আমি সবিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ মিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম–সে কী হে! এ তুমি বলছ কী!’
‘হুজুর মিথ্যে বলব না, তার আচরণে নিজেকে সামলে রাখাই আমার পক্ষে দায় হয়ে পড়েছিল বলেই, যা কখনই উচিত নয় তা-ই করতে আমি উদ্যত হয়েছিলাম।
আমি এবার বললাম–‘জুপিটার, তোমাকে একটা কথা বলছি, মন দিয়ে শোন, বেচারির ওপর এত নির্দয় হইও না। ভুলেও যেন কোনোদিন তাঁর গায়ে হাত তুলা না। এমন নির্মম-নিষ্ঠুর আচরণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। আর একটা কথা, তার এ আকস্মিক ব্যাধিটা সম্বন্ধে তুমি কিছু অনুমান করতে পারছ কি?
জুপিটারের চোখে মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। সে যে গভীর মনোযোগ সহকারে ভাবছে। তার লক্ষণ প্রকাশ পেল সদ্য ফুটে ওঠা ভাঁজ কাটার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সে মুখে কিছুই বলল না।
আমি তার চিন্তাক্লিষ্ট মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বললাম–একটা কথা, ভালোভাবে ভেবে জবাব দাও তো, তোমাদের সঙ্গে আমার শেষবারের মতো ছাড়াছাড়ি হবার পর কোন অপ্রিয়, বা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল কি?
‘না হুজুর, তেমন কিছু আমার চোখে অন্তত পড়েনি। তবে–
আমি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম–‘তবে’
‘তবে কি?
‘আপনি আমাদের ওখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসার পর অবাক হবার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি সত্য। কিন্তু আপনি যে দিন চলে এলেন ঠিক সেদিনই, আপনি থাকতে থাকতেই সেদিন–‘
‘সেদিন–আমি যখন সেখানে ছিলাম তখনই–‘।
‘হ্যাঁ, সে দিনই।’
‘জুপিটার, হেয়ালি রেখে তুমি কি বলতে চাইছ খোলসা করে বল।
‘হুজুর ওই যে ঝিঁঝি পোকাটা’।
‘হ্যাঁ, সেটার কথা আমি নিজেই কিছু কিছু শুনে এসেছিলাম। কেন? ওই পোকাটাকে কেন্দ্র করে অঘটন ঘটেছি কী? ভালো কথা, সেটা কি এখনও সেখানে আছে।
‘আছে। আছে। অবশ্যই আছে হুজুর।
‘পোকাটা করেছে কি যে, সেটার প্রসঙ্গ উঠতেই তোমার মধ্যে এমন উৎকণ্ঠা জেগেছে।
‘হুজুর, আমার বিশ্বাস, নচ্ছাড় ওই সোনালি পোকাটা আমার মনিবের মাথায় কামড় বসিয়ে দিয়েছে।’
‘কী? কি বললে জুপিটার। পোকাটা মি. লিগ্র্যান্ডের মাথায় কামড় দিয়েছে?
‘হতেই হবে হুজুর। শয়তানটানির্ঘাৎ প্রভুর মাথায় মরণ কামড় বসিয়ে দিয়েছে।’
‘তোমার এমন বদ্ধমূল ধারণাটা হলো কী করে? বলবে কি?
‘শুনুন তবে হুজুর, ওই শয়তান পোকাটাকে আমিই প্রথম দেখেছিলাম। কিন্তু প্রভুই তাকে প্রথম ধরেছিলেন। ঠিক সে মুহূর্তেই শয়তানটা তার মাথায় মোক্ষম কামড় বসিয়ে দিয়েছিল।
‘তবে তুমি নিঃসন্দেহ যে, ওই পোকাটা তোমার মাথায় কামড়ে দিয়েছিল?
