আমাকে নীরব দেখে তিনিই আবার ভাববিমুগ্ধ কণ্ঠে বলতে লাগলেন–‘আপনি কী ভাবছেন জানি না, তবুও আমি বেশ জোর দিয়েই বলছি, ঝি ঝি পোকাটাই আমার ভাগ্য ফিরিয়ে দেবে।
আমি এবারও মৌন রইলাম।
তিনি বলে চললেন–সেটার দৌলতেই আমার হাল ফিরে যাবে, আমি নিঃসন্দেহ। আমায় পারিবারিক ঐশ্বর্যের আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে দেবে। তাই তো
আমি সেটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছি। অতএব ব্যাপারটা নিয়ে অবাক হবার কিছুমাত্র কারণও নেই।’
‘তাই বুঝি?
‘অবশ্যই। একেবারে শতকরা একশো ভাগ সত্যি। যেহেতু বিধাতাপুরুষ আমাকেই এ-অমূল্য সম্পদের অধিকারী মনে করে লক্ষ্মীমন্ত পোকাটাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, তাই তো আমি সেটাকে যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমেই সে সোনার খনির অধিকারী হব, এ পোকাটা যার প্রতীক।
‘তা যদি হয় তবে তো মঙ্গলের কথা।’
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মি. লিগ্র্যান্ড ঘাড় ঘুরিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে-থাকা বুড়োনিগ্রো জুপিটারকে বলল, এক কাজ কর, সে-পোকাটাকে নিয়ে এসো তো।
‘কোনটা? সেই পোকাটা? রাগ করবেন না হুজুর, আমার দ্বারা এ-কাজ হবে না।
তিনি একটু গম্ভীর স্বরেই বললেন–কেন?
‘আমি ওসব ঝামেলায় নেই। আপনি নিজে গিয়েই বরং নিয়ে আসেন।
মি. লিগ্র্যান্ড আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই উঠে রীতিমত রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঝি ঝি পোকাসমেত একটা কাঁচের পাত্র হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
আমি কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময়ের ছাপ চোখে এঁকে বহুকথিত ঝিঁঝি পোকাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যি স্বীকার না করে উপায় নেই, পোকাটা বাস্তবিকই সুন্দর, বড়ই দৃষ্টিনন্দন। আর আর প্রকৃতি-বিজ্ঞানীদের এসব খবর জানা না থাকায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর মূল্য অসীম।
আমি বন্ধুর হাতের কাঁচ পাত্রটার দিকে সাধ্যমত ঝুঁকে অনুসন্ধিৎসু নজরে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দেখলাম, সেটার আঁশগুলো অস্বাভাবিক শক্ত আর চকচকে ঝিল্লা দিচ্ছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ঠিক যেন পালিশ করা সোনা। আর ওজনও যথেষ্টই।
সবকিছু বিচার-বিবেচনা করলে জুপিটারকে দোষারোপ করা চলে না। কারণ, পোকাটা সম্বন্ধে সে যে অভিমত ব্যক্ত করেছে, কার্যত চোখের সামনে দেখছিও ঠিক তা-ই।
ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন গোলমেলে মনে হল। ব্যাপারটা হচ্ছে, আমার বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড কি করে তার বক্তব্যকে সমর্থন করছে?
আমি যখন বন্ধুর হাতে রক্ষিত ঝিঁঝি পোকাটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ব্যাপারটা নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবে চলেছি, তখন সে রীতিমত ভাবাপুতকণ্ঠে বলল–একটা কথা কী জানেন মি.’।
আমি যেন অকস্মাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলাম–‘কী? কীসের কথা বলছেন মি. লিগ্র্যান্ড।
‘কথাটা হচ্ছে, ভাগ্যদেবতা আর এ-ঝিঁঝি পোকাটার নির্দেশকে বাস্তব রূপ দিতে আপনার বুদ্ধি-পরামর্শ আর সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা পাবার প্রত্যাশা নিয়ে আপনাকে কষ্ট দিয়ে এখানে নিয়ে আসা।
আমি অকস্মাৎ উন্মাদের চেঁচিয়ে উঠলাম–‘বন্ধু লিগ্র্যান্ড, আমি নিসন্দেহ, আপনি অবশ্যই অসুস্থ। আপনি নির্ঘাৎ স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেছেন। আমি বার বার আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, এখনও সময় আছে, সাবধান হোন।
তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে তিনি বললেন–‘তাই নাকি? কী যে বলেন ভাই।
‘হ্যাঁ যা সত্যি, ঠিক তা-ই বলছি। আমার পরামর্শ যদি সত্যি নিতে চান তবে বিছানায় শুয়ে পড়ুন। আপনি সম্পূর্ণ নিরাময় না হওয়া অবধি আপনার কাছেই থাকব, কথা দিচ্ছি।’
‘অসুখ? আমি অসুস্থ-–’
‘না, আপনি অবশ্যই সুস্থ নন। জ্বরে ভুগছেন আর আপনি—’
আমার মুখের কথা শেষ হবার আগেই তিনি হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন–‘ভালো কথা, আমার নাড়িটা দেখুন তো।’
আমি তার নাড়ি টিপে ধরে চোখ বুজে মিনিট খানেক কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু কই, জ্বরের সামান্যতম লক্ষণও পেলাম না।
মি. লিগ্র্যান্ড ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপাত্মক হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন–‘কী? কী বুঝছেন?’
‘না, জ্বরের কোনো লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে না বটে।
‘তবে?
‘কিন্তু জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও-জ্বর না হলেও আপনি অসুস্থ হতে পারেন। আমার ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন লিগ্র্যান্ড। আমার প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, আপনি গিয়ে বিছানায় চুপটি করে শুয়ে পড়ুন। তারপর আমি যা—’
আমাকে থামিয়ে দিয়ে তিনি বলে উঠলেন–‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছি, আপনি ভুল করছেন।
‘ভুল। আমি ভুল করছি।
‘অবশ্যই। সত্যি কথা বলতে কি উত্তেজনার মধ্যে দিয়ে আমার দিন, প্রতিটা মুহূর্ত কাটছে সে পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে আমি খুবই সুস্থ আছি। বরং আপনি যদি যথার্থই আমার সুহৃদ হয়ে থাকেন তবে আমাকে এ-উত্তেজনার কবল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করুন।
‘সেটা কী করে সম্ভব হতে পারে, আপনিই বলুন।
‘খুবই সহজ ও সরল।’
‘খোলসা করে বলুন, আপনার বক্তব্য কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না মি. লিগ্র্যান্ড।
‘হ্যাঁ ঠিক তাই। আপনার ওপর আমি সব দিক থেকে ভরসা করতে পারি। মোদ্দা কথা, আমাদের বিশ্বাসযোগ্য একমাত্র লোকই হচ্ছেন আপনি।
‘এরকম ধারণা আপনার মধ্যে—’
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই তিনি এবার বললেন–‘দেখুন, আমরা সামান্য লাভ করি আর বিফলমনোরথই হই, উভয়ক্ষেত্রেই আপনি আমাকে সে উত্তেজনার মধ্যে দেখেছেন সেটা সমানভাবে প্রশমিত হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
