‘হুম’
‘আরে বন্ধু, ভূগর্ভ কক্ষ বলতেই খুব স্যাঁতাতে হয়। কেবলমাত্র তোমার ঘরের কথাই বলছি না, যে কোনো ভূগর্ভ কক্ষের ক্ষেত্রেই এ-কথা প্রযোজ্য।
‘এ কথা বলার অর্থ?
‘অর্থ একটাই, দেওয়ালের গায়ে সোডার একটা আস্তরণ পড়ে যায়।
‘হ্যাঁ, তা অবশ্য সত্যি।’
‘এমন ঘরে থাকলে সর্দি লাগাটা অস্বাভাবিক নয়, বরং ঠাণ্ডা না-লাগাটাই অবাক হবার মতো কথা।
‘তা হোক গে তবু তুমি চল।
‘তবু যেতে হবে?’
‘অবশ্যই। আরে, সর্দি-কাশি তো একটা মামুলি ব্যাপার। অ্যামন্টিলাডো! তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, ঠকিয়েছে তোমাকে। আর এদিকে লুচেসির কথা বলছ তো? আরে বন্ধু, অ্যামন্টিলাডো আর শেরীর পার্থক্যটা সম্বন্ধেই তো তার কোনো ধারণা নেই।
ফর্চুনাটো কথা বলতে বলতে আচমকা আমার হাতটা চেপে ধরল। তাকে সঙ্গে করে আমার পালাজ্জোতে উপস্থিত হলাম। একটা আলখাল্লা তার গায়ে জড়ানো ছিল আর একটা কালো রেশমের মুখোশও লাগানো ছিল।
পালাজ্জোতে হাজির হয়ে দেখি দাস-দাসিরা কেউ-ই নেই। একেবারে সুনসান। দাস-দাসিরা মওকা বুঝে আনন্দ ফুর্তি করতে বেরিয়ে গেছে।
আসলে আমার জন্যই এমনটা হয়েছে। পালাজ্জো ছেড়ে যাবার সময় আমি তাদের বলে গিয়েছিলাম, আমি রাতে ফিরব না। ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে যাবে। তবে এও তো মিথ্যা নয়, পালাজ্জো ছেড়ে যাবার সময় আমি তো তাদের এ কথাও পই পই বলে করে বলে গিয়েছিলাম–ভুলেও যেন কেউ বাড়ি ছেড়ে কোথাও না যায়।
তারা তখন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে কি ভাবছিল বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম। আমি পালাজ্জো ছেড়ে যাবার সঙ্গে আমার এ নির্দেশেই তাদের বেপাত্তা হয়ে যাবার পক্ষে যথেষ্ট। কার্যতও তা-ই দেখা গেল।
আমি তাদের বাতিদান থেকে দুটো জ্বলন্ত মশাল উঠিয়ে নিলাম। একটা রাখলাম আমার হাতে আর দ্বিতীয়টা ফর্চুনাটোর দিকে বাড়িয়ে দিলাম। সে হাতবাড়িয়ে আমার কাছ থেকে মোমবাতিটা নিল।
এবার তাকে সঙ্গে করে আমি পর পর কয়েকটা ঘর পেরিয়ে ভূগর্ভ কক্ষের খিলানের তলায় নেমে গেলাম। লক্ষ্য করলাম, সে একটু আধটু ইতস্তত করলেও ধীর পায়ে ঠিক নেমে যেতে পারল।
এবার তাকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বললাম–‘খুব সাবধানে পা ফেলবে। পা ফেলার আগে মোমবাতির আলোয় জায়গাটা ভালো করে দেখে নিতে ভুলো না যেন। মনে রেখো, একটু অ-সাবধান হলেই পা হড়কে গিয়ে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বসবে।
‘হুম।’ সে প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল।
আমি এবার লম্বা ঘোরানো একটা সিঁড়ি-বেয়ে ধীর পায়ে নিচে নেমে গেলাম। সে ও মোমবাতির আলোর ওপর ভরসা রেখে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে ফেলে আমার পিছন পিছন নিচে নেমে গেল।
আমি অবশ্য প্রতি মুহূর্তেই তার ওপর নজর রেখে চলছিলাম।
আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, বন্ধুবরের পা দুটো টলছে। একটু আধটু এলোমেলো পা ফেলছে। তবে নিজেকে সামলে নেবার মতো হুশ তার মধ্যে অবশ্যই আছে।
আর বন্ধুবর প্রতিবার পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তার টুপির ঘণ্টা গুলো থেকে থেকে টুং টাং শব্দে বেজে উঠছে।
নিচে নেমে আমার পাশে গিয়ে দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে সে বলল–‘কি হে, পাইপটা?’
