যেসব সমালোচনা পত্র-পত্রিকার পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়, সেগুলোকে যদি নির্ভেজাল সত্য বলে ধরে নেই, তবে তো স্বীকার না করে উপায় নেই যে, আমেরিকানদের মতো হিংসা করার উপযুক্ত জাত পৃথিবীর কোনো দেশেই নেই।
আমাদের দেশের আকাশে-বাতাসে সর্বত্র প্রতিভাবান ব্যক্তিরা ধুকপুক করছেন, আমেরিকানরা সে বাতাসে শ্বাসকার্য চালিয়ে হাইফাই করছে। আমরা সর্বশ্রেষ্ঠের ঝোলায় নিজেদের আবৃত করে রেখেছি।
আমাদের কবিদের মধ্যে সবাই মিলটন আর আমাদের সব লেখকই ক্রিকটন বা তাঁর প্রেতাত্মা।
স্বীকার করছি, নিজেদের কাণ্ডকারখানা নিয়ে এমন করে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করাটা মোটেই সঙ্গত হচ্ছে না। গ্যাস খেয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠাটা কিন্তু আনন্দ ফুর্তির ব্যাপার নয়। তাতে গায়ে জ্বালা ধরে যায়। এ অভ্যাসটা যে নিন্দনীয় এতে কিছুমাত্রও আশ্চর্যের নয়। বর্তমানে এটা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের মনেও চাঙা হয়ে উঠছে। তারা এটাকে মোটেইনিন্দনীয় মনে করছে না বলেই এমন কাজে মেতে উঠতে দ্বিধা করছে না।
যাক, অনেক প্যাচালই তো পাড়া হলো। এবার না হয় ওসব প্রসঙ্গ ধামা চাপা দিয়ে আবার মি. উইলমারের প্রসঙ্গে ফিরে আসছি।
আমি তো আগেই বলে রেখেছি, ব্যঙ্গাত্মক এ কবিতায় ত্রুটি অনেকই আছে। তবে আগে যা-কিছু বলেছি তার সঙ্গে এখন নতুন কিছু তথ্য যোগ করছি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, মি. উইলমারের লেখা বইয়ের নামটা আরও স্পষ্ট কোনো নাম ব্যবহার করা দরকার ছিল। কিন্তু যে নামটা ব্যবহার করা হয়েছে তাতে চলে যাবে।
আমেরিকান আনাড়িদের নিয়েই কেবল খুশিতে মশগুল হয়ে থাকেনি, সময়মত তাদের কুপোকাত করতেও ছাড়েনি।
শেষ দুটো ছত্র, শেষের বক্তব্যকে সুদৃঢ় না করে বরং দুর্বলই করেছে।
সত্যি কথা বলতে কি, যদি এ ছত্র দুটো লেখা না হত তবে বক্তব্য কিন্তু খুবই দৃঢ়–জোরদারই হত।
মি. উইলমার অন্যের কবিতা অনুকরণ করতে গিয়েও সর্বনাশের চূড়ান্ত করে ছেড়েছেন। তিনি যেভাবে অস্ত্রোপচার করেছেন তাতে মনে হবে যেন সমালোচক তার বগলদাবায় ধরা রয়েছেন। আসলেও কি তা-ই?
