেয়ে পড়ল, লিগ্র্যান্ড ঠিক সেখানে ছোট্ট একটা খুঁটি পুঁতে চিহ্ন দিয়ে দিলেন। সে এবার কোটের পকেট থেকে একটা ফিতে বের করলেন। মাপের ফিতে।
লিগ্র্যান্ড এবার ফিতেটা দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে মাপামাপি করে গাছটাকে কেন্দ্র করে তার চারদিকে মাটির বুকে চারফুট ব্যাসযুক্ত একটা বৃত্ত অঙ্কন করল। এবার একটা কোদাল নিয়ে গর্ত খুঁড়তে লেগে গেলেন। আর জুপিটার আর আমাকেও বললেন কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়তে।
জুপিটার আর আমি উভয়েই তার গর্ত খোঁড়ার রহস্য আমরা তার হুকুম তামিল করতে গিয়ে উন্মাদের মতো গর্ত খুঁড়তে মেতে গেলাম।
একটা কথা, একেবারে আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা বলছি, এরকম মজার নিছক খেয়ালের বশবর্তী হয়ে আমি কোনো কাজ করার সম্পূর্ণ বিরোধী।
বিশেষ করে এরকম একটা কাজে, এমন বিশেষ মুহূর্তে আমি হয়তো তীব্র প্রতিবাদই করতাম। কারণ, রাত ঘনিয়ে আসছে, এক নাগাড়ে দীর্ঘ পরিশ্রমে শরীর ক্লান্ত, অবশ্য আমার অন্য দুজন সঙ্গি আমার চেয়ে বেশি ছাড়া কম ক্লান্ত নন। তা সত্ত্বেও ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ হলেও ব্যাপারটাকে এড়িয়ে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। কারণ, এ-পরিস্থিতিতে বন্ধু লিগ্র্যান্ডের যা মানসিক পরিস্থিতি তাতে করে তার বিরুদ্ধাচরণ করে তাকে মানসিক দিক থেকে উত্ত্যক্ত করা নিরাপদ হবে না।
একবার ভাবলাম লিগ্র্যান্ডকে বলপূর্বক বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু পরিস্থিতি যেখানে পৌঁছে গেছে তাতে এ-কাজে নিগ্রো জুপিটারের কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশা করা বৃথা।
সত্যি কথা বলতে কি, দু-চারদিনের পরিচয় হলেও এরই মধ্যে বুড়োনিগ্রোটার পরিচয় আমি ভালোই পেয়ে গেছি। তার মনিবের মতের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে গেলে, লড়াই বাঁধলে সে মনিবের বিরুদ্ধে, আমার পক্ষ অবশ্যই অবলম্বন করবে না।
তাই তো, বন্ধুর কাজে যতই বিরক্ত হই, যতই ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকি না কেন শেষ মেশ তার নির্দেশে মাটি খোঁড়ার কাজেই মেতে গেলাম।
আর আমার ব্যস্ততার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, মাটি খোঁড়ার কাজটা যত তাড়াতাড়ি মিটে যাবে ততই দুঃস্বপ্নে বিভোর আমার বন্ধুর নিঃসন্দেহ হবে যে, তার স্বপ্নটা নিছকই মরিচিকা, মিথ্যা।
আমরা এক নাগাড়ে দুঘণ্টা ধরে মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কাজে মেতে রইলাম। মাটিতে একের পর এক কোদালের কোপ পড়তেই লাগল। কারো মুখে টু-শব্দটিও নেই।
আমরা মুখে কলুপ এঁটে কোদাল চালিয়ে যাচ্ছি বটে, কিন্তু আমাদের সঙ্গি কুকুরটা কিন্তু আমাদের খোঁড়া জায়গাটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল।
শেষপর্যন্ত জুপিটার বিরক্তির সঙ্গে হাতের কোদালটা রেখে গর্ত থেকে উঠে এলো। কুকুরটাকে ধরে একটা দড়ি দিয়ে তার মুখটাকে আচ্ছা করে বেঁধে দিল। তারপর দড়ির একটা প্রান্ত গলার সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে দিল যাতে মুখের বাঁধনটা কোনোক্রমেই আলগা হয়ে না যায়।
কুকুরটার ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি বন্ধ করে জুপিটার আবার গর্তটার ভেতরে নেমে দমাদম কোদাল চালাতে লাগল।