‘পাইপটার খোঁজ করছ?’
‘হ্যাঁ, সেটা কোথায়, দেখছি না তো?
‘আরও একটু এগিয়ে গেলে তোমার বাঞ্ছিত পাইপটার দেখা মিলবে।
‘হুম।
আমি এবার দেওয়ালের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললাম–‘ওই, ওই দেখ।
সে হাতের জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে কিছুটা ওপরে তুলে, অনুসন্ধিৎসু নজরে দেওয়ালের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে বলল–কী? কীসের কথা বলছ বন্ধু?
‘মোমবাতির আলো পড়ায় দেওয়ালের মাকড়শার সাদা জালগুলো কেমন চকচক করছে দেখ, যাকে বলে রীতিমত ঝিল্লা দিচ্ছে।
সে এবার দেওয়াল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল।
আমি লক্ষ্য করলাম–‘তার চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল আর নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছে।
আমি তার মুখের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধই রাখলাম।
আমি মুখ খোলার আগেই সে আচমকা বলে উঠল–একটা কথার জবাব দেবে। কী?
আমি স্লান হেসে বললাম কী? কী বলতে চাইছ?’
সে দুম করে বলে উঠল–‘সোরা কী, বল তো?
আমি জবাব দিলাম–‘হ্যাঁ-হ্যাঁ সোরা’
সে খুক খু্ক করে কাশতে লাগল।
আমি বললাম–‘কি হে, এমন খুকখুক করে কাশছ যে! তোমার কাশিটা করে থেকে হয়েছে, বল তো?
আমার বন্ধুবর নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েই রইল। আমি আবারও বললাম–এমন কাশিটা কবে থেকে হয়েছে?’ বেচারি বন্ধুবরের পক্ষে বেশ কয়েক মিনিট আমার প্রশ্নের জবাব দেওয়া সম্ভব হলো না। তারপর কাশতে কাশতেই জবাব দিল–ও কিছু না।
‘কিছু না, বলছ কি হে! কাশি যে একেবারে বুকে জেঁকে বসেছে!
‘হুম।
‘চল, ফিরেই যাওয়া যাক। আমি বেশ জোর দিয়েই বললাম।
সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আমার মুখের দিকে সবিস্ময়ে তাকাল। মুখে কিছুই বলল না।
আমি আগের মতোই জোর দিয়েই এবারও বললাম আমার একটা কথা শুনবে কি?
‘কী? এত ভনিতার কী আছে? কী বলবে, বলেই ফেল না।’
‘তোমার ফিরে যাওয়াই দরকার। কারণ, তোমার স্বাস্থ্যের দাম আমি অনেক, অনেক বেশি বলেই মনে করি।’
‘হুম।
‘কেন? মিথ্যে বলেছি? তুমি একজন বিত্তশালী, শ্রদ্ধাভাজন, প্রিয়জন, উচ্চ প্রশংসিত। আর তোমাকে আমি একজন সুখি ব্যক্তি বলেই মনে করি, এক সময় আমি ঠিক যেমনটি ছিলাম। তোমাকে হারাবার কথা তো আমি ভাবতেই পারি না বন্ধু।
