সাহিত্য সৃষ্টির ব্যাপারে আমরা নিতান্ত অক্ষম না হলেও বিদ্রুপাত্মক রচনার ব্যাপারে আমাদের দক্ষতা কিছুমাত্র নেই।
আমাদের নিজেদের সম্বন্ধে যথাযথ বিচার করে মন্তব্য করতে হলে স্বীকার না করে উপায় নেই, ব্যঙ্গ আর রঙ্গ রসিকতার কষাঘাতে সমাজের মানুষকে সোজা করার কায়দা আমাদের জানা নেই।
দ্য কোয়ান্স অব হেলিকন নামক কেতাবটা হাতে পেয়ে আমরা খুশিতে ডগমগ হয়ে পড়েছি। বইটার লেখক মি. উইলসার।
এ দেশের চন্দ্র-সূর্যের তলায় মি. উইলমারের লেখা বইটা যেন নবতম সৃষ্টি। তিনি খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে এর প্রতিটা অক্ষর সাজিয়ে সাজিয়ে যত্নের সঙ্গে বইটাকে লিখেছেন।
সাহিত্য সমালোচনার অবর্ণনীয় দুর্নীতি আর বক্তব্যের অসঙ্গতি আর অবান্তর কথার ফুলঝুড়িতে আমাদের শ্বাস রোধ হয়ে আসার যোগার ব্যাপারটাকে নিছকই একটা দুর্ঘটনা ছারা আর কি-ই বা বলা যেতে পারে? মি. উইলমারের দাবি কিন্তু সাহিত্য জগতে তিনি নতুনতর কিছু আমাদের উপহার দিয়েছেন। কিন্তু আসলে আমরা, পাঠক-পাঠিকা যে কি পেয়েছি তা-তো নিজেরাই মনে মনে উপলব্ধি করছি।
পাঠক-পাঠিকারা নিশ্চয়ই এক বাক্যে স্বীকার করবেন মি. উইলমারের দ্য কোয়াঅব হেলিকন কবিতা হিসেবে ত্রুটিহীন তো নয়ই বরং ক্রটিতে ভরা।
স্বীকার করতেই হবে কবিবর উইলমার আমাদের বন্ধুজন হলেও তার কবিতার ত্রুটিগুলো উল্লেখ করে আমরা যারপরনাই খুশিই হব। তবে এও অবশ্য স্বীকার্য যে তার কবিতা কেবলমাত্র ত্রুটি পূর্ণই নয়, গুণও আছে অনেকই।
তাঁর কবিতার প্রতিটা ছত্রে অত্যাশ্চর্য সদ্গুণ থাকলে ব্যঙ্গাত্মক কাব্য হিসেবে বর্তমান বইটা লেখার প্রয়াস ও পরিশ্রম দু-ই পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যেত, সন্দেহ নেই। আর সে সম্প্রদায়ের আঘাত হানার জন্য এত সব প্রয়াস সে সম্প্রদায়ই বিদ্রুপে ফেটে পড়ত।
মি. উইলমারের লেখা কাব্যটা অনুকরণ দোষে সবচেয়ে বেশি করে দুষ্টু।
একটা কথা, পোপ আর ড্রাইডেন-এর ব্যঙ্গাত্মক রচনার কৌশল অবলম্বন করে যদি কাব্যগ্রন্থটার প্রথম থেকে শেষ অবধি লেখা হত তবে আমার স্বীকার না করে উপায় থাকত না যে, কাব্যগ্রন্থটার রচনা অবশ্যই উকৃষ্ট হয়েছে।
কিন্তু কাব্যগ্রন্থটা পাঠ করলে তার শব্দরাশি, ছন্দ মেলানোর কৌশল, পরিচ্ছেদ সাজানো আর ব্যঙ্গের মোটামুটি কায়দা-কৌশল প্রভৃতির বিচার করে সহজেই ধরা যাচ্ছে সবই ড্রেনডনের কাব্য অনুকরণ করে রচিত।
সে আমলের ব্যঙ্গ-রসে পরিপূর্ণ রচনা চরম উৎকর্ষতা লাভ করেছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু সম্প্রতিকালে কেউ যদি নতুন উদ্যম নিয়ে সে প্রয়াস চালাতে উৎসাহি হয়ে ওঠে তবে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আর মৌলিকতা থেকে সরে না দাঁড়িয়ে তার কোন পথই থাকবে না। অতএব সব মিলিয়ে তার পতন যে অনিবার্য এ বিষয়ে তার। তিলমাত্র সন্দেহও নেই।
