একটা কথা স্বীকার না করলে দ্য কোয়ান্স অব হেলিকন কাব্যের প্রতি অবিচারই করা হবে। কথাটা হচ্ছে, মি. উইলমার অন্যের পথ অনুসরণ করলেও তার কাব্যটির মাধ্যমে বহু অপ্রিয় সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বর্তমান সমাজে এ রকম কাজ ক্ষতিকর, লেখকের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর তো অবশ্যই। তাই মি. উইলমার প্রথম সৎসাহস আর যোগ্যতার অধিকারী বলেই তো আমরা তাকে উৎসাহ দান করতে গিয়ে বলব–চালিয়ে যান ভাই, লেগে থাকুন।
আমি আবারও বলছি–একবার নয়, হাজারবারও বলতে পারি, মি. উইলমার তার কাব্যে যা-কিছু বলেছেন তার শতকরা একশো ভাগই সত্যি। আর এই যে বলাম, তার প্রতিবাদ কে-ই বা না করবে, বলুন? আমরা? সাহিত্যজীবিরা?
আর ধ্য?! সাহিত্যজীবিদের চরিত্রে কথা আর না-ই বা বললাম। আমরা প্রত্যেকে এক একজন ধান্দাবাজ। আমাদের কথারই ঠিক নেই, কখন যে কি বলি নিজেরাই ভালো জানি না। আমরা এখন এ-কথা বলছি, পরমুহূর্তেই আবার কথা ঘুরিয়ে অন্য কথা বলছি।
কেবল কথার মারপ্যাঁচের ব্যাপারটার কথাই বা বলি কেন? সম্প্রদায়, উপ সম্প্রদায় আর গোষ্ঠীর ব্যাপারটা? এ সবের যন্ত্রণায় কে না কাতড়ে মরছে–ভুগছে, বলুন তো?
আর একটা সে সর্বজন বিদিত প্রবঞ্চন, চাতুরি আর এড়ে তর্কের মাধ্যমে খ্যাতির শীর্ষে উঠে যাওয়া যে অনেক সহজ কাজ। কিন্তু বলুন তো, সাহিত্যিক প্রতিভার সাহায্যে সাহিত্য সৃষ্টি করার চেয়ে এরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে কাজ করার প্রবণতা কি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠছে না? বরং বলা চলে, এ দোষ সংক্রামক রোগের মতো কবি ও সাহিত্যিকদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
আবার এও তো মিথ্যা নয়, সর্ষের মধ্যেই ভূত ঢুকে বসে রয়েছে। বইয়ের সমালোচকদের কথা বলতে চাচ্ছি। বইয়ের সমালোচনার মধ্যে পুরো দুর্নীতি রয়েছে। বলুন, আমার বক্তব্যকে কেউ নস্যাৎ–অস্বীকার করতে পারবেন?
আমি আরও দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে পারি, প্রকাশক আর সমালোচকদের মধ্যে বর্তমানে এক গোপন ও অশুভ আঁতাত চলেছে। এটা সর্বজন বিদিত আর নোংরামিটাও হয়ে পড়েছে সার্বজনীন।
টাকা! সবই টাকার খেল ভাই! ধাপ্পা দিয়ে টাকা রোজগার করা প্রবৃত্তিটা বর্তমানে যেন মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। ব্ল্যাকমেল করে টাকা কামানোর সময় কি কারো চোখের পাতা কি এতটুকুও কাঁপে, আপনিই বলুন তো ভাই? একে ঘুষ ছাড়া অন্য কোন মানানসই নামে সম্বোধন করা যায় কি?
