যেসব প্রতিভাবান সাহিত্য সেবী ও সাহিত্য জীবিরা গোষ্ঠী-ষড়যন্ত্রের খপ্পরে পড়ে কোরবাণির পশুর মতো জবাই হচ্ছেন তাঁরা ওই সতোর লড়াইয়ের ফলে যে উপকৃত হবেনই, সন্দেহ নেই।
এসব প্রতিভাবান সাহিত্যিকরা ভুগছেন কেন? এর কারণ একটাই, এরা গোষ্ঠীর নেতাদের সঙ্গে হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে না চলার জন্য যদি তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ-ওঠাবসা করতেন, তাদের মেজাজ মর্জির মূল্য দিয়ে চলতেন তবে মত্তকা যে অবশ্যই লুটতে পারতেন এতে আর সন্দেহ কি?
তবে আর বেশি দূরে নয়, অচিরেই এমন একদিন আসবেই আসবে, যেদিন প্রতিভাবান সাহিত্যসেবী আর সাহিত্যজীবিদের মতামতকে সবার ওপরে স্থান দেওয়া হবে। আর তাদের সে মতামত কলমের জোরেই নিজের স্থান করে নেবে, ভাওতাবাজীর মাধ্যমে অবশ্যই নয়। সম্প্রতিকালেই সে প্রমাণ কম-বেশি পাওয়া যাচ্ছে। অতএব সে শুভ মুহূর্তকে স্বাগত জানাবার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সদ্য প্রকাশিত বইয়ের মামুলি সমালোচনা সমৃদ্ধ বিজ্ঞপ্তি দেখে না হেসে পারা যায় না। এর চেয়ে বেশি হাসির খোরাক অন্য কিছুর মাধ্যমে মিলবে কি? আমি তো বলব, অবশ্যই না।
যিনি সামান্যতমও প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেননি, আবার সামন্যতম বিদ্যা-বুদ্ধিও নেই, ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো তার মস্তিষ্কও তেমন প্রখর নয়, আর সময়ের অভাব যাকে সর্বদা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে, এরকম একজন সম্পাদক জগতের কাছে নিজেকে অক্লেশে জাহির করতে আগ্রহী এভাবে যে, তিনি নাকি প্রতিদিন কাড়িকাড়ি সদ্য প্রকাশিত বইপত্র পড়াশোনা করছেন আসলে যাদের দশভাগের একভাগ টাইটেল পেজও তিনি পড়া তো দূরের ব্যাপার, পাতা উলটে পর্যন্ত দেখেননি, যে সবের চার ভাগের তিন ভাগের বিষয়বস্তু তার কাছে হিরু লেখা পড়ার মতোই দুর্বোধ্য, আর যাদের পুরো আয়তন মাসে দশ বা বড় জোর বারোজন পাঠক পাঠিকা চোখে দেখর সৌভাগ্য লাভ করেন।
তিনি কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবটা পূরণ করে নেন, বলতে পারেন? বলছি শুনুন, হীনভাবে অনুগত থেকেই সেটা পূরণ করে নেন। আর সময়ের টানাটানিটা? গরম মেজাজ দেখিয়ে সেটা পূরণ করেন।
পৃথিবীতে যেসব মানুষকে সবচেয়ে সহজে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয়নি, তাদের মাথার ওপরে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছেন।
নোয়া ওয়েবস্টার-এর পঞ্জিকার মতো ইয়ামোটা অভিধান থেকে শুরু করে টম থাম্ব-এর প্রকাশিত সর্বশেষ ডায়মন্ড সংস্করণ পর্যন্ত তর অন্তরের অন্তঃস্থলে পুলকের সঞ্চার ঘটায় আর তিনি পঞ্চমুখে প্রশংসায় মেতে ওঠেন।
