সে ছোঁ মেরে বোতলটা আমার হাত থেকে নিয়েনিল। লম্বা একটা চুমুক দিয়ে সে বোতলটাকে প্রায় খালি করে দিল।
তার চোখ দুটো জ্বল জ্বল করতে লাগল। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল তার চোখ দুটো যেন অত্যুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
সে বোতলটায় শেষ চুমুক দিয়ে খালি বোতলটাকে এমন অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করে ছুঁড়ে ফেলে দিল, আমার পক্ষে কিছু বোঝা সম্ভব হলো না।
বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম।
আগের মতোই অত্যাশ্চর্য অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সে জিজ্ঞাসা করল–‘কি, কিছুই বুঝতে পারলে না?
আমি অসহায়ভাবে জবাব দিলাম না। সত্যি বলছি, কিছুই বুঝতে পারিনি।’
‘তবে আমি একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি–।
আমি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম–কী? কী কথা?
তবে তুমি তো দলের লোক নও হে।
‘দলের লোক নই? কী ব্যাপার বল তো?
‘আমি বলতে চাচ্ছি যে, তুমি রাজমিস্ত্রি পরিবারের লোক নও–কিছুতেই হতে পারে না।’
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।
চোখে মুখে গভীর বিস্ময়ের ছাপ এঁকে বলল–‘তুমি? রাজমিস্ত্রি পরিবারের? অসম্ভব–একেবারেই অসম্ভব!’
‘আমি রাজমিস্ত্রি। অবশ্যই রাজমিস্ত্রি পরিবারের লোক।
‘ভালো কথা, কোনো প্রমাণ দিতে পার?
‘পারি। অবশ্যই পারি।’
কী সে প্রমাণ, দেখাও তো?’
তার মুখের কথা শেষ হবার আগেই আমি গায়ের আলখাল্লার ভেতরে হাতটা চালান করে দিলাম। একটা কর্ণিক বের করে এনে তার মুখের সামনে নাচাতে নাচাতে বললাম–প্রমাণ চাচ্ছিলেন না? এই যে, এটাই প্রমাণ দেবে যে, আমি রাজমিস্ত্রি পরিবারের লোক। আর নিজের একজন রাজমিস্ত্রি।
সে ঝট করে কয়েক পা সরে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল–‘বাজে কথা! তুমি আমার সঙ্গে রসিকতা করছ।
আমি নীরবে ম্লান হাসলাম।
সে এবার বলল–‘কিন্তু এবার চল, অ্যামন্টিলাডোর কাছে যাই।’
আমি কর্ণিকটাকে আবার আলখাল্লার ভেতরে চালান করে দিলাম। সে আবারও বলল–কী, যাবে তো? অ্যামন্টিলাডোর কাছে যাচ্ছ তো? চল, যাওয়া যাক।
আমি হাত বাড়িয়ে তার হাতটাকে ধরে বললাম ঠিক আছে, তাই চল! এবার দেখা গেল, সে আমার গায়ে একটু বেশি করেই ভর দিল।
আমরা হাত ধরাধরি করে অ্যামন্টিলাডোর খোঁজে এগিয়ে চললাম।
আমরা এবার একের পর এক খিলান পেরোতে পেরোতে অনেকগুলো খিলান পেরিয়ে নিচে নেমে গেলাম। তারপর আরও কয়েক পা এগিয়ে আবার নিচে নামতে লাগলাম।
শেষপর্যন্ত আমরা একটা গুহার মধ্যে ঢুকে গেলাম। নাকে একটা দুর্গন্ধ আসতে লাগল। বাতাসে একটা অস্বাভাবিক ভোটকা গন্ধ। আর তার ফলে একটা জিনিস নজরে পড়ল, মোমবাতির আলোর জোর যেন অনেকাংশে কমে গেল।
আমি এগিয়েই চললাম। গুহাটার একেবারে শেষপ্রান্তে গিয়ে আর একটা গুহা দেখতে পেলাম।
দ্বিতীয় গুহাটায় ঢুকেই আমরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম, দেওয়াল বরাবর নরকঙ্কাল স্থূপাকৃতি হয়ে একেবারে ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে। অবিকল প্যারিসের বড় সমাধিক্ষেত্রের মতোই দৃশ্য। শুধুই কঙ্কাল আর কঙ্কাল।
আমি বিস্ময় মাখানো কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে গুহাটার চারদিকে তাকাতে লাগলাম। দেখলাম, গুহাটার তিন দিকে একই রকমভাবে নরকঙ্কাল স্থূপাকৃতি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চতুর্থ দেওয়ালটার দৃশ্য অবশ্য অন্যরকম। সেখানকার কঙ্কালগুলোকে নিচে নামিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণেই সেখানে একটা ছোট স্কুপ গড়ে উঠেছে।
চতুর্থ দেওয়ালটা থেকে কঙ্কালগুলোকে নামিয়ে স্থানান্তরিত করে ফেলার জন্য সেটা ফাঁকা হয়ে গেছে। আর এজন্যই আরও একটা ছোট গুহা আমাদের নজরে পড়ে গেল।
তৃতীয় গুহাটার গভীরতা চারফুট, উচ্চতা ছয়-সাত ফুট আর প্রস্থ তিন ফুট।
আমি এগিয়ে গিয়ে অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে গুহাটাকে দেখে নিলাম। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে গুহাটা তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে হলো না। আবার এও সত্য যে, এটাকে তৈরি করার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আমি কোনোরকম কল্পনাও করতে পারলাম না।
কেবলমাত্র আমার কথাই বা বলি কেন, গুহাটা নিয়ে ফচুনটার কৌতূহলও কম মনে হলো না। সে হাতের মোমবাতিটাকে উঁচু করে, বার বার এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বৃথাই তার ভিতরটা ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু মোমবাতির আলো গুহাটার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছালা। শেষপর্যন্ত সে ব্যাপারটা সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, কিছুই বলল না। আমি নিজের কিছু জিজ্ঞাসা করে মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ দেখালাম না।
আমি বললাম–‘এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর আমাদের অভিষ্ট সিদ্ধ হবে না। চল, এগিয়ে যাওয়া যাক। অ্যামন্টিলাডোর দেখা এখানেই পাওয়া যাবে। আর লুচেসিও’
আমার বন্ধুবরের পা দুটো আগের চেয়ে বেশি মাত্রায় টলতে লাগল। আঁকাবাঁকা পদক্ষেপে সে সামনের দিকে এগোতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে সে বলল–‘আরে ধৎ! সে তো একটা অকাট মূর্খ দেখছি।’
আমি তাকে ধরার আগেই লম্বা লম্বা পা ফেলে সে মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটার একেবারে শেষ প্রান্তে হাজির হয়ে গেল।
না, সে আর এগোতে পারল না। পাথরে পথ আটকে যাওয়ার ফলে তাকে নামতেই হল। সে পাথরগুলোর দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়েই রইল।
ব্যস, আর দেরি নয়। আমি যন্ত্রচালিতের মতো চোখের পলকের মধ্যেই শিকল দিয়ে তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেললাম। তারপর শেঁকলটাকে বড় সড় একটা গ্রানাইট পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে ফেললাম। সে বন্দি হয়ে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
