তার মুখে আচমকা এমন একটা প্রশ্ন শুনেই বুড়ো মানুষটা দারুণ ভড়কে গেল। কি জবাব দেবে ভেবে না পেয়ে চুপ করেই রইল।
লিগ্র্যান্ড কণ্ঠস্বরে একটু বিদ্রুপের রেশ টেনেই এবার বলল–‘কি হে জুপিটার। তুমি নানিগ্রো সন্তান। আর গাছটা দেখেই একেবারে মিইয়ে গেলে! সত্যি তুমি তোমাদের জাতের বদনাম করলে বটে।
মনে হলো কথাটায় জুপিটারের আঁতে ঘা লাগল। সে মুখ গোমড়া করে কয়েক পা এগিয়ে টিউলিপ গাছটার একেবারে গোড়ায় দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ওটাকে কেন্দ্র করে একটা পাক ঘুলে এলো। ঘাড়টাকে একেবারে পিঠের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়ে গাছটার মাথার দিকে চোখ বুলিয়েনিল। তারপর মুখ খুলল–
‘হ্যাঁ, হুজুর, আমি জীবনে যত গাছ দেখেছি তার সবগুলোতেই চড়তে পারি।’
লিগ্যান্ড উল্লসিত হয়ে বলল–‘তবে এক কাজ কর, যত শীঘ্র সম্ভব কাজে লেগে যাও জুপিটার।
আমি এতক্ষণ নীরবে তাদের কথাবার্তা শুনছিলাম। কিন্তু গাছটার প্রসঙ্গে বন্ধুর আগ্রহ এমন অত্যুগ্র দেখে আমি ব্যাপারটা সম্বন্ধে কিছু বুঝতে না পেরে ভেতরে ভেতরে বড়ই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম।
কিন্তু আমি মুখ খোলার আগেই মি. লিগ্র্যান্ডই আবার বলতে লাগলেন– ‘শোন জুপিটার, যত শীঘ্র সম্ভব গাছটায় উঠে পড়। নইলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এমন অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে যে, আমরা যে অমূল্য সম্পদের খোঁজে এখানে হন্যে হয়ে ছুটে এসেছি তার আর দেখাই মিলবে না। আমাদের সব প্রয়াস ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু হুজুর, বলে দিন আমাকে কতটা ওপরে উঠতে হবে।
‘এক কাজ কর, সবার আগে মূল কাণ্ডটা বেয়ে ওপরে উঠতে থাক। তারপর কোন দিকে যেতে হবে আমি বলে দেব।’
বুড়োনিগ্রো জুপিটার মনিবের হুকুম তামিল করার উদ্যোগ নিতেই লিগ্র্যান্ড ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল–‘আরে করছ কী! করছ কী! থাম থাম!’
জুপিটার হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
জুপিটার বলল–‘তুমি যে খালি হাতেই উঠতে শুরু করেছ হে! ঝি ঝি পোকাটাকে সঙ্গে নিয়ে যাও।
চমকে উঠে জুপিটার বলল–পোকা? ওই পোকাটাকে সঙ্গে নিতে হবে কেন? হুজুর, ওটাকে কি সঙ্গে না নিলেই নয়? কিন্তু ব্যাপারটা তো আমার মাথায়ই–‘।
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই লিগ্র্যান্ড বিদ্রুপের সুরে বলে উঠলেন–এ কী অবিশ্বাস্য কথা জুপিটার। বুড়ো হয়েছ বটে, কিন্তু তোমার মতো বিশালদেহী ও অমিত শক্তিধর একটানিগ্রো যদি এ-সামান্য পোকাটাকে দেখে এমন কুঁকড়ে যায় তবে যে অবাক হবারই কথা। তার ওপর পোকাটা মরা।’
জুপিটার নীরবে দাঁড়িয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলটা মাটিতে ঘষতে লাগল।
লিগ্র্যান্ড বলে চললেন–শোন জুপিটার, পোকাটাকে যদি তোমার খুবই ভয় লাগে তবে এক কাজ কর না কেন, ওটাকে এভাবে দড়িতে ঝুলিয়ে নিলেই তো আর সমস্যা থাকে না।
জুপিটার তবুও নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
লিগ্র্যান্ড এবার হঠাৎ রেগেমেগে একেবারে আগুন হয়ে গিয়ে গর্জে উঠলেন– ‘আমার সাফ কথা শোন জুপিটার, তুমি যদি পোকাটাকে কিছুতেই সঙ্গে নিতে রাজি না হও তবে আমি এ-কোদালটা দিয়ে তোমার মাথাটাকে দু টুকরো করে দেব। এখনও সময় আছে, ভেবে দেখ, কী করবে?
