এ ফর্চুনাটো অন্য সবদিক থেকে আমার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র, সন্দেহ নেই। এমনকি ভয় ভীতির ব্যাপার-স্যাপার হলেও তার একটা দুর্বলতা ছিল।
মদের উৎকর্ষতা বিচারের দক্ষতা নিয়ে তার খুবই বড়াই ছিল। তার বিশ্বাস, তার মতো মদের ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা খুব কম লোকের রয়েছে। সত্যিকথা বলতে কি, ইতালিয়দের মধ্যে যথার্থ কলাবিদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সময় সুযোগমতো কাব্য কর্মে নিজেকে লিপ্ত রাখতেই তারা আগ্রহী নয়তো অস্ট্রিয় আর বৃটিশ ধনকুবেরদের সঙ্গে প্রবঞ্চণা করতে, মওকা পেলেই ঠকাতে বড়ই আগ্রহী।
ফর্টুনাটোর প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। সে চিত্রশিল্প বা স্বর্ণকার পেশা তার দেশবাসীদের মতোই একজন আনাড়ী ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু পুরনো মদের ভালো মন্দ বিচারের কাজে তার। নৈপুণ্য অবশ্যই লক্ষ্যণীয়। তবে এও সত্য যে, এ ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার খুব একটা মতপার্থক্য নেই। আমার কথা যদি জানতে চাওয়া হয় তবে বলব, ইতালিয় মদের ক্ষেত্রে আমিও একজন বড় সমঝদার–বিশেষ জ্ঞানের অধিকারী। আর একটু মওকা পেলেই আমি এ বস্তুটা যথেষ্ট পরিমাণে কিনে নিই। আর তা করি আমার নিজের বিচার বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে।
তখন শহর জুড়ে কার্নিভালো উৎসব বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে, পুরোদমে চলছে। হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার চলেছে চারদিকে। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা উৎসবে মাতোয়ারা।
এক উৎসবমুখর সন্ধ্যায়, সন্ধ্যায়-ঠিক নয়, সন্ধ্যার একটু আগে হঠাৎ বন্ধুবর ফর্চুনাটোর মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। সে একটু বেশি মাত্রায়ই অভ্যর্থনা জা নিয়ে বসল। আসলে মাত্রাতিরিক্ত তরল পদার্থ পেটে পড়ার জন্যই সে তার অভ্যর্থনা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না।
বন্ধুবরের গায়ে ভাঁড়ের পোশাক আশাক। তার গায়ের জামাটায় বহুবর্ণ আর চিত্রাবলীর একত্র সমাবেশ ঘটেছে। তার ওপর ডোরাকাটা তো রয়েছেই। মাথায় চাপিয়েছে কানওয়ালা উঁচু টুপি আর ঘণ্টা।
সত্যি বলছি, তার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হতেই আমার ভেতরটা খুশিতে রীতিমত চনমন নিয়ে উঠল। আনন্দ উচ্ছ্বাসে আমার বুকটা এমন ভরে উঠল যে, তার হাতটা ধরে মুচড়ে দেবার ভাবনাটাকে আমার মনে স্থান দেওয়াটা মোটেই সঙ্গত হয়নি। এমন অন্তহীন খুশির মেজাজে মাতোয়ারা অবস্থায় এমন একটা কাজের কথা ভাবা–ধৎ! অবশ্যই সঙ্গত হয়নি।
তার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হতেই করমর্দনের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মুখে স্বভাবসুলভ হাসি ফুটিয়ে তুলে বললাম–‘বন্ধু ফর্চুনাটো, নিতান্তই ভাগ্যের জোরে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।’
করমর্দন সারতে সারতে সে-ও হাসি হাসি মুখে ছোট্ট করে উচ্চারণ করল– আমারও ঠিক একই কথা বন্ধু।
‘তোমাকে আজ কী সুন্দরই না লাগছে!
‘হুম!’
‘সত্যি বলছি, অদ্ভুত দেখাচ্ছে তোমাকে! কিন্তু আমি একটা পাইপ—’
‘পাইপ?
