এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেরাতেই দেওয়ালের গায়ে, ফুট দুই উঁচুতে পাশাপাশি, প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দুটো আংটা রয়েছে দেখলাম। ছোট একটা শেঁকল তার একটা থেকে ঝুলে থাকতে দেখলাম। আর অন্য আংটায় একটা তালাও ঝোলানো রয়েছে। দেখতে পেলাম।
শেঁকলটা তার কোমরে আচ্ছা করে জড়িয়ে তালাবন্ধ করতে তো মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
আমার বন্ধু তখন অতি বিস্ময়ের ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। আর এরই ফলে বাধা দেওয়ার মতো মানসিকতা বা শক্তি সামর্থ্য কোনোটাই তার মধ্যে ছিল না। আর এরই জন্য আমার পক্ষে এত সহজে কাজটা হাসিল করা সম্ভব হল।
এবার তালা থেকে চাবিটাকে বের করে আমি দুপা পিছিয়ে এলাম।
বন্ধুর বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। সে বন্দি অবস্থায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়েই রইল।
আমি তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বললাম–‘এবার দেওয়ালটার গায়ে হাতটা বুলাও।’
সে পাথরের মূর্তির মতোই নিশ্চল-নিথরভাবে নীরব চাহনি মেলে আমার মুখের দিকে আগের মতো তাকিয়েই রইল।
আমি এবার অধিকতর গম্ভীর স্বরে, প্রায় ধমক দিলাম–কী হল, দেওয়ালটার গায়ে হাত বুলাও, তবেই সোরার উপস্থিতি স্পষ্ট বুঝতে পারবে। সত্যি দেওয়ালটা খুবই স্যাঁতাতে। মনে হচ্ছে এই মাত্র কে যেন পানি ছিটিয়ে দিয়েছে। কী হল, চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে যে বড়। হাত বুলাও, দেওয়ালটার গায়ে হাত বুলাও।
সে আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল।
আমি এবার গলা নামিয়ে বললাম–‘শোন, আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই সে বলে উঠল–‘অনুরোধ? কি সে অনুরোধ।
‘আমি তোমাকে বার বার অনুরোধ করছি, ফিরে চল।
‘না। আমার পক্ষে ফিরে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
‘সম্ভব নয়! এখনও বলছি ফিরে চল।
‘বললামই তো, যাব না, কিছুতেই যাব না।’
তবে তুমি যাবেই না? ভালো কথা, তবে তোমাকে এখানে এ অবস্থায় ফেলে রেখেই আমি চলে যাব, বলে দিচ্ছি।
‘হুম!
‘হ্যাঁ, এ ছাড়া আর কোনো উপায়ই দেখছি না। তবে তোমাকে এ অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যাওয়ার আগে তোমার দিকে সাধ্যমত মনোযোগ দেব আমি–
আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বন্ধুবর গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল– ‘অ্যামন্টিলাডো! অ্যামন্টিলাডো!’ লক্ষ্য করলাম তার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি।
আমি অপেক্ষাকৃত গলা নামিয়ে বললাম–ঠিকই বলেছ অ্যামন্টিলাডো।
তাকে উদ্দেশ্য করে কথা ছুঁড়ে দিয়েই আমি দু-তিন পা এগিয়ে গেলাম। ব্যস্ত হাতে হাড়ের স্তূপ সরাবার কাজ শুরু করে দিলাম।
হাড়ের স্তূপ সরিয়ে কিছু হালকা করতে না করতেই আমার চোখে পড়ল বাড়ি তৈরির ছোট-বড় পাথর আর কিছু পরিমাণ চূণ-সুড়কির ছোট ছোট দুটো স্তূপ।
বাড়ি তৈরির মাল-মশালা পেয়ে যাওয়াতে আমার মনে উৎসাহ উদ্দীপনা রীতিমত চাঙ্গা হয়ে উঠল। আপন মনে বলে উঠলাম–‘যাক একটা দেওয়াল গাঁথার কোনো
সমস্যাই তবে আর রইল না।
আর মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে আমি আলখাল্লার তলা থেকে কর্ণিকটা ঝট করে বের করে আনলাম। তারপর সে সব মাল-মশলাগুলোকে ব্যবহার করে ঝটপট প্রাচীর গাঁথতে আরম্ভ করলাম। কর্ণিকটা সঙ্গে থাকাতে বাঁচা গেল।
হাত চালিয়ে প্রাচীরটার প্রথম স্তরটা গাঁথা শেষ হতে না হতেই একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করলাম, বন্ধুর নেশাটা অনেকাংশে কেটে গেছে।
ব্যাপারটা আমি কিভাবে বুঝলাম, তাই না? তার প্রথম প্রমাণ পেলাম, ছোট্ট কামরাটার ভেতর থেকে বার কয়েক চাপা আর্তস্বর ভেসে এলো।
আমি উত্তর্ণ হয়ে আর্তস্বরটাকে লক্ষ্য করলাম।
শেষপর্যন্ত নিঃসন্দেহ হয়ে আপন মনে বলে উঠলাম–‘না, এ তো কিছুতেই মাতালের কণ্ঠস্বর নয়। মদ্যপ অবস্থায় কেউ যতই চিৎকার চ্যাঁচামেচি করুক না কেন, কণ্ঠস্বর কম বেশি জড়িয়ে জড়িয়ে উচ্চারিত হতে বাধ্য।
বার-কয়েক আর্তনাদের পরই লক্ষ্য করা গেল সেখানে দীর্ঘস্থায়ী নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।
যাক, কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।
আমি আবার প্রাচীর গাঁথার কাজে হাত দিলাম। ব্যস্ত হাতে কর্ণিক চালিয়ে প্রাচীরটার দ্বিতীয় তৃতীয় এবং চতুর্থ স্তরটা গাঁথার কাজও সেরে ফেললাম।
আমি চতুর্থ স্তরটা গাঁথার কাজ সবে শেষ করেছি, ঠিক তখনই পাথরের টুকরোর প্রচণ্ড শব্দ আমার কানে এলো।
মিনিট কয়েক দূরে অনবরত সে শব্দটা হয়েই চলল।
শব্দটাকে ভালোভাবে লক্ষ্য করে ব্যাপারটা বোঝার জন্য হাত থেকে কর্ণিকটা নামিয়ে হাড়ের স্তূপের ওপর বসে পড়লাম।
এবার পাথরের শব্দের সঙ্গে শেকলের ঝনঝনানী শুরু হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ধরে এক নাগাড়ে চলল পাথর আর শেকলের শব্দটা।
এক সময় অবাঞ্ছিত শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
আমি আবার হাড়ের স্তূপ থেকে নেমে কর্ণিকটাকে হাতে তুলে নিলাম।
আবার পুরোদমে প্রাচীর গাঁথার কাজে লেগে গেলাম। কোনোরকম বাধা বিপত্তি ছাড়াই পঞ্চম, ষষ্ঠ আর সপ্তম স্তরটাও গেঁথে ফেললাম।
এ পর্যন্ত গাঁথার পর লক্ষ্য করলাম, প্রাচীরটার প্রায় বুক অবধি গাঁথা হয়ে গেছে। নিজের দক্ষতার জন্য ভেতরে ভেতরে খুব খুশিই হলাম।
সপ্তম স্তর অবধি গাঁথার পর আমি আবার কাজ বন্ধ করলাম। এবার গাঁথুনির ওপর জ্বলন্ত মোমবাতিটা তুলে ধরে ভেতরের মূর্তিটার ওপর সাধ্যমত আলোকচ্ছটা ফেলে পরিস্থিতিটা দেখার চেষ্টা করলাম।