জুপিটার জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল–‘আরে ধৎ! কি যে বলেন, হুজুর! আমি তো মস্করা করছিলাম। আচ্ছা হুজুর, আপনি কথায় কথায় বুড়ো মানুষটার সঙ্গে এমন রসিকতা করেন কেন, বলুন তো? কি যে বলেন, আমি ওই নচ্ছাড় পোকাটাকে ভয় পাব। আমি ওটাকে মোটেই পরোয়া করি না, জেনে রাখবেন।
জুপিটার কথা বলতে বলতে একটা দড়ির শেষ প্রান্তে ঝি ঝি পোকাটাকে বেঁধেনিল। তারপর দড়ির অন্য প্রান্তটাকে নিজের কোমড়ের সঙ্গে এমনভাবে বাধল যাতে শরীর ও পোকাটার মধ্যে বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় থাকে।
ব্যস, জুপিটার এবার গাছে চড়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিয়ে গাছের গোড়াটাকে জাপ্টে ধরল। তারপর দু-একবার পা হড়কে পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়ে বহু চেষ্টার পর প্রথম দো-ডালটায় পা রাখতে পারল। এবার সে যেন কিছুটা অন্তত হাঁপ ছেড়ে বাঁচল।
গাছের ওপর থেকে জুপিটার গলা-ছেড়ে বলল–হুঁজুর, এবার কোন ডালটা বেয়ে উঠতে হবে বলে দিন।
লিগ্র্যান্ড গলা চড়িয়েই জবাব দিলেন–এক কাজ কর, ওই মোটা ডালটা ওই, ওই যে ওই ডালটা বেয়ে সোজা ওপরে উঠে যাও।’
মনিবের নির্দেশ পাওয়া মাত্র বুড়োনিগ্রো জুপিটার এবার দ্রুততালে হাত পা চালিয়ে মনিবের নির্দেশিত ডালটা বেয়ে সোজা ওপরে উঠে যেতে লাগল।
জুপিটার তরতর করে ওপরে উঠছে তো উঠছেই। অচিরেই সে হাত দিয়ে ডালপালা সরিয়ে সরিয়ে এত ওপরে উঠে গেল যে, তাকে আর চোখেই পড়ছে না।
কিছুক্ষণ বাদে ডালপালা দুহাতে দুদিকে ঠেলে ধরে সামান্য ফাঁক করে চেঁচিয়ে বলল–‘হুজুর, আর কত ওপরে উঠতে হবে, বলুন?
‘তুমি কতটা ওপরে উঠেছ আমার তো পরিষ্কার মালুম হচ্ছে না।
‘অনেক অনেক ওপরে হুজুর। এখান থেকে আকাশটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।’
‘সামনেই একটা দো-ডালা আছে মনে হচ্ছে, ঠিক কী?
‘হ্যাঁ হুজুর, ঠিকই বলেছেন। আকাশের দিকে–’
‘আকাশের কথা ছাড়ান দাও।
‘সে না হয় ছাড়ানই দিলাম হুজুর। কিন্তু আপনি আমাকে এখন কী করতে বলছেন?
‘সমন দিয়ে শোন, গাছের নিচের দিকে চোখ মেলে এদিকে যতগুলো দো-ডাল আছে গুনে ফেল তো। আর একটা কথা, তুমি ইতিমধ্যে কতগুলো দো-ডালা পার হয়েছ, খেয়াল আছে কী?
