আরও আছে। দূর্গ, ভাঙাচোরা পুরনো বাড়ি আর তালগাছের, সারি ছাড়া এ ছাড়া দ্বীপটায় আর যা-কিছু নজরে পড়ে তা হচ্ছে, সম্পূর্ণ দ্বীপটাই জুড়ে রয়েছে মার্টন ফুলের ঝোঁপঝাড়ে ভর্তি। এ মনোলোভা ফুল ইংল্যাণ্ডের ফুল-চাষীদের কাছে খুব প্রিয়। এগুলো পনেরো-ডবশ ফুট লম্বা গাছের ঝোঁপ। আর কিছুদিনের মধ্যেই এমন গভীর জঙ্গলে পরিণত হয়ে যায় যে, কারো পক্ষে সেখানে ঢোকা সম্ভব নয়। তবে এ ফুলের উগ্র গন্ধ বাতাস-বাহিত হয়ে দ্বীপময় জড়িয়ে পড়ে এক মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মি. লিগ্র্যান্ডের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় একেবারেই আকস্মিকভাবে। আমাদের মধ্যে যখন পরিচয় তখন তিনি মুলিভান দ্বীপেরই পূর্বপ্রান্তে ছোট এক কুড়েঘর তৈরি করে কোনোরকমে দিন গুজরান করছেন।
আমাদের প্রথম পরিচয় ক্রমে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তারপর সে বন্ধুত্ব দ্রুত গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন? এর কারণ অবশ্যই ছিল। দ্বীপবাসী লোকটার মধ্যে এমনকিছু আকর্ষণীয় ছিল, যা আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে তার প্রতি শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে তোলে আর যারপরনাই আগ্রহান্বিত হয়ে পড়ি।
প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম, লোকটা খুবই শিক্ষিত, মানসিক দৃঢ়তাও অতুলনীয়। কিন্তু তার মানসিক দৃঢ়তার একটা বিশেষত্ব অবশ্যই ছিল। বিশেষত্বটা কি? মানুষের প্রতি চরম বিদ্বেষ। তাকে কখনও দেখা উৎসাহ-উদ্দীপনার। ভরপুর আবার পরমুহূর্তেই দেখা গেছে তিনি যেন এক বিষণ্ণতার প্রতিমূর্তি।
মি. লি গ্র্যান্ডের কুড়ে ঘরে অনেক পুঁথি-পুস্তক ছিল। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, তিনি খুব কমই সেগুলোর পাতায় চোখ বুলাতেন।
তার বিনোদনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ছিল মাছ ধরা আর শিকারের মধ্যে নিজেকে লিপ্ত রাখা। আর তা নইলে সমুদ্র সৈকতের লাগোয়া মার্টল ফুলের ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কীটপতঙ্গের পিছন-পিছন ছুটে বেড়ানো বা ঝিনুকের খোঁজ করে মহানন্দে সময় কাটানোতেই ছিল তার মনের মতো বিনোদন। তার কীটপতঙ্গের নমুনা-সংগ্রহটা বাস্তবিকই অবাক হয়ে দেখার মতোই বটে। এসব অভিযানে তার সঙ্গি হিসেবে সারাক্ষণ পাশে পাশে থাকত এক বুড়ো নিগ্রো। নাম তার জুপিটার।
জুপিটার এক সময় ক্রীতদাস ছিল। দুর্বিষহ জীবন যাপন করত।
মি. লিগ্র্যান্ড পরিবারের দুঃসময় দেখা দেওয়ার আগেই জুপিটারকে ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। যুবক মাসা উইলের পথ অনুসরণ করাকে সে কর্তব্য বলে মনে করত। আর এটাকে সে তার অধিকার বলেও মনে প্রাণে বিশ্বাস করত। কোনো লোভ বা ভয়-ভীতিই তাকে নিজের অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি।
