রাত যত বাড়তে লাগল তিনি স্বপ্নের ঘোরে ততই তলিয়ে যেতে লাগলেন। আমার ঠাট্টা তামাশা তার এ স্বপ্নালু অবস্থাটাকে দূর করে তাকে কিছুতেই স্বাভাবিক করে তুলতে পারল না।
আমি গোড়াতে মনস্থ করেছিলাম রাতটা বন্ধুর এ কুটিরেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু তার কাণ্ডকারখানা দেখে ভাবলাম, এখান থেকে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমি বিদায় নেবার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি আমাকে থাকার জন্য অনুরোধ করলেন না। তবে দরজা খুলে পা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে হঠাৎ আমার হাত দুটো চেপে ধরে বার কয়েক ছোট্ট করে ঝাঁকুনি দিলেন।
পরবর্তী এক মাসের মধ্যে বন্ধু লিগ্র্যান্ডের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। প্রায় এক মাস পর তার নিগ্রো সহকারী জুপিটার আমার কাছে এলো। বিন্ন মুখে আমার সামনে দাঁড়াল। সত্যি বলছি, এর আগে তাকে কোনোদিনই এমন বিমর্ষ দেখিনি।
তার বিষণ্ণতা ও নীরবতায় আমার বুকের ভেতরে ধড়াম করে উঠল। ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল এই ভেবে যে, বন্ধু লিগ্র্যান্ড বুঝি বড় রকম কোনো বিপদে জড়িয়ে পড়েছে।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বললাম–‘ব্যাপার কী, বল তো জুপিটার’? তোমার মনিবের খবর কী? কেমন আছেন তিনি?’
সে বিষণ্ণ কণ্ঠে জবাব দিলেন–‘হুজুর, সত্যি কথা বলতে কি, তার অবস্থা তেমন ভালো নয়।
‘সে কী! ভালো নয়। কথাটা কানে যেতেই আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা অবর্ণনীয় ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। তার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করলাম–‘ভালো নয়? ভালো নয় বলতে তুমি কী বলতে চাইছ?’
‘সে কথাই তো আপনাকে বলার জন্য ছুটে এসেছি হুজুর।
‘কিন্তু খোলসা করে বলছও না তো কিছু।
‘হুজুর, সেটাই তো কথা; আসলে তিনিই যে খোলসা করে কিছুই বললেন না।
‘তবু তুমি কী বুঝলে?
‘সত্যি কথা বলতে কি, আমি তার অবস্থা দেখে নিশ্চিত কোনো ধারণা করতে পারিনি। তবে এটুকু অন্তত আপনাকে বলতে পারি, তিনি গুরুতর অসুস্থ।
‘অসুস্থ! তিনি কী খুবই অসুস্থ জুপিটার?
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।’
‘তুমি এতক্ষণ এ কথা না বলে চেপে ছিলে কেন?
জুপিটার বিষণ্ণমুখে আমার দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলটা মেঝেতে ঘষতে লাগল।
আমি কণ্ঠস্বরে যারপরনাই উকণ্ঠা প্রকাশ করে এবার বললাম–আচ্ছা জুপিটার, সত্যি করে বল তো, তিনি কী একেবারে শয্যাশায়ী?
‘না, হুজুর। শয্যাশায়ী বলতে পারব না। আর তাকে দেখে তো কিছুই বোঝার উপায় নেই। আসলে তিনি যে মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলেনই না। আর বিপদ তো এখানেই। বেচারার কথা ভেবে আমার মনটা সব সময় বিষিয়েই থাকে হুজুর।’
আমি প্রায় ধমকের স্বরেই বললাম–‘জুপিটার, ধানাই পানাই রেখে যা বলবার খোলসা করে বল। তুমি বার বারই বলছ, আমার বন্ধু গুরুতর অসুস্থ। কিন্তু তার কি অসুখ–কি অসুবিধা একবারও কী বলেননি? এও কি কখনও হতে পারে।
‘হুজুর, এজন্যই তো আমি পাগল হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছি। তার যে কি হয়েছে বার বার জিজ্ঞেস করেও তার মুখ থেকে কিছু বের করতে পারা যায়নি।
‘তিনি কেমন হাবভাব, মানে আচরণে কী লক্ষ্য করা যায়, বল তো?’
