একমাত্র যে অপরাধ, এ-অপরাধেই জুপিটার আমাকে মারার জন্য লাঠি নিয়ে তেড়ে গিয়েছিল। আরও আছে, আমাকে মারধর করার জন্য সে ইদানিং একটা বেশ বড় লাঠি তৈরি করে রেখেছে। আমি হলফ করেই বলতে পারি, আমার অসহায় দৃষ্টিই তার লাঠির আঘাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
এবার আমার সাংসারিক পরিস্থিতির কথা বলছি, শোন–ইতিমধ্যে আমার সংসারে সামান্যতম পরিবর্তনও হয়নি। যা ছিলাম, আজও তা-ই আছি।
আমার অনুরোধ, যে করেই হোক, জুপিটারের সঙ্গেই চলে আসবেন। আমার একান্ত অনুরোধ, অতি অবশ্যই বলে আসবেন। আমি চাই, আজ রাতেই আপনার সঙ্গে দেখা হোক। খুবই জরুরি দরকার, মনে রাখবেন। আপনাকে আরও জোর দিয়ে, নিশ্চিত করে বলছি, কাজটা খুবই জরুরি।
ধন্যবাদান্তে
উইলিয়াম লিগ্র্যান্ড
চিঠিটা মনোযোগ দিয়ে আদ্যোপান্ত পড়ার পর সেটা ভাজ করতে করতে ভাবলাম, চিঠিটার মধ্যে এমন একটা বিশেষ সুর রয়েছে যা আমার মনকে যারপরনাই অস্থির করে তুলল।
কিন্তু একটা ব্যাপারে আমার মনে খটকা লাগল যে, চিঠিটার লেখার কায়দা কৌশল আমার বন্ধু লিগ্রন্ডের লেখার পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্য তো নেই-ই, বরং বৈসাদৃশ্যই পুরোদস্তুর। তিনি কোন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকেন?
কোন কল্পনাই বা তার মাথায় পাকাপাকিভাবে চেপে বসেছে।
আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্যই বা তিনি এখন অস্থির হয়ে পড়েছেন? ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে আমি কিছুতেই কিনারা করতে পারছি না।
জুপিটার যা-কিছু বলল তা মোটেই সুবিধার নয়। এ-মুহূর্তে আমার একটাই আশঙ্কা হচ্ছে, নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের চাপ সহ্য করতে না পেরে আমার বন্ধু লিএ্যান্টের মাথার দোষই হয়তো দেখা দিয়েছে।
বুড়ো নিগ্রো জুপিটারের বিবরণ শুনে এবং বন্ধুর চিঠিটা পড়ার পর আমি তার বাড়ি যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।
আমি জুপিটারের সঙ্গে বাড়ি থেকে রওনা হয়ে জাহাজ ঘাটের দিকে চললাম।
জাহাজঘাটে পৌঁছে আমি রীতিমত ভড়কে গেলাম। দেখলাম আমাদের নৌকার খোলের ভেতর তিনটি কোদাল আর একটা কাস্তে রাখা আছে। সবগুলোই নতুন, চকচকে ঝকঝকে।
আমি বস্তুগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জুপিটারের দিকে তাকালাম। চোখে-মুখে জিজ্ঞাসার ছাপ একে বললাম–কী ব্যাপার জুপিটার, এসব কেন?
সে স্বাভাবিক স্বরেই জবাব দিল–‘হুজুর, এগুলো তো তারই জন্য জোগাড় করে এখানে রাখা হয়েছে।’
‘সে না হয় বুঝলাম; কিন্তু আমি জানতে চাইছি, এগুলো এখানে রাখার অর্থ কী?
‘আমার মনিব আমাকে শহর থেকে এগুলো কিনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’
‘হুম।
‘আর এগুলোর জন্য আমাকে বহু টাকা ব্যাটাদের দিতে হয়েছে।
‘আমি যেটা জানতে চাইছি কোদাল আর কাস্তে দিয়ে মি. লিগ্র্যান্ড কোন কাজ করবেন ভেবেছেন, বলতে পার?