ব্ল্যাকমেলের মাধ্যমে সর্বনাশ হচ্ছে কাদের? আমি কিন্তু বলব, পাঠক-পাঠিকা, ক্রেতা আর বিক্রেতা–সবার। হ্যাঁ, সবারই সমান ক্ষতি হচ্ছে।
কেউ যদি খুবই বিশ্রিভাবে সত্য এ ঘটনাকে পাত্তা না দেন, তাচ্ছিল্যভরে হেসে উড়িয়ে দিতে চান তবে আমরাই কিন্তু হাসতে হাসতে খুন হয়ে যাবার যোগার হব। তবে এও সত্য যে, এর মধ্যে কিছু মহৎ ব্যতিক্রম আছেই আছে।
আর একটা কথা মনে রাখবেন, কিছুসংখ্যক সম্পাদক আছেন যারা কারো উমেদার নন, কারো তাবেদারী করার ধার ধারেন না। নিজের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে তাদের কলম এতটুকুও কাপে না। তারাই সত্যিকারের মনে-প্রাণে স্বাধীন।
প্রকাশকদের কাছ থেকে হাত পেতে কিছু নেওয়া তো দূরের কথা, এমনকি বই পর্যন্ত নেন না। তবে তারা বই নিলেও আগে থেকেই পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দেন, তাহলে সমালোচনা অবশ্যই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হবে।
তবে এও খুবই সত্য যে, এরকম সম্পাদকের সংখ্যা নিতান্তই কম। তবে কারা সংখ্যায় বেশি? অসাধু বই প্রকাশক আর যারা ধারে বই পড়তে দেয় এমন বইয়ের দোকানদাররা। তারাই এমন অদ্ভুত কৌশলে মিথ্যা জনমত তৈরি করে ফেলেছেন যার ফলে সত্যি কথা পাত্তা পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সত্যি কথার চেয়ে মিথ্যায় ভরা সমালোচনাই বেশি কদর পেয়ে থাকে।
বহু তিক্ততায় ভরা মনে এরকম ভর্ৎসনা করতে বাধ্য হচ্ছি। অন্তরের অন্তঃস্থল তিক্ত অভিজ্ঞতায় কানায় কানায় ভর্তি। উদাহরণ উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি না। কারণ, যে কোন বই খুলে দু-চার পাতা পড়লেই নিজেই উদাহরণ পেয়ে যাবেন।
ভাষায় অপূর্ব কৌশল আর মিথ্যার ফুলঝুড়ি দিয়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপার ব্যাপারটা বর্তমানে বাজার ছেয়ে গেছে। কথার কায়দা আর ছাপার কৌশল অবলম্বন করে দিনকে রাত, আর রাতকে একেবারে দিনে পরিণত করে দেওয়া হচ্ছে।
আশা করি খোলসা করে না বললেও চলবে, এরকম মন-ভোলানো বিজ্ঞাপন প্রকাশকরা ছাপছেন।
বর্তমানে বিজ্ঞাপনের আরও একটা পদ্ধতি বাজারে চালু হয়েছে। চোখেও পড়ে প্রচুরই। বেতন ভুক্ত কর্মচারীদের দিয়ে মন্তব্যযুক্ত বিজ্ঞপ্তি বইয়ের পুস্তণিতে সেঁটে অগণিত পত্র-পত্রিকার দপ্তরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর প্রকাশকরা তো বহু আগে থেকেই তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন। আসলে তারা যে প্রকাশকদের দ্বারা উপকৃত। তাই তাদের হয়ে কাজ করতে তো কুণ্ঠিত হবার কথা নয়।
তবে আশার কথা এই যে, কিছু সংখ্যক পত্র-পত্রিকার পাতায় এ অসাধু কাজের প্রতিবাদ করে লেখা ছাপা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, তাদের কলম প্রতিবাদে আরও অনেক বেশি সোচ্চার হয়ে উঠবেন, আরও কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানাবেন। তারা যা করছেন বা করবেন সবই সাহিত্যের মঙ্গল কামনা করেই করবেন, সন্দেহ নেই।
যে সব ভদ্রমহোদয় আমাদের পত্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন, তারা প্রত্যেকেই মনে-প্রাণে সত্য আর সতোর পক্ষাবলম্বন করেই লড়ে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য সুমহান এ বিষয়ে সন্দেহের তিলমাত্রও অবকাশ নেই। অতএব এটুকু আসা অবশ্যই করা যেতে পারে যে, এ লড়াই-এ ফল ভালো হতে বাধ্য।