‘হুজুর, একটা কথা আপনিই বলুন তো, তার যদি কিছু না-ই হয়ে থাকে তবে তিনি সব সময় হন্যে হয়ে কিছু খুঁজে বেড়ান কেন?’
‘খুঁজে বেড়ান? কী খোঁজেন, বুঝতে পারনি?
‘দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুপিটার বলল–বুঝতে পারলে তো ব্যাপারটা কিনারা করাই যেত। আসল সমস্যাটা তো এ জায়গাতেই। সব সময় পাগলের মতো কি খোঁজেন আর বাকি সময় মুখ গোমড়া করে, মাথানিচু করে বসে থাকেন। আর কেনই বা তার শরীর, বিশেষ করে মুখটা চকের মতো সাদাটে হয়ে যাচ্ছে? আরও আছে,
আমি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলাম–‘আরও আছে?’ কী? আর কোন অদ্ভুত লক্ষণ তার মধ্যে লক্ষ্য করেছ জুপিটার?
‘কত আর বলব হুজুর!’ অধিকাংশ সময়ই একটা বক-যন্ত্র হাতে নিয়ে অদ্ভুত সব কাণ্ড
কী? কী হাতে নিয়ে?
‘বকযন্ত্র। একটা বকযন্ত্র স্লেটের মূর্তিগুলোর ওপর ধরে কি যেন করতে চান।
‘বকযন্ত্র? সেল্টের মূর্তি? এ কী আশ্চর্য–’
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে এবার বলল–এসব কাণ্ড দেখেই তো আমি অবাক হচ্ছি। বিশ্বাস করুন হুজুর, এমন অদ্ভুত অদ্ভুত মূর্তি যে তিনি কোত্থেকে জোগাড় করেছেন–যা আমার চোদ্দ পুরুষও চোখে দেখেনি।
মুহূর্তের জন্য নীরব হয়ে একটু দম নিয়ে সে আবার মুখ খুলল–‘হুজুর, আমি বলছি, তিনি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবেন। আমি তো প্রতিটা মুহূর্ত তাকে চোখে চোখে রাখি। একটা সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেই না।’
‘হ্যাঁ, যা শুনছি তাতে তো ব্যাপারটা খুবই দুশ্চিন্তার–গোলমেলে বলেই মনে হচ্ছে।’
‘হুজুর, একজন বয়স্ক পুরুষ মানুষ কতক্ষণ আর চোখে চোখে রাখা যায়, আপনিই বলুন? এই তো আজই, আমার চোখে ধুলো দিয়ে সারাটা দিন কোথায় যেন কাটিয়ে এলেন।
আমি চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম–সে তো নিশ্চয়ই। তুমিই বা একা কতক্ষণ তাকে আগলে রাখবে। তোমারও তো বয়স হয়েছে বুড়ো হয়েছ।
‘বিশ্বাস করুন হুজুর, আজ আর আমি মাথা ঠিক রাখতে, নিজেকে সামাল দিতে পারিনি। সারাদিন পর তিনি বাড়ি ফিরে এলে আমার মাথায় যেন খুন চেপে গিয়েছিল। নিজেকে সামাল দিতে না পেরে একটা লাঠি নিয়ে তার দিকে তেড়ে গিয়েছিলাম। এবার সে হতাশার স্বরে বলল–‘না, পারলাম না। চোখ-মুখ কাচুমাচু করে এমন অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন যে, মুহূর্তে আমি একেবারে মিইয়ে গেলাম।