আবার এমন হওয়াও কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয় যে, লোকটাকে সহজ সরল বোকা হাঁদা পেয়ে মি. লিগ্র্যান্ডের আত্মীয়স্বজনরাই এ বিশ্বাসটুকু দৃঢ়ভাবে তার বুকে গেঁথে দিয়েছে, যাতে এ ছন্নছাড়া যুবকটার দেখভালে নিজেকে লিপ্ত রাখে।
মুলিভান দ্বীপটাকে চারদিক থেকে উত্তাপ-উদ্দাম সমুদ্র ঘিরে থাকায় এখানে শীত কোনোদিনই জাঁকিয়ে পড়তে পারে না। বছরের শেষের দিনগুলোতেও খুব কম দিনই ঘরে আগুন জ্বালাবার দরকার হয়। তবে আঠার-র অক্টোবরের মাঝামাঝি একদিন শীত রীতিমত জাঁকিয়ে পড়ল।
আমি সূর্যপাটে বসার ঠিক আগে সবুজ গাছগাছালির ভেতরের এক-পেয়ে রাস্তা ধরে লম্বা-লম্বা পায়ে হেঁটে আমি কোনোরকম বন্ধু লিগ্র্যান্ডের কুড়েঘরের দরজায় হাজির হতে পারলাম।
দীর্ঘ সপ্তাহ কয়েক বন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা নেই। এর কারণ, ছিল বটে। তখন আমি চার্লসটন শহরে। মুলিভান দ্বীপ থেকে নয় মাইল দূরে ছিল, মুলিভন শহরের দূরত্ব বেশি নয়, মাত্র ন’ মাইল। কিন্তু তখনকার দিনে সেখান থেকে দ্বীপে যাতায়াতের ব্যবস্থা এখনকার মতো ভালো ছিল না।
বন্ধুবর লিগ্র্যান্ডের কুড়েঘরের দরজায় পৌঁছে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ।
অভ্যাস মতো দরজায় বার-কয়েক টোকা দিলাম। না, দরজা খোলার কোনো লক্ষণ দেখতে পেলাম না, আমার ভুল ভেঙে গেল, দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করা নয়, ঘরের ভেতরে কেউ নেই। এরকম নিঃসন্দেহ হয়ে গোপন স্থানটা থেকে হাতড়ে হাতড়ে চাবিটা বের করে আনলাম। দরজাটা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলাম।
ঘরে ঢুকে দেখলাম, চুল্লিটিতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ঘটনাটা অদ্ভুতই বটে। কিন্তু সে দিনটার কথা বিচার করলে স্বীকার করতেই হবে, চুল্লিতে আগুন জ্বেলে রাখার ব্যবস্থাটা অবশ্যই সঙ্গত ছিল। ঘরে ঢুকে আমি গা থেকে ওভারকোটটা খুলে ফেললাম। এবার চেয়ারটাকে টানতে টানতে জ্বলন্ত চুল্লিটার কাছে নিয়ে জুত করে বসলাম। আমেজ করে আগুন পোহাতে পোহাতে বাড়ির মালিকের ফিরে-আসার জন্য ধৈৰ্য্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কনকনে ঠাণ্ডা থেকে ঘরে ঢুকেই জ্বলন্ত চুল্লিটা পেয়ে যাওয়াতে নিজেকে ভাগ্যবান না ভেবে পারলাম না।
রাতের অন্ধকার নেমে আসার একটু পরেই মি. লিগ্র্যান্ড তার অনুগত ভৃত্য জুপিটারকে নিয়ে ঘরে নিয়ে এলেন। দরজায় পৌঁছেই আমাকে ঘরের ভেতরে দেখেই তিনি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে আমাকে স্বাগত জানালেন।
জুপিটার দাঁতের পাটি বের করে হাসতে হাসতে রাতের খাবার রান্না করতে চলে গেল। সে ব্যস্ত হাতে মুরগির মাংস রান্না করতে লাগল।
