‘হ্যাঁ, আছে হুজুর।
‘কটা?’
‘এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ–হ্যাঁ, পাঁচটা দো-ডালা পার হয়েছি হুজুর।
‘বহুৎ আচ্ছা! আরও একটা দো-ডালা উঠে যাও। তারপর আবার আমার সঙ্গে কথা বলবে।’
মিনিট কয়েকের মধ্যেই আবার জুপিটারের গলা শোনা গেল–‘হুজুর, আমি এবার সপ্তম দো-ডালটায় বসে আছি। এবার কী করব, বলুন।
‘শোন জুপিটার লিগ্র্যান্ড গলা ছেড়ে বললেন। এবার তাঁর গলায় রীতিমত উত্তেজনা প্রকাশ–‘যাও, এগিয়ে যাও। আমার ইচ্ছা, ওই ডালটা বেয়ে যতটা পার এগিয়ে যাও। মন দিয়ে শোন, অত্যাশ্চর্য কোনো কিছু চোখে পড়ামাত্র আমাকে বলবে কিন্তু।
আমার বন্ধু লিগ্র্যান্ডের অসুস্থতা সম্বন্ধে আমার মনে যা কিঞ্চিৎ দ্বিধা ছিল এবার তা-ও নিঃশেষে উবে গেল। তাকে পুরোপুরি একজন পাগল ভাবা ছাড়া আর কোনো উপায়ই রইল না। যে মুহূর্তে আমার একটাই চিন্তা কিভাবে তাকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
আমিনিবিষ্ট মনে বন্ধুকে বাড়ি ফিরিয়ে নেবার উপায় সম্বন্ধে ভেবে চলেছি, ঠিক তখনই গাছের ওপরে থেকে বুড়ো নিগ্রো জুপিটারের গলা শোনা গেল–‘হুজুর, ডালটা একেবারে মরা। এটা ধরে এগোতে ভরসা হচ্ছে না।’
‘কী? কি বললে, ডালটা মরা?
‘হ্যাঁ হুজুর, দরজার পেরেকের মতোই ‘মরা। এক্কেবারেই মরা! ডালটার কম্ম কাবার হয়ে গেছে।’
লিগ্র্যান্ড যেন একেবারে হায় হায় করে উঠল–কী, কী বললে জুপিটার, মরা ডাল। হায় ঈশ্বর! এখন আমার কর্তব্য কি!
আমি এমন একটা মওকা পেয়ে চুপ করে থাকতে পারলাম না। তাই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম–‘কর্তব্য? একটাই কর্তব্য, বাড়ি ফিরে যাওয়া। বাড়ি ফিরে গিয়ে বিছানায় টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ন মি. লিগ্র্যান্ড। আপনি তো আমাকে প্রতিশ্রুতিই দিয়ে রেখেছেন। চলুন, একান্ত বাধ্য ছেলের মতো বাড়ি ফিরে বিছানায় আশ্রয় নেবেন।
আমার কথাটাকে না শোনার ভান করে লিগ্র্যান্ড ওপরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললেন–‘জুপিটার, আমার কথা কী তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে?
‘হ্যাঁ হুজুর। আপনার সব কথাই আমি শুনতে পাচ্ছি।
‘তাই যদি সত্য হয় তবে তোমার পকেট থেকে ছুরিটা বের করে কাঠটা পরীক্ষা করে দেখ তো। ভালোভাবে পরীক্ষা কর, সেটা খুব পচা কিনা।
‘পচা। অবশ্যই পচা। কিন্তু খুব বেশি পচা নয় হুজুর।
তবে এত ঘাবড়াচ্ছ কেন?
‘আমি একা হলে হয়তো আরও বেশ কিছুটা ওপরে উঠে যেতে পারতাম।
‘এ কী অদ্ভুত কথা বলছ জুপিটার। একা হলে! ব্যাপারটা কি খোলসা করে বলে তো?’