তবে কথাটা কিন্তু মিথ্যা নয়, বিচার-বিবেচনা বোধহীনের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। তবে আমাদের মাথায় তো কিছু না কিছু ঘিলু তো অবশ্যই আছে, মাথায় গোবর পোরা তো আর নয় যে, কাণ্ডজ্ঞান একেবারে হারিয়ে বসেছি। আবার মি. উইলমারের কবিতায় যে ভাব প্রকাশ পেয়েছে–সত্যিকারের শয়তানও নই।
একটা কথা মনে রাখতে হবে, সভ্যদেশে অসভ্যের মতো হাত-পা ছোঁড়া অবশ্যই সঙ্গত নয়।
মি. মরিম-এর কথা যদি আলোচনা করা যায় তবে স্বীকার করতেই হবে, তিনি ভালোই গান লিখেছেন।
আবার মি. ব্রায়ান সম্পর্কে বলতে গেলে একটা কথা অবশ্যই বলা দরকার তিনি নির্বোধ নন–আহাম্মকের শিরোমণি। তাকে অবশ্যই বলা যাবে না।
মি, উইলিসকে একটা নিরেট আহাম্মক মনে করা যেতে পারে। আর মি. লঙলেখো? তিনি চুরিবিদ্যাটা খুব ভালোই রপ্ত করেছেন। চুরি না করে তার পক্ষে থাকা। কিছুতেই সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা, চুরিটুরির কথা তো আমরা আগেই বহুবার, বহুভাবেই শুনেছি।
মি. উইলমারের কাজের বিচার করতে বসে একটা কথা অবশ্যই বলা যেতে পারে, তিনি বেশ কয়েক স্থানে মাত্রাজ্ঞান জলাঞ্জলি দিয়েছেন। বিভেদরেখা সম্বন্ধে হিসাব তাঁর ছিল না বলেই অবলীলাক্রমে সেটা অতিক্রম করে ফেলেছেন। তিনি কলমকে এমনভাবে বেঁকিয়ে ধরেছিলেন যার ফলে সহজ-সরল আর একেবারে স্পষ্ট ছবিটাও বিকৃত হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে আর যাই হোক না কেন, তাঁর ধীশক্তি, তাঁর সাহসিকতা, তার স্পষ্ট কথা খোলাখুলিভাবে বলার প্রবণতা, তর পরও বর্তমান কাব্যগ্রন্থের নিখুঁত ছক-পরিকল্পনার জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করা যেতে পারে। আর এ প্রশংসা পাবার অবশ্যই তিনি যোগ্য।
দ্য গোল্ড-বাগ
মি. উইলিয়াম লিগ্র্যান্ড!
প্রাচীন হুগেনট বংশোদ্ভুত একদল বিত্তশালী পুরুষ। এক সময় তিনি অগাধ ধন সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে সবকিছু খুঁইয়ে অর্থাভাবের মধ্য দিয়ে তাকে দিনাতিপাত করতে হয়।
বেশ কয়েক বছর আগে মি. লিগ্র্যান্ডের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তারপর ক্রমে তার সঙ্গে আমার হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
প্রথম জীবনে তিনি পূর্বপুরুষেরনিউ অর্লিয়েন্স মহলেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। কিন্তু ধনসম্পত্তি খুইয়ে প্রায় নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে পড়ার পর নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে দক্ষিণ কালিফোনিয়ার অন্তর্গত চার্লসটনের অদূরবর্তী সুলিভাস দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই ঘর বেঁধে পাকাপাকিভাবে বসবাস করতে থাকেন।
সুলিভান দ্বীপটা বাস্তবিকই বৈচিত্র্যে ভরপুর। এর দৈর্ঘ্য প্রায় তিন মাইল। আর মাইলের পর মাইল জুড়ে কেবল সমুদ্রের বালি আর বালি। প্রস্থ যেখানে সবচেয়ে বেশি সেটা সিকি মাইলের বেশি নয়।
মূল ভূখণ্ড আর দ্বীপটার মধ্যে একটা খাড়ি অবস্থান করছে, যেটা পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
বালির রাজ্য দ্বীপটার এখানে-ওখানে গুটি কয়েক ছোট ছোট ঝোঁপঝাড় ছাড়া আর কিছুই নেই। দ্বীপটায় দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকালে যতদূর দৃষ্টি চলে বড়সড় কোনো গাছের চিহ্নও নজরে পড়ে না।
দ্বীপটার পশ্চিম দিকের একেবারে শেষ প্রান্তে মূল দূর্গটি অবস্থিত। দূর্গটাকে ঘিরে রেখেছে বহু পুরনো প্রায় ধসে-পড়া কয়েকটা বাড়ি। ধূলোবালি আর জ্বরাজরির ভয়ে চার্লসটন শহর ছেড়ে পালিয়ে এসে কিছু লোক গরমকালে এসব ভাঙাচোরা বাড়ি ভাড়া নিয়ে মাথা গুঁজে কোনোরকমে দিন গুজরান করে। আর বেঁটেখাট কিছু তালগাছও এ অঞ্চলটায় দেখা যায়।
