দেখলাম, শেঁকলজড়ানো মনুষ্যমূর্তিটা গলা থেকে বেরিয়ে-আসা নিরবচ্ছিন্ন আর্তস্বর যেন আমাকে আচমকা সজোরে পিছনের দিকে ঠেলে দিল।
আমার মধ্যে অকস্মাৎ কেমন যেন ভাবান্তর ঘটল। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি ইতস্তত করলাম। আমার সর্বাঙ্গ থর থরিয়ে কাঁপতে লাগল।
আমি দিগ্বিদিক্ জ্ঞানশূন্য হয়ে বিদ্যুঙ্গতিতে খাপ থেকে তরবারিটাকে এক হেঁচকা টানে বের করে ফেললাম। এবার ব্যস্ততার সঙ্গে ছোট্ট কামরাটার ভেতরে হাতড়াতে লাগলাম। মুহূর্তের চিন্তাই আমাকে নিঃশঙ্কিত করে দিল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। এবার মোমবাতিটা নিয়ে দুপা এগিয়ে গেলাম। সমাধিগুলোর ওপরে হাত বুলাতে লাগলাম। নিশ্চিন্ত হলাম। সন্তুষ্টি বোধ করলাম।
মোমবাতিটা হাতে নিয়েই আমি সদ্যগাঁথা দেওয়ালটার দিকে এগিয়ে গেলাম।
আর্তস্বর সমান তালেই ভেসে আসছে। আমি এবার আর্তনাদের জবাব দিতে শুরু করলাম। তার কথার প্রতিধ্বনিই যে কেবল করলাম তাই নয়, নতুন কথাও বলতে লাগলাম। ক্রমে কণ্ঠস্বর উঁচু পর্দায় তুলতে তুলতে পঞ্চমে ছড়িয়ে দিলাম। আমার কণ্ঠস্বর তার স্বরকে ছাপিয়ে গেল।
লক্ষ্য করলাম আমার কণ্ঠস্বর তার স্বরকে চাপা দিয়ে দিলে তার স্বর ক্রমে থেমে গেল। নিশ্চিন্ত হলাম। আমিও বাধ্য হয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। এবার সেখানে অখণ্ড নীরবতা নেমে এলো।
ক্রমে রাত ঘনিয়ে এলো। আমার প্রাচীর গাঁথার কাজও মিটে গেল। অষ্টম, নবম এবং দশম স্তরও গাঁথার কাজ আমি পুরোপুরি মিটিয়ে ফেললাম। কয়েক মুহূর্ত বিশ্রাম নিয়ে আমি আবার কর্ণিকটা হাতে তুলে নিলাম। একাদশ আর শেষ স্তরটারও একটা অংশ গাঁথা হয়ে গেল। এবার আর মাত্র একটা পাথর গেঁথে প্লাস্টার লাগানোর কাজ বাকি রইল ।
পাথরটা খুবই বড় আর ভারী। কঠোর পরিশ্রম করে, বহু চেষ্টায় সেটাকে কোনোরকমে আংশিকভাবে জায়গামত বসাতে পারলাম।
পাথরটা থেকে হাত দুটোকে সরাতে-না-সরাতেই কুলুঙ্গির ভেতর থেকে হঠাৎই একটা চাপা হাসির শব্দ ভেসে এলো। অট্টহাসি হলেও সেটা খুবই চাপা। আমি থমকে গেলাম। উৎকর্ণ হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলাম। আতঙ্কে আমার বুকের ভেতরে ঢিব ঢিবানি শুরু হয়ে গেল। চোখের পলকে আমার মাথার সব কয়টা চুল সজারুর কাঁটার মতো খাড়া হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই রীতিমত বিষণ্ণ একটা স্বর আমার কানে এলো। বার বার উৎকর্ণ হয়ে লক্ষ্য করেও আমার বুঝতে খুবই কষ্ট হলো যে, সেটা আমার বন্ধুবর মহানুভব ফর্চুনাটোর বিষণ্ণ কণ্ঠস্বর।
আবার–আবারও চাপা হাসির স্বর আমার কানে এলো–’হ্যাঁ! হা! হা!