‘অবাক হচ্ছেন কেন হুজুর? আমি হতচ্ছাড়া পোকাটার কথা বলছি।
‘পোকাটা সঙ্গে থাকার জন্য তোমার এমনকি সমস্যা।
‘সমস্যা তো অবশ্যই। পোকাটা কী ভারি! এটা সঙ্গে না থাকলে, আমি একা হলে অনায়াসেই আরও বেশ কিছুটা ওপরে উঠে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার মতো একটানিগ্রোর ভারে ডালটা ভাঙবে না জানবেন।
লিগ্র্যান্ড এবার কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বললেন–‘পাগলের মতো কি যা তা বলছ, জুপিটার! শুনে রাখ, জুপিটার, ঝি ঝি পোকাটাকে যদি ফেলে দাও তবে কিন্তু কোদালের ঘায়ে তোমার মাথাটা দুভাগ করে দেব। আমার কথাগুলো তোমার কানে ঢুকছে তো?
‘পাচ্ছি। সামান্য একটা নিগ্রোর ওপর এমন চটাচটি করার কী খুবই দরকার ছিল হুজুর?
‘যাক গে, এবার কি বলছি, মন দিয়ে শোন, তুমি নিজে যতদূর উঠে যাওয়া সম্ভব মনে কর ততটা উঠে যাও। তবে ঝি ঝি পোকাটাকে যেন কিছুতেই ফেলে দিও না, বুঝলে?
‘বুঝেছি হুজুর।
‘আমার কথামতো কাজ করলে নিচে নেমে এলেই আমি তোমাকে একটা ভালো পুরস্কার দেব, কথা দিচ্ছি।’
জুপিটার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল–ঠিক আছে, আমি এখনই উঠছি।
পরমুহূর্তেই সে ভয়ার্তকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল–‘উফ! উফ! ওটা কি! গাছের ওপরে ওটা কি!
তাই তো, লিগ্র্যান্ড তার কথার মাঝেই বলে উঠলেন–কী? কী ওটা?
‘আরে, এটা তো একটা মাথার খুলি! কেউ হয়তো এটাকে গাছের ওপর ফেলে গেছে! হ্যাঁ, সত্যি, মাথার খুলিই বটে। কাকগুলো খুবলে খুবলে ওর মাংসগুলো খেয়ে নিয়েছে।’
‘খুলি! কী বললে? খুলি? ভালো কথা, ওটাকে ডালের সঙ্গে কী দিয়ে আটকানো আছে বল তো?’ লিগ্র্যান্ড বললেন।
‘দেখছি। দেখছি হুজুর। আরে, কী আশ্চর্য ব্যাপার। খুলিটাকে গাছের ডালের সঙ্গে পেরেক দিয়ে আটকানো।’
‘পেরেক দিয়ে? ঠিক আছে জুপিটার। এবার আমি যা-যা বলব, করবে। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ, সবই শুনতে পাচ্ছি।’
‘ভালো, এবার যা বলছি মন দিয়ে শোন, খুলির বাঁ চোখটার দিকে তাকিয়ে দেখ তো?’
‘আচ্ছা। কিন্তু হায়! কোনো চোখই তো আমার নজরে পড়ছে না! কী তাজ্জব ব্যাপার!
‘আরে, তুমি একেবারেই একটা বোকা হাঁদা নাকি হে, ডান-বা বোধও কি তোমার
নেই। কোনটা তোমার ডান হাত, আর কোনটাই বা বাঁ-হাত বোঝ না?’
‘বুঝি। এই তো, এটা আমার বা-হাত, আর এটা ডান-হাত। এটা দিয়েই তো আমি কাঠ কাটি, সব কাজ করি।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বলেছ ঠিকই। তুমি তো আবার ন্যাটা। বাঁ-হাতে সব কাজ কর। আর তোমার বাঁ-চোখটা তো তোমার বাঁ-হাতের দিকেই রয়েছে, এ-বোধটুকুও হারিয়ে বসেছ নাকি! এবার তো আর মড়ার খুলির বাঁ চোখটা খুঁজে পাওয়ার সমস্যা হওয়ার কথা নয়। খোঁজ, দেখ। কী, পেয়েছ?
বেশ কিছুটা সময় নীরবে কাটানোর পরনিগ্রো জুপিটার মুখ খুলল–‘হুজুর আর একটা ধন্দ দেখা দিয়েছে যে।
‘ধন্ধ? আবার কী হল?