‘এত কথা তো আমি বলতে পারব না হুজুর। আর তিনি নিজের জানেন না। তবে এটুকু বলতে পারি, কোদাল আর কাস্তে সবই ওই হতচ্ছাড়া পোকাটার জন্য।’
জুপিটারের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নিলাম, তার মুখ থেকে কিছুই জানা যাবে না। কারণ, তার মাথায় এখন ওই সোনালি পোকাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
যাই হোক, বুড়োনিগ্রো জুপিটারের কাছ থেকে কোনো তথ্য জানার আশা ছেড়ে দিয়ে নৌকায় পাল তুলে দিলাম। পালে বাতাস পেয়ে নৌকাটা গন্তব্যস্থলের দিকে উল্কার বেগে ছুটে চলতে লাগল।
অচিরেই আমাদের ময়ুরপঙ্খী নৌকাটা মূলট্রি দুর্গের উত্তরে পৌঁছে গেল। নৌকা নোঙর করা হল।
নৌকা থেকে নেমে দুমাইল পথ পায়ে-হেঁটে পাড়ি দিয়ে আমরা বন্ধু মি. লিগ্র্যান্ডের কুড়ে ঘরে হাজির হলাম।
তখন বিকেল, তিনটা বাজে।
বন্ধু মি. লিগ্র্যান্ড আমাদের জন্য অধীর প্রতীক্ষায় বারান্দায় পায়চারী করছেন। দেখলাম।
আমাকে কাছে পেয়েই তিনি এমন স্নায়ুবিক বিহ্বলতায় আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন, যা আমার মধ্যে রীতিমত ভীতির সঞ্চার করল। আমার বুকে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে-বসা সন্দেহটা আরও অনেকগুণ দৃঢ় হয়ে উঠল।
তার মুখের দিকে চোখ সরিয়েই আমি চমকে উঠলাম। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে, একেবারে চকের মতো হয়ে গেছে। গর্তে বসা চোখ দুটো খুবই জ্বল জ্বল করছে।
তার মুখোমুখি হয়ে কুশলবার্তাদি লেনদেনের পর জিজ্ঞাসা করার মতো কোনো প্রসঙ্গ হাতড়ে না পেয়ে প্রথমটায় চেপেই গেলাম। পরমুহূর্তে, এমন একটা ভান করলাম যেন নিছকই মামুলি একটা প্রশ্ন করছি–ও ব্যাপারটি কী হলো বলুন তো মি. লিগ্র্যান্ড।
তিনি ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন–‘কী? কোন ব্যাপারটা?
‘ওই যে, ঝি ঝি পোকাটা! সেটা তো লেটেন্যান্ট জি-র কাছে ছিল বলছিলেন?
‘হ্যাঁ, পোকাটাকে ধরার পর তার জিম্মাতেই রেখে এসেছিলাম।
‘এখনও কী সেটা তার কাছেই রয়ে গেছে?
‘না, পরদিন সকালেই তিনি আমাকে দিয়ে গেছেন। আরে ভাই, সেটাকে এখনও তার কাছে ফেলে রাখব সে বান্দা আমি নই। কোনো প্রলোভনেই ঝি ঝি পোকাটাকে আমি বেহাত করতে নারাজ।
‘হ্যাঁ, সে দিন আপনার কথায় আমিও তা-ই ভেবেছিলাম!
একটা কথা কি জানেন, পোকাটার ব্যাপারে জুপিটারের কথাই ঠিক।
আমি মনে মনে বিপদের আশঙ্কা করেই এবার বললাম–‘জুপিটারের কথা? কোন কথাটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, বলুন তো মি. লিগ্র্যান্ড?
‘জুপিটারই তো বলেছিল, পোকাটা সোনার,নিরেট সোনার তৈরি।
মি. লিগ্র্যান্ড কথাটাকে খুবই গম্ভীরভাবে ছুঁড়ে দিলেন বটে। কিন্তু আমি যারপরনাই বিমর্ষ হলাম।
