‘তাই বুঝি?
‘অবশ্যই। তোমাকে হারাতে হবে এ-কথা ভাবলেই আমার বুকের ভেতরে চিব ঢিবানি শুরু হয়ে যায়। আমার কথা ছাড়ানই দাও। তুমি ফিরে যাও, অসুস্থ হয়ে পড়বে, সেজন্য আমি দায়ী হব এটা যে ভাবাই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর
‘আর কী?
‘আর লুচেসি রয়েছে–অতএব–‘
‘থাক বন্ধু, খুব হয়েছে, অনেক কিছুই তো বললে–ক্ষান্ত হও।’
‘কিন্তু বুকভরা এমন–‘
‘আরে বন্ধু, এ কাশি খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপার। এতে আমার মৃত্যু হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘কিন্তু–
‘এতে কোনো কিন্তুই থাকতে পারে না। একটু আধটু কাশিতেই আমার মৃত্যু এরকম কোনো আশঙ্কাই নেই।
‘ঠিক, ঠিকই বলেছ। শোন, সত্যি কথা বলছি, অহেতুক তোমাকে ভয় দেখানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও আমার মধ্যে ছিল না।
‘তবে?’
‘আমি বলতে চাইছি, তোমাকে সব রকম সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।’
‘কিন্তু কিভাবে?
একটা মদের পাত্রের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে আমি এবার বলে উঠলাম– এই অমৃতসুধা, মানে এ মেডক মদ এক পেয়ালা গলায় ঢাললেই ঠাণ্ডা আমাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।’
সে আমার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নীরবে মুচকি হাসল।
আমি দুপা এগিয়ে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলাম। এক সারি মদের বোতলে ভেতর থেকে একটা বোতল তুলে নিলাম। দেওয়ালের গায়ে মৃদু আঘাত করে তার গলাটা ভেঙে ফেললাম। ভৰ্ভ করে কিছুটা মদ ভাঙা গলাটা দিয়ে বেরিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখ মুখের উৎসাহের ছাপটুকু আমার নজর এড়াল না। মদের বোতলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম–এই নাও খাও।
সে মুখটাকে অদ্ভুতভাবে বাঁকিয়ে আমার হাত থেকে বোতলটানিল। তারপর ঠোঁটে ঠেকাল।
দু-এক ঢোক খেয়েই সে মুহূর্তের জন্য থামল। তারপর আন্তরিকতার সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা দোলাল। টুপির সঙ্গে আটকানো ঘণ্টাগুরো টুনটুন্ শব্দ করে বাজতে লাগল।
আমি তার চোখ-মুখে তৃপ্তির ছাপটুকু লক্ষ্য করে নীরবে মুচকি হাসলাম।
সে আবেগ উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বলল–‘বন্ধু, আমি কাদের উদ্দেশে পান করছি, বলতে পার?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম। সে বলে চলল–‘আমার চারদিকে যারা কবরে শুয়ে বিশ্রামে রত আমি তাদের উদ্দেশ্যে পান করছি, বুঝলে?
আমি বললাম–আর আমি কী কামনা করে পান করছি, বল তো?
ঠোঁট থেকে মদের বোতলটা নামিয়ে নিয়ে সে বলল–‘কী? কী কামনা করে?
‘তোমার দীর্ঘায়ু কামনা করে।
‘হুম।
সে এবার এগিয়ে এসে আমার হাত ধরল।
আমরা আবার এগোতে লাগলাম।
কয়েক পা এগিয়ে সে বলল–‘বন্ধু, এ ভূগর্ভ কক্ষগুলো খুবই চওড়া, তাই না?
‘হ্যাঁ, তা একটু চওড়াই বটে।
‘একটু বলছ কি, বরং বল, বেশি রকমই চওড়া।
‘মন্ত্রেসরাও তো ছিল খুবই বড়, আর রিবারও তো ছিল অসংখ্য; ঠিক কি না?
‘আরে, তোমার হাত কখন যে ছেড়ে দিয়েছি, খেয়ালই করিনি।
‘তাতে কি আছে, আবার ধরলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
সে আবার আমার হাতটা ধরল। এবার বেশ শক্ত করেই ধরল।
‘নীল মাঠে একটা ইয়া বড় মানুষের পা। সে পায়ের চাপে একটা সাপ একদম থেঁতলে গেল। তার গোড়ালির তলায় সাপের ফণাটাও থেঁতলে গেল।
‘নীতিবাক্যটা কী, বল তো?’
‘আমার অনিষ্ট সাধন না করে সে আমাকে উত্তেজিত করে।
সে বলল–‘ভালো! খুব ভালো!’
আমরা আরও কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। তার চোখ দুটো লাল, জবাফুলের মতো লাল। মদে রীতিমত কুঁদ হয়ে রয়েছে। টুপির মাথায় আঁটা ঘণ্টা টুং-টাং শব্দে বাজছে।
কেবলমাত্র তার কথাই বা বলি কেন? মেডেকের নেশা আমাকেও জেঁকে ধরেছে।
আমরা হাত ধরাধরি করে পা ফেলতে লাগলাম। উভয়ের পা-ই প্রায় সমানভাবেই টলছে। আর মেডেকের নেশায় আমার কল্পনাও চাঙ্গা হয়ে উঠতে লাগল।
পাঁজাকরা হাড়ের দেওয়ালের ভেতর দিয়ে গাদাগাদি করে রাখা মদের বোতলের স্তূপ আর বেশ কয়েকটা পিপে পেরিয়ে আমরা সমাধি প্রাঙ্গণের একবারে ভেতরে হাজির হলাম।
এবার উভয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সে আমার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল।
এবার আমি বুকে সাহস সঞ্চয় করে ফর্চুনাটোর হাতটা খপ করে চেপে ধরলাম। সে বলল–‘সোরা!’ আমি অন্যমনষ্কভাবে উচ্চারণ করলাম–‘হ্যাঁ, সোরা–সোরাই বটে।
‘লক্ষ্য করছ, সোরার পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।
‘হ্যাঁ, তা বাড়ছে বটে।
‘প্রাচীরের গায়ে শ্যাওলার মতো জমে রয়েছে। আস্তরণটা কী পুরু, তাই না?
‘হ্যাঁ, তা বটে।’
‘আমরা এখন নদীখাতের তলায় অবস্থান করছি। ওই–ওই দেখ, হাড়ের ওপর। টপ টপ করে বিন্দু বিন্দু পানি পড়ছে।’
‘এখন সময় আছে, চল, সময় থাকতে কেটে পড়া যাক।
‘কেটে পড়বে?
‘সেটাই তো উচিত। তোমার কাশিটা আবার–‘
‘আরে, ধৎ। কাশি কাশি করেই তুমি কান ঝালাপালা করে দিলে দেখছি!’
‘তাই বলে কাশির ব্যাপারটাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।’
‘কাশির ব্যাপারটা ছাড়ান দিয়ে, অন্য কথা বল। চল তো এগিয়ে যাওয়া যাক।
পা বাড়িয়ে সে আবার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বলল–এগোনোর আগে বরং আর এক চুমুক করে মেডক গলায় ঢেলে নেওয়া যাক, কী বল বন্ধু?
আমি তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে ডি গ্রাভের সরু মুখওয়ালা একটা বোতল হাতে তুলে নিলাম।
সে ব্যগ্র হয়ে আমার হাত থেকে সেটাকে ছোঁ মেরে প্রায় নিয়েই নিচ্ছিল।
আমি পাশের হাড়ের দেওয়ালে ঠুকে বোতলের মুখটা ভেঙে তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম।
