আমার বন্ধুবর গৃহকর্তা লিগ্র্যান্ডের বুক জুড়ে তখন উৎসাহের তুফান বয়ে চলেছে। এ ছাড়া অন্য কোনো ভাষাতেই বা তার তখনকার মানসিক অবস্থার বর্ণনা দেওয়া যাবে। অজানা-অচেনা দ্বীপে বেড়াতে বেড়িয়ে তিনি নতুন প্রজাতির ঝিনুক পেয়েছেন; আর ধরতে পেরেছেন জুপিটারের সাহায্য সহযোগিতায় এমন একটা নতুন ধরনের ঝিঁঝি পোকা যেটাকে পরদিন সকালে উৎসাহের সঙ্গে আমাকে দেখিয়ে আমার অভিমত জানতে চেয়েছেন। সকাল হলে সেটাকে দেখাবার পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিলেন।
আমি তার কথা শুনে চুল্লির আগুনের ওপর হাত দুটোকে ঘষতে ঘষতে মুচকি হেসে বললাম–কাল সকালে? সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার কী? এখনই– আজ রাতেই বা নয় কেন, জানতে পারি কী?
আমি ঠোঁটের হাসিটুকু অব্যাহত রেখেই ছোট্ট করে বললাম–‘তাই বুঝি? তবে আর
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বন্ধু আক্ষেপসূচক শব্দ উচ্চারণ করে বললেন ‘আহা! রাত না পোহালেও সকাল হবার আগে তো সেটাকে দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এক কাজ করুন, আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে দিন। সকালে জুপিটারকে পাঠিয়ে লেফটেন্যান্ট জে-র কাছ থেকে পোকাটা আনাব। তাই বলছি, কাল সকালের আগে পোকাটা আপনাকে দেখানো সম্ভব হবে না। আরে ভাই, একটা মাত্র তো রাতের ব্যাপার, আজ রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিন। সূর্য উঠলেই জুপিটারকে পাঠিয়ে দেব, এক দৌড়ে গিয়ে সেটা নিয়ে আসবে। উফ্! কী সুন্দর যে পোকাটা ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। এমন সুন্দর পোকা এর আগে চোখে পড়েনি।
‘কী? কি বললেন? সূর্যোদয় হলে–‘
‘হ্যাঁ, ভোর হলেই। পোকাটার সৌন্দর্য যে কী মনোলোভা, চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না। ঝকমকে সোনালি তার রঙ আকার বড় একটা বাদামের মতো। আর পিঠের এক কোণায় গাঢ় কালো ফোঁটা; আর অন্য ধারে লম্বাটে একটা দাগ। সব মিলে যে কী দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে, তা আর বলার নয়। আর তার শুঁয়া। দুটো তো রীতিমত
জুপিটার তাকে আর অগ্রসর হতে না দিয়ে বলে উঠল–‘হুজুর, আপনাকে তো বহুবারই বলেছি, ওটা সোনার ঝি ঝি পোকা, আরনির্ঘাৎ সেনার ঝি ঝি পোকা-নিরেট সোনার, ভেতর-বাইরে সবটাই সোনা। সত্যি বলছি, এমন ভারি ঝি ঝি পোকা আমি জীবনে আর কোনোদিনই দেখিনি। দেখলে চোখ ট্যারা হয়ে যায়।
আমি ঠোঁট টিপে হাসতে হাসতে বললাম–‘সোনা?নিরেট খাঁটি সোনা?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তা-ই।
বন্ধু লিগ্রান্ড প্রায় ধমকের স্বরে বলল–‘ভালো ভালো, তা যা-ই হোক, দেখুন ‘দেখুন ভাই, সত্যি কথা বলতে কি, পাকাটার রঙ এমন ঝকমকে যে, জুপিটার যে
ওটাকে সোনার তৈরি মনে করছে তা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়।
‘তাই বুঝি?
‘তবে আর বলছি কি ভাই। পোকাটার গা থেকে এমন অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল তার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল কোনো ধাতব আলোকচ্ছটা কেবলমাত্র আমিই নই, আপনিও আগে কোনোদিন দেখেননি, আমি হলফ করে জোর গলায় বলতে পারি।’
আমি কি বলব ভেবে না পেয়ে নীরবে তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
লিগ্র্যান্ড এবার হতাশার স্বরে বলে চললেন–‘কিন্তু ভাই, ভোর হবার আগে তো আপনাকে সেটা দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। আর আপনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে আপাতত ওই পোকাটার আকৃতি সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ ধারণা আপনাকে দেওয়া যেতে পারে। এতেও আপনার মন কিছুটা অন্তত ভরতে পারবে।
কথাটা বলতে তিনি দু-পা সরে গিয়ে ছোট টেবিলটার কাছে গেলেন। চেয়ার টেনে বসলেন। টেবিলের ওপর কালি-কলম রয়েছে, কিন্তু কাগজ নেই। ড্রায়ারটা খুলে দেখলেন, সেখানেও কাগজ পেলেন না। শেষপর্যন্ত তিনি জ্যাকেটের পকেটে হাত বুলিয়ে নিয়ে বললেন–ঠিক আছে, এতেই কাজ মিটে যাবে।’
কথাটা বলেই তিনি জ্যাকেটের পকেটে হাত চালিয়ে দিয়ে এক চিলতে নোংরা ভাঁজ করা কাগজ বের করে আনলেন। এবার কাগজটার ভাঁজ খুলে টেবিলে পেতে তার গায়ে কল দিয়ে একটা রেখাচিত্র আঁকলেন।
আমি তীব্র শীতের জন্য তখনও জ্বলন্ত চুল্লিটার পাশেই বসে রইলাম। সেখান থেকেই আগ্রহের সঙ্গে কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম। রেখাচিত্রটা আঁকা শেষ হলে তিনি চেয়ারে বসে থেকেই আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এগিয়ে দিলেন।
আমিও তাঁর দিকে সাধ্যমত ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিতেই তীব্র একটা গর্জন কানে এলো। অবিশ্বাস্য রকম তীব্র সে গর্জনটা কানে যেতেই ভয়ে আমার বুকের ভেতরে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল।
পর মুহূর্তেই ঘরের বন্ধ-দরজাটার গায়ে কর্কশ মচ্ মচ শব্দ হতে লাগল। মনে হলো তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে কেউ দরজার পাল্লার গায়ে ক্রমাগত আঁচড় কেটে চলেছে। ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় এলো না নিগ্রো জুপিটার দরজা খুলে দিতেই চোখের পলকে আতঙ্ক উবে গেল। দেখলাম, বন্ধু লিগ্র্যান্ডের চেহারাধারীনিউসাউন্ড ল্যান্ড কুকুরটা সবেগে ছুটে আমার কাছে এলো। এক লাফে আমার কাঁধে উঠে উন্মাদের মতো আমার মুখে মাথায় বার বার মুখ ঠেকিয়ে আদর জানাতে লাগল।
ইতিপূর্বে যতদিনই আমি এ বাড়িতে এসেছি ততবারই কুকুরটাকে খুব করে আদর করেছি।
দীর্ঘ সময় ধরে কুকুরটা আমার গায়ে-মাথায় মুখ ঘষে আদর আপ্যায়ন সারায়– আমি হাতের কাগজটার দিকে মন দেওয়ার সুযোগ পেলাম।
কাগজটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়েই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সে যে রেখাচিত্রটা এঁকেছে সেটা বিস্ময় উৎপাদন করার মতোই বটে।
