আমি সহানুভূতির সঙ্গে বললাম–‘মি. লিগ্র্যান্ড, আপনি আমার কথা কতখানি বিশ্বাস করবেন আমার জানা নেই। তবে আমার সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা লাভের ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
‘অবশ্যই অবশ্যই! এ-বিশ্বাসটুকু আমার আছে বলেই তো আপনাকে কষ্ট দিয়ে এখানে ডেকে এনেছি।’
‘একটা কথা আমাকে খোলাখুলি বলুন তো মি. লিগ্র্যান্ড, আপনার আসন্ন পর্বত অভিযানের সঙ্গে নরকের কীট এ-সোনালি ঝি ঝি পোকাটার কোনো সম্পর্ক আছে কী?
মুচকি হেসে তিনি ছোট্ট করে জবাব দিলেন–‘হ্যাঁ, তা আছে বটে। আমি বিষণ্ণমুখে বললাম–মি. লিগ্র্যান্ড, তা-ই যদি হয় তবে আমি আপনার এ কাজের সহায়ক হতে রাজি নই, এমন একটা যুক্তিবিরুদ্ধ কাজ–
‘সে কি কথা! আপনি আমাকে হতাশ করবেন ভাই।
‘আমি নিরুপায়! আমাকে মাফ করবেন।
চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন–‘যদি তা-ই হয় তবে আমি দুঃখিত। বড়ই দুঃখিত। তবে কাজটা আমাকে করতেই হবে।
‘আপত্তির কি থাকতে পারে। আপনারা নিজেরাই অভিযান চালিয়ে দেখুন।
আমি বুঝলাম, লোকটারনির্ঘাৎ মাথার দোষ দেখা দিয়েছে।
আমি তার বিমর্ষ মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললাম–‘মি. লিগ্র্যান্ড, আপনারা কতক্ষণ এ-বাড়ির বাইরে থাকবেন বলে মনে করছেন।
‘এমনও হতে পারে সারা রাতই আমাদের বাইরে কাটাতে হবে।’
‘আপনারা কখন বেরোতে চাচ্ছেন?
‘এখনই। আর বোধহয় সকালের আগে ফেরা হবে না।’
‘একটা কথা, আপনার সম্মানের খাতিরে আমি কি আপনার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পেতে পারি, আপনার মাথার পোকা যখন নেমে যাবে, অর্থাৎ এ-উদ্ভট খেয়ালটা যখন কেটে যাবে, বাড়ি ফিরবেন তখন আপনার চিকিৎসকের পরামর্শের মতোই আমার সব উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন?
‘ঠিক আছে তা-ই হবে।’
‘ধন্যবাদ। খুবই খুশি হলাম। তবে আমি আপনাদের সঙ্গদান করব।’
‘এবার তবে আমরা যাত্রা করি, কি বলেন, কারণ দেরি করলে আবার কাজটা ভেস্তে যেতে পারে।’
বিষণ্ণমনে হলেও আমি তাদের অনুসরণ করে চললাম। আমরা চারটার সময় রওনা দিলাম।
আমরা মোট চারটা প্রাণী, বন্ধু লিগ্র্যান্ড, জুপিটার, আমি আর বিশালদেহী কুকুরটা–লম্বা লম্বা পায়ে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম।
কোদাল আর কাস্তে কটা জুপিটার হাতছাড়া করল না।
সেগুলো সে নিজের জিম্মায়ই রাখল। লিগ্র্যান্ড চাইলেও সে কোনো একটাও দিতে সম্মত হলো না।
একটা ব্যাপার আমার নজর এড়ালো না। জুপিটারকে সারাটা পথ গোমড়া মুখে কেবল বিরক্তির সঙ্গে ঘোৎ ঘোঁৎ করতেই দেখলাম। কেবল থেকে থেকে বেশ রাগতস্বরেই বলতে লাগল–‘হতচ্ছাড়া শয়তান পোকা! শয়তানটা জাহান্নামে যাক।
আমি হাতে করে বইতে লাগলাম–কেবলমাত্র কালি-ঝুলি মাখা দুটো লণ্ঠন।