এবার সে আমতা আমতা করে বলল–‘দেখুন হুজুর, আমি তো আর সেটাকে নিজের চোখে কামড়াতে দেখিনি। তবে আমার এটাই ধারণা। তা যদি না হবে তবে এতদিন কিছু ঘটল না, তিনি সোনালি পোকাটা যেদিন ধরলেন, ঠিক সেদিন থেকে এমন একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলই বা কেন, আপনিই বলুন?
‘ভালো কথা, তোমার মনে এমন একটা ধারণা কেনই বা দানা বাঁধল, খোলসা করে বল তো জুপিটার?
‘হুজুর, আমার ধারণা যদি সত্যি না-ই হয় তবে আমার মনিব কেনই বা চোখ বুঝলেই সোনার স্বপ্ন দেখেন।
আমি হৃদুটো কুঁচকে, কপালের চামড়ায় ভাঁজ একে বললাম–‘তিনি যে চোখ বুজলেই কেবল সোনার স্বপ্ন দেখেন তা-ই বা তুমি জানলে কী করে?
‘সোনার কথা কী করে জানলাম?
‘হ্যাঁ, এটাই তো আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করছি।’
‘হুজুর, তিনি যদি সোনার স্বপ্ন না-ই দেখবেন তবে ঘুমের ঘোরে কেবল ‘সোনা সোনা’ বলেন কেন? অন্য কোনো কথাও তিনি উচ্চারণ করতে পারতেন, ঠিক কি না?
‘শোন জুপিটার, এমনও হতে পারে, তোমার কথাই ঠিক। একটা কথা, কোন্ ভাগ্যগুণে তুমি এখানে এসে আমাকে সম্মানিত করলে, বল তো?’
জুপিটার থতমত খেয়ে বলে উঠল–‘হুজুর, ব্যাপার কি, আমার মাথায় আসছে না তো। দয়া করে একটু খোলসা করে–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই আমি বলে উঠলাম ‘সত্যি করে বল তো জুপিটার, তুমি কি আমার বন্ধু মি. লিগ্র্যান্ডের কাছ থেকে আমার জন্য কোনো খবর নিয়ে এসেছ?
খবর? খবর আর কি আনব হুজুর? তবে আপনার জন্য এ চিঠিটা কেবল নিয়ে এসেছি।’
‘চিঠি? কোথায় সে চিঠি?
জুপিটার তার কুর্তার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে আমার হাতে তুলে দিতে দিতে বলল–এইনিন, আমার হুজুর এটাই আপনাকে দিতে বলেছেন।
আমি হাত বাড়িয়ে তার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ব্যস্ততার সঙ্গে ভাঁজ খুলে চোখের সামনে ধরলাম। তাতে লেখা রয়েছে–
প্রিয় বন্ধু
এমন দীর্ঘকাল আপনার দেখা না পাওয়ার কারণ কী, বলুন তো? আমার বিশ্বাস এত বোকা নন যে, আমার দু-একটি কটু ব্যবহারেই আমার ওপর ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু সেটা তো হবার নয়।
একটা কথা, আপনার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হবার পর আমার ব্যস্ততা, উৎকণ্ঠার কারণ যথেষ্টই রয়েছে। আপনাকে আমি কিছু বলতে চাই, বলা দরকারও বটে। কিন্তু না, বলার কোনো উপায়ই তো দেখছি না, আবার আদৌ বলা সঙ্গত হবে কিনা, ভেবে পাচ্ছি না।
তবে এটুকু বলছি যে, গত দিন কয়েক ধরে আমার শরীর ও মন কিছুই সুস্থ নয়। আর বুড়ো জুপিটারও এমনই হতভাগা যে, আমার ভালোর জন্য আমাকে এত বেশি উত্ত্যক্ত করছে যা আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তার তদ্বির তদারকি আমি আর মোটেই বরদাস্ত করতে পারছি না। তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবে কি বন্ধু। আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, তাকে না বলে, লুকিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। তারপর মূল ভূখণ্ডে গিয়ে পাহাড়ে সারাটা দিন কাটিয়ে আসি।