মস্করা। মস্করা–চমৎকার মস্করাই বটে।
যাক, ভালোই হল, পালা করে ব্যাপারটা নিয়ে চুটিয়ে রঙ্গ-রসিকতা করা যাবে। মদের পেয়ালা হাতে নিয়ে খুব হাসাহাসি করা যাবে।
আমি বললাম–‘অ্যামন্টিলাডো। অ্যামন্টিলাডো।
‘হ্যাঁ, হা! হা! হা!–হ্যাঁ, অ্যামন্টিলাডো কিন্তু খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে না। লেডি ফার্টুনাটো আর অন্যান্য সবাই কি আমাদের জন্য পালাজ্জোতে অধীর অপেক্ষায় রয়েছে না? সে গলা ছেড়ে বলল।
আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলাম– যাওয়া দরকার তো অবশ্যই।
‘দেবতা মন্ত্রেসরের সন্তোষ উৎপাদন, প্রীতির জন্য।
‘অবশ্যই দেবতার প্রীতির জন্য!
কিন্তু তার একটামাত্র উত্তর শোনার জন্য আমার মধ্যে অত্যুগ্র আগ্রহ জেগে উঠল। আমি উত্তর্ণ হয়ে রইলাম।
না, আর কোনো উত্তরই ভেসে এলো না।
আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার জোগাড় হল। বহু চেষ্টা করেও নিজেকে আর সংযত রাখা কিছুতেই সম্ভব হলো না। আমি গলা ছেড়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম
‘ফর্চুনাটো? ফর্চুনাটো?
না, আমার প্রশ্নের কোনো উত্তরই ভেসে এলো না।
না, এবারও কোনোই সাড়া পেলাম না।
আমি এবার সাধ্যমত গলা ছেড়ে চিৎকার করে ডাকলাম–‘ফর্চুনাটো। ফর্চুনাটো।
তবুও কোনো কণ্ঠস্বর আমার কানে এলো না। বরং আমার কণ্ঠস্বরটা প্রতিধ্বনিত হয়ে বার বার আমার কাছেই ফিরে এলো।
আমি অসম্পূর্ণ দেওয়ালটার গর্ত দিয়ে হাতের জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে ভেতরে গলিয়ে দিলাম।
না, এতেও কোনো সাড়াশব্দ আমার কানে এলো না। কেমলমাত্র ঘণ্টার ঠুং-ঠাং শব্দ ফাঁকাটা দিয়ে বেরিয়ে আমার কানে এলো। আমার হৃদযন্ত্রটা যেন হঠাৎ দুমড়ে মুচড়ে এলো, যেন বিকল হয়ে যাবার জোগাড় হল। উপলব্ধি করতে লাগলাম, সমাধিপ্রাঙ্গণটা ক্রমে ঠাণ্ডা হয়ে পড়তে লাগল। ঠাণ্ডা–অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডায় যেন একেবারে ঝালিয়ে যাবার জোগাড় হলাম।
হাত চালিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা শেষ করার জন্য আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
অনেক চেষ্টা করে মেষ বড়সড় পাথরটাকে জায়গামত বসিয়ে দিলাম। এবার তার ওপর কর্ণিক দিয়ে তড়িঘড়ি পলেস্তারা চাপালাম।
হাড়ের পুরনো সে প্রাচীরটাকে সদ্য গাঁথা দেওয়ালটার গায়ে আবার নতুন করে সাজিয়ে দিলাম।
আধা শতক কাল ধরে এসব হাড়ে, হাড়ের গায়ে কোনো মানুষের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। এদিকে কারো নজরই পড়েনি। গোড়াতে যেমন ছিল আজও ঠিক তেমনই রয়ে গেছে।
তাদের শান্তি বিঘ্নিত হোক এটা আমার আদৌ ইচ্ছা নয়। তারা পরম শান্তিতে অবস্থান করুক।
দ্য কোয়াকস অব হেলিকন–এ স্যাটায়ার
সম্প্রতিকালে, বিশেষ করে একজন আমেরিকান-এর কলমের ডগা দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা বেরনো নতুন কিছু, খুবই প্রশংসনীয় সন্দেহ নেই। এ ব্যাপারে আটলান্টিক মহাসাগরের অধিবাসীরা অর্থাৎ আমরা যা-কিছু করেছি তার মধ্যে কোনটাই তেমন উল্লেখযোগ্য নয়–কোন দিক থেকেই গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়।