‘হা, পাইপ। কিন্তু তারা বলছে, বস্তুটা নাকি অ্যামন্টিলাডোর।
‘অ্যামন্টিলাডোর?
‘তারা তো এরকমই বলছে। তবে আমার কিন্তু এতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে বন্ধু। কথাটাকে আমি মেনে নিতে মন থেকে উৎসাহ পাচ্ছি না।’
‘এ কি কথা! অ্যামন্টিলাডো?’
হ্যাঁ, বলছে তো তা-ই।
‘তাও আবার পাইপ? অসম্ভব, একেবারেই অবাস্তব কথা! অন্য সময় হলেও না হয় ভেবে দেখা যেত। তা-ও আবার কার্নিভালের মাঝখানে! অসম্ভব!
আমি বললাম–‘আমার মনেও তো একই সন্দেহ জেগেছে। কিন্তু আমি একটা। কাজ করে ফেলেছি বন্ধু।
‘কী? কী কাজ? কী ব্যাপার বল তো বন্ধু?
‘তোমার সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই আমি অ্যামন্টিলাডোকে পুরো দামটা মিটিয়ে দিয়েছি। তবে এর পিছনে কারণও ছিল বটে।
সে মুখের হাসির রেখাটুকু অব্যাহত রেখেই বলল–কারণ? কি সে কারণ, বল তো?’
‘কারণটা হচ্ছে, কয়দিন যাবৎ তোমার দেখাই পাচ্ছিলাম না। আবার এমন একটা ভালো জিনিস বেহাত হয়ে যাবার আশঙ্কাও কম ছিল না।
‘হুম্।
‘তাই তো তোমার সঙ্গে পরামর্শের জন্য সময় নিতে ভরসা হলো না।
‘অ্যামন্টিলাডো!’ ফর্চুনাটো সবিস্ময়ে বলল।
‘আমার কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
‘অ্যামন্টিলাডো!’
‘তাদের সন্তুষ্ট না করে যে উপায়ই নেই।
‘অ্যামন্টিলাডো!’
‘মনে হচ্ছে, তুমি ব্যস্ত আছ, তাই না?
‘হুম!’
‘আর আমিও লুচেসির কাছে চলেছি।’
‘তাই বুঝি?
‘হ্যাঁ। আমার বিশ্বাস, একমাত্র তার পক্ষেই ভালো-মন্দ বিচার করা সম্ভব। একবার গিয়ে তার কাছে প্রসঙ্গটা পেড়ে তো দেখি ফল কি হয়।
‘লুচেসি?’
‘হ্যাঁ, তার কথাই ভেবে রেখেছি।
‘আরে ধ্যুৎ!’
‘কেন? এ-কথা বলছ কেন?
‘আরে সে তো শেরী থেকে অ্যামন্টিলাডোর পার্থক্য কোথায় তা-ই তো বলতে পারে না।’
‘বোকাদের মতে কিন্তু তার রুচিজ্ঞান নাকি তোমার থেকে কম তো নয়ই, বরং সমান।
‘ঠিক আছে, এসব কথা নিয়ে অন্য সময় না হয় আলোচনা করা যাবে। এখন চল তো—’
‘কোথায়? কোথায় যেতে বলছ?’
‘তোমার নেশার ঘরে, অমৃত-গৃহে।
‘না, বন্ধু।
‘কেন? আপত্তি কীসের?’
‘আপত্তি একটাই, তোমার ভালোমানুষেমির সুযোগ নিতে আমি উৎসাহি নই, নেবও না। তোমার তো আবার একজনের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপার রয়েছে, তাই না? লুচেসি–তাই না?
‘না, কারো সঙ্গে দেখা করারই তেমন কোনো পরিকল্পনা আমার নেই?’
‘আরে, দেখা করতে আমি বলছি না বন্ধু। আর তোমার যা দশা তা-তো নিজের চোখেই আমি দেখছি, সর্দিতে তুমি একেবারে কাবু হয়ে পড়েছ।
