আমি হাতের কাগজটার গায়ে আঁকা রেখাচিত্রটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বললাম–‘মি. লিগ্র্যান্ড, এটা যে নিসন্দেহে একটা অদ্ভুত প্রজাতির ঝি ঝি পোকা এ বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহের অবকাশও নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, এরকম একটা পোকা এই প্রথম দেখলাম। এর আগে কোথাও কোনোদিন দেখা তো দূরের কথা শুনিও নি কারো মুখে।
আমি বললাম–‘ছবির রেখাচিত্রটা যদি করোটি বা মরার মাথার খুলি হয়ে থাকে তবে আমার আর কিছু বলার নেই, আলাদা কথা বটে। এছাড়া এ বস্তুটা আমার দেখা যে কোনো জিনিস অপেক্ষা অবিকল ওই দুটো বস্তুরই মতো। তা ছাড়া আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বন্ধুবর লিগ্র্যান্ড সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন–‘া, আপনার অনুমান অভ্রান্তই বটে-মড়ার মাথা। অন্তত কাগজের রেখাচিত্রটা দেখে এরকম ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক।
‘হ্যাঁ, আমিও তা-ই তো ভাবছি।
‘ওপরের কালো বিন্দু দেখে দুটো চোখ বলে মনে হচ্ছে, তাই না?
‘আমি তো চোখ বলেই মনে করেছি।’
‘আর নিচের লম্বাটে কালো দাগ দুটোকে অবিকল মুখ বলে মনে হচ্ছে, ঠিক কি?
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।
আর পুরো চিত্রটাকেই ডিম্বাকৃতি দেখাচ্ছে, কী বলেন?
‘অন্তত আমার চোখে তো এরকমই মনে হচ্ছে! কিন্তু মি. লিগ্র্যান্ড, আমি কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি, শিল্পী হিসেবে আপনার দক্ষতা তেমন নেই।’
মি. লিগ্র্যান্ড ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
আমি বলেই চললাম–দেখুন মি. লি এ্যান্ড, ঝি ঝি, পোকাটার আকৃতি সম্বন্ধে ধারণা করতে হলে সবার আগে আমার চেষ্টা করে দেখা দরকার।’
তার চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল। কণ্ঠস্বরেও কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন–দেখুন বন্ধু, আমার ঠিক জানা নেই, তবে এটুকু অন্তত বলতে পারি, আমি মোটামুটি আঁকি। ভালো না হলেও মোটামুটি কাজ চালিয়ে নেবার মতো অবশ্যই।
আমি তার কথার কি জবাব দেব ভেবে না পেয়ে মৌন হয়ে থাকাই শ্রেয় জ্ঞান করলাম।
তিনি নিজের কৃতিত্বের কথা বলেই চললেন–একটা কথা কি জানেন, আমি একাধিক শিল্প-শিক্ষকের কাছে তালিম নিয়েছিলাম আর আমার নিজের সম্বন্ধে ধারণাটুকুও অবশ্যই আছে। ছাত্র হিসেবে আমি নেহাৎ খারাপও ছিলাম না।
‘বন্ধু লিগ্র্যান্ড, তবে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি আমার সঙ্গে রসিকথায় লিপ্ত হয়েছেন। আমি কিন্তু আবারও বলব, এটাকে অনায়াসেই একটা মড়ার মাথা বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শারীরবিদ্যার সাধারণ ধারণার ওপর নির্ভর করে বলতেই হয়, মাথার খুলি হিসেবে বিচার করলে চিত্রটা খুবই ভালো আঁকা হয়েছে।
তিনি নীরবে বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে মুচকি হাসলেন।
আমি বক্তব্য অব্যাহত রাখলাম–একটা কথা, আপনার সংগৃহীত ঝিঁঝি পোকাটা যদি দেখতে অবিকল এ ছবিটার মতো হয়, তবে স্বীকার করতেই হবে, ওটা পৃথিবীর আশ্চৰ্যতম ঝি ঝি পোকা। একটা জিনিস কিন্তু ছবিটাতে অনুপস্থিত দেখছি।’
মি. লিগ্র্যান্ড অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠলেন–‘কী? কীসের কথা বলছেন?
‘শুঁয়া–আপনি যে স্ট্রয়ার কথা বললেন তা তো ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন–‘শুঁয়া! শুঁয়ার কথা বলছেন?
আমি কিন্তু খুব ভালোই জানি, শুঁয়াগুলোকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন মূল পতঙ্গটার গায়ে, ঠিক যেমন আছে আমি তো অবিকল সেভাবেই এঁকেছি। আমি আবারও বলব, আমার বিশ্বাস, আমি সবকিছুই স্পষ্ট এঁকেছি।
‘বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! আপনি হয়তো বা ঠিকঠাকই এঁকেছেন, তবু সেগুলো আমার নজরে ধরা পড়ছে না। হয়তো বা আমার দেখারই ভুল।
আমি আর একটা কথাও না বলে হাতের কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাটা যে দিকে বাঁক নিল, তাতে আমার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। তার বিরূপ ভাবভঙ্গি আমার মধ্যে বিস্ময়ের সঞ্চার করল। সত্যি কথা বলতে কি, ঝি ঝি পোকার ছবিটা সম্বন্ধে যদি বলতেই হয় তবে আমি এ কথা অবশ্যই বলব, ছবিটাতে সত্যি সত্যি কোনো শুঁয়াই দেখানো হয়নি। আর যে বস্তুটার সঙ্গে ছবিটার হুবহু মিল রয়েছে, সেটা হচ্ছে মড়ার খুলি।
আমার নজর এড়াল না, বন্ধু লিগ্র্যান্ড আমার হাত থেকে কাগজটা ফিরিয়ে নেওয়ার সময় মুখটাকে যারপরনাই বিকৃত করেছিল। তারপর হাতের মুঠোর মধ্যে দলা পাকিয়ে জ্বলন্ত চুলিটার মধ্যে ফেলার জন্য তৎপর হলেন। কিন্তু কার্যত তা করলেন না। আসলে ছবিটার দিকে চোখ পড়তেই সেটার ওপরেই তার মনোযোগ সম্পূর্ণরূপে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল।
আমি আচমকা তার মুখের দিকে চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলাম, মুখটা অস্বাভাবিক লাল হয়ে গেছে। পর মুহূর্তেই সেটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে চেয়ারটায় বসেই তিনি হাতে ছবিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেকক্ষণ ভরে দেখলেন। তারপর মোমবাতিটাকে কাছে নিয়ে এসে আরও ভালোভাবে, অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে সেটা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
তার রকম সকম দেখে খুবই অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু রেগে মেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যাবার আশঙ্কায় টু শব্দটিও করলাম না।
মি. লিগ্র্যান্ড এবার কোটের পকেট থেকে একটা থলে বের করে হাতের দলা পাকানো কাগজটাকে তার ভেতরে চালান দিয়ে দিলেন। তারপর থলেটাকে টেবিলের দেরাজের মধ্যে ঢুকিয়ে তালাবন্ধ করে দিলেন।
এবার দেখা গেল, তার মেজাজ অনেকটা নরম হয়ে এসেছে। কিন্তু একটু আগেও তার মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখেছিলাম, তা একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