নকল করে মি. উইলমার যে লক্ষণীয় একটা নজির সৃষ্টি করেছেন, এ ব্যাপারে তো সবকিছু দেখে বুঝেও-না-বোঝার, আর না দেখার ভান করা সম্ভব নয়, উচিতও নয়।
একটা কথা কিন্তু খুবই সত্য যে, মানসিক চিত্রগুলো মি. উইলমারের একেবারেই নিজস্ব। সত্যি তিনি কারো ইমেজ নকল করেননি। কিন্তু এই বিষয়গুলোকে তিনি যেভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে কাব্যের রূপদান করেছেন তা যে তার নিজস্ব নয়–সে রূপ গুলো যে পোপ আর ড্রাইডনের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি। আর মি. ইউলিমার সে সব। সুকৌশলে চুরি করে নিজের কাব্যে ব্যবহার করেছেন। কেবলমাত্র পোপ আর ড্রাইডনের কথাই বা বলি কেন? চার্চিল আর রোচেস্টারের সম্পদ চুরি করে নিজের বলে চালাতেও তিনি কিছু মাত্র দ্বিধা করেননি। অতএব অনুকরণ প্রিয়তা দোষে মি. উইলমার অবশ্যই দুষ্ট।
মি. উইলমারের সবচেয়ে বড়দোষ অনুকরণ প্রিয়তা। আর এ দোষের জন্যই তিনি তাঁর রচিত কাব্যকেও দোষী করে ফেলেছেন।
অতএব একটা কথা না বলে পারা যাচ্ছে না, মি. উইলমার সুবুদ্ধি ঘটিয়ে অনুকরণ করার কাজ থেকে বিরত থাকলেই ভালো করতেন।
কাব্যটা পাঠ করে যা উপলব্ধি করা যাচ্ছে মি. উইলমার সুন্দর মনে করে যে সব জায়গা নকল করেছেন তা আসলে সুন্দর নয়, ত্রুটিপূর্ণ।
কেন ত্রুটিপূর্ণ বলছি? যেমন ধরা যাক ওয়ার শব্দের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়েছেন ডিক্লেয়ার শব্দটা ব্যবহারের মাধ্যমে। আর তিনি এটা করেছেন কবিবর পোপ-এর অনুকরণে। এ-কাজটা করার সময় তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেননি, উভয় শব্দেরই বর্তমানকালের উচ্চারণ তাদের আমলের উচ্চারণের মতো নয়। অতএব এক্ষেত্রে তার ত্রুটি অবশ্যই রয়ে গেছে।
আর একটা কথা আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, মি. উইলমারের লেখা কাব্য দ্য কোয়ার্স অব হেলিকন নোংরামির জন্য সবচেয়ে বেশি কলুষিত হয়েছে, কলঙ্কের কালিমা গায়ে মেখে নিয়েছে।
কিন্তু একটা কথা আমরা বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি নোংরামি মি. উইলমারের মনের সহজাত নয়, প্রবৃত্তির সঙ্গে জড়িয়ে নেই।
আর একটা ব্যাপার খুব বেশি করে প্রযোজ্য যে, রোচেস্টার আর সুঈফট-এর লেখার কায়দা কৌশলের অন্ধের মতো অনুকরণ করতে গিয়ে, মি. উইলমার নিজের যথেষ্ট সৃষ্টির ক্ষতি করেছেন। এমন একটা কাজের মাধ্যমে তিনি কেলেঙ্কারী করে বসেছেন তা আর কহতব্য নয়।
যা বলা দরকার তা স্পষ্ট আর খোলসা করে বলা যাক। বক্তব্য স্পষ্ট না হলে ধন্ধ তো থেকে যাবেই। তবে যা শোভন নয়, পাঁচজনে যাকে নোংরা আখ্যা দিয়ে থাকে, তাকে যেন কখনই কল্পনায় স্থান দেওয়া না হয়, আর বক্তব্যের মধ্যে টেনে আনা তো অবশ্যই উচিত নয়।