কিন্তু তার অসুবিধা বলতে একটাই। কি সেটা? আনন্দে মশগুল হয়ে পড়লেও সে আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে প্রকাশ করার মতো জিহ্বা তার নেই। তাই ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরা ছাড়া অন্য কোন পথই তার সামনে খোলা নেই। তার কাছে প্রত্যেক বই-ই একটা অত্যাশ্চর্য কাণ্ড বিশেষ।
আর বোর্ড-বাঁধাই প্রতিটা বই একটা করে নতুন যুগ হিসেবে গণ্য হয়। আর একারণেই দিন দিন তার কথামালা ফুলেফেঁপে ক্রমে বেড়েই যেতে থাকে।
এতকিছু সত্ত্বেও সাধারণ পাঠক-পাঠিকা এবং বিদেশিরা ঠিক ঠিক তথ্য লাভের প্রত্যাশা নিয়ে হালকা ধরনের সাময়িক পত্রিকায় হাত না দিয়ে ভারি সাময়িক পত্রিকাই হাতে তুলে নেন।
আর ত্রৈমাসিক পত্রিকার অসংলগ্ন যেসব লম্বাচওড়া বক্তিমে ছাপা হয় সে সব যে কতখানি বস্তাপচা তা নিয়ে মিছে কথা বাড়ানোর সামান্যতম ইচ্ছাও আমার নেই। কেবলমাত্র একটা কথাই বলতে চাচ্ছি, প্রবন্ধগুলোর শীর্ষে লেখকের নাম ছাপা হয় না।
এমন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবন্ধগুলোতে লেখকের নাম যখন ছাপা থাকে না তখন সেটা কার লেখা বোঝার উপায় কি? কার নির্দেশেই বা এগুলো লেখা হয়েছে বা হচ্ছে? ব্যক্তিগত আক্রোশ যাদের বুকে জমা রয়েছে বা স্তুতিবাদের মতলবে রচিত এ অপবাদে পূর্ণ বা সুখ্যাতিতে পূর্ণ বিশাল জোরদার ভাষণে নিতান্ত গাধা ছাড়া আর কেউ আস্থা রাখে, নাকি কারো পক্ষে আস্থা রাখা সম্ভব?
এবার বলছি পেশাদার সমালোচকদের কথা–তারা কোনো কাহিনীর ভেতরে ঢোকে না, ঢোকার চেষ্টাও করে না। তারা ওপর ওপর অর্থাৎ মামুলি বক্তব্য লিখতে অভ্যস্থ। সে জন্য তাদের একমাত্র শব্দের ওপরই নির্ভরশীল হতে হয়। শব্দকে বহুভাবে ব্যবহার করে নিজেদের মনের ভাব ব্যক্ত করাই তাদের উদ্দেশ্য।
তাদের নিজস্ব, মৌলিক ধারণার সংখ্যা নিতান্তই কম। খুব বেশি হলেও মাত্র দুটো। তারা সেটুকু গুছিয়ে মনের ভাব ব্যক্ত করতে গিয়ে এলোমেলো করে ফেলেন। আর তারা সোজা কথাকে স্পষ্টভাবে বলা পছন্দ করে না, পারে না। বরং বলা চলে, এ কাজকে তার দুনীর্তি বলেই মনে করেন। আরও আছে, লিখতে বসে নিষ্ঠার সঙ্গে একের পর এক ধাপ অগ্রসর হওয়ার পন্থা এদের জানা নেই। লিখতে আরম্ভ করেই দুমকরে মাঝখানে চলে যান, নইলে পিছন-দরজা দিয়ে গুটিগুটি এগিয়ে যান আর তা যদি না-ও করেন তবে বিষয়বস্তুকে সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরেন।
আর তারা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি আর দক্ষতাকে তুলে ধরতে গেলে জ্ঞানের পাহাড়ের তলায় চাপা পড়ে এমন অসহায়ভাবে কাতড়াতে থাকেন যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথের হদিস পান না।
পাঠক-পাটিকা তাদের লেখা সামনে খুলে বসে, কয়েক পাতা উলটে আদ্যিকালের কায়দা-কৌশল দেখে আতঙ্কে মুষড়ে পড়েন, শেষপর্যন্ত অধৈর্য হয়ে দুম্ করে বইটা বন্ধ করে দিয়ে যেন দম ফেলে বাঁচেন। পাঠক-পাঠিকা বইটা বন্ধ করে যেন দুর্বিষহ যন্ত্রণার হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে গেল, এমন ভাব তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