আর বন্ধুবর লিগ্র্যান্ডের হাতে এ-কর্মকাণ্ডের নায়ক যে সোনালি ঝিঁঝি পোকাটা সে একটা চামড়ার চাবুকের মাথায় সেটাকে ঝুলিয়ে নিয়েছে। চাবুকটাকে বার বার এদিক ওদিক দোলাতে দোলাতে সে যাদুকরের বিশেষ ভাব নিয়ে পথ চলতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা তড়িঘড়ি পথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপটার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলাম! ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকার সাহায্যে অপ্রশস্ত খাড়িটা পাড় হলাম।
খাড়ির বিপরীত পাড়ে পৌঁছে আমরা পা-টিপে টিপে মূল ভূখণ্ডের উঁচু জমিতে হাজির হলাম।
এবার আমাদের গতি মূল ভূখণ্ডের উত্তর-পশ্চিম দিকে। দেখলাম, পুরো অঞ্চলটাই ঝোঁপঝাড়ে ছেয়ে রেখেছে। জনমানুষের চিহ্নও চোখে পড়ল না। মানুষ তো দূরের কথা পথে-প্রান্তরে কোনো মানুষের পায়ের চিহ্নও নজরে পড়ল না।
বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড সবার আগে আগে নিঃসঙ্কোচে পথ পাড়ি দিতে লাগল।
আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই মুখে যেন কলুপ এঁটে পথ পাড়ি দিচ্ছি। এমনকি আমাদের সঙ্গি কুকুরটাও টু-শব্দটি করছে না।
আমরা এভাবে নীরবে প্রায় ঘণ্টা দুই পথ চললাম। তারপর সারা দিনের কর্মক্লান্ত সূর্যটা যখন পশ্চিমে আকাশের গায়ে বিদায় নেবার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ল তখন আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছালাম সেটাকে অধিকতর নির্জন-নিরালা আর ভয়ঙ্কর বলে মনে হতে লাগল।
আমরা ঝোঁপঝাড়ের মাঝখান দিয়ে পথ কওে নিয়ে এমন একটা প্রায় সমতল ভূমিতে হাজির হলাম, যার সামনে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় দুরারোহ একটা পর্বত, পর্বতের চূড়া।
চোখ বুলিয়ে দেখলাম পর্বতটার পাদদেশ থেকে একেবারে চূড়া পর্যন্ত ঘন ঝোঁপঝাড়ের বিচিত্র সমারোহ। আর চারদিকে–এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু গিরিখাত।
আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পুরো অঞ্চলটা, বিশেষ করে পর্বতটার আগাগোড়া অনুসন্ধিৎসু চোখের মণি দুটো বুলিয়ে নিয়ে উপলব্ধি করলাম, পুরো দৃশ্যটাতেই অবর্ণনীয় একটা গাম্ভীর্য বিরাজ করছে। আর অধিকতর রুক্ষতার স্পর্শ।
আমরা আবার এগিয়ে চললাম। বহু কষ্টে আরও কিছুটা এগিয়ে আমরা আকাশ ছোঁয়া একটা টিউলিপ গাছের তলায় গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম। তার লাগোয়া, একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে আট-দশটা ওক গাছ।
টিউলিপ গাছটার তলায় পৌঁছেই লিগ্র্যান্ড দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমরা পা থামাতে বাধ্য হলাম।
টিউলিপ গাছটার গোড়া থেকে মাথা পর্যন্ত মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে লিগ্র্যান্ডনিগ্রো জুপিটারের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন–‘গাছটাকে একবারটি ভালোভাবে পরখ করে নিয়ে বল তো এটার শেষ মাথায় উঠে যেতে পারবে?
