পণ্ডিতদের কথা মনের কোণে বার বার উঁকি দিতে লাগল।
তারা তো ঠিকই বলেছিলেন। এরকমটা যে ঘটবে তার পূর্বাভাস তো তারা আগেই দিয়ে রেখেছিলেন।
তারপর বুঝতে পারলাম, ধূমকেতু কিভাবে পৃথিবীকে গোত্তা মারবে–মাথায় হাঁড়ি চাপিয়ে, সেটা একদিন না একদিন পৃথিবীর সঙ্গে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে দেবে।
ব্যস, আর যাবে কোথায়, কথাটা চাউর হতেই পৃথিবীর মানুষ আতঙ্কে পৌণে মরা হয়ে যাবার জোগাড় হলো। আতঙ্কের যন্ত্রণায় তাদের মুখের রক্ত নিমষে নিঃশেষে কোথায় উবে গেল। মুখে আশ্রয় করল পাত্রতার ছাপ।
অব্যক্ত যন্ত্রণা নিরবচ্ছিন্নভাবে জনসাধারণের মধ্যে দুটো কারণে স্থায়ীভাবে আশ্রয় নিল। প্রথমত বুক, বিশেষ করে ফুসফুস ও তার ধারে কাছে খিচুনি শুরু হয়ে গেছে; আর দ্বিতীয়ত অসহনীয় উপায়ে চামড়া শুকিয়ে কুঁকড়ে যেতে শুরু করেছে। আসলে এর পরিণামের কথা কল্পনা করেই মানুষের মনে আতঙ্ক ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করেছে।
আমাদের তো ভালোই জানা আছে, যে সব উপাদানের সমন্বয়ে বাতাসের সৃষ্টি তাদের মধ্যে অক্সিজেনের উপস্থিতি শতকরা একশোভাগ আর নাইট্রোজেন ঊনআশি ভাগ। অক্সিজেন ছাড়া প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না আর আগুনও জ্বলতে পারে না। অর্থাৎ নাইট্রোজেনের পক্ষে প্রাণকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
আবার যদি অক্সিজেনের পরিমাণ অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায় তবে অতিরিক্ত জীবনীশক্তি মানুষকে উত্তাল-উদ্দাম আর মাতালে পরিণত করে ছাড়বে। তারপর আমরা ঠিক এমনটাই ঘটতে দেখেছি।
আর নাইট্রোজেন যদি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তবে? দুম করে প্রলয়কাণ্ড ঘটে যাবে, দাউ দাউ করে লেলিহান জিহ্বা বিস্তার করে চোখের পলকে পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলবে।
আমাদের অন্তিম মুহূর্তটাকে আমাদের চরমতম আতঙ্কের আধার মূর্তিমান ধূমকেতুর টকটকে লাল অগ্রসরমান আকৃতির প্রত্যক্ষ করলাম।
ঠিক একদিন পরই দুর্ভাগ্য চরমতম রূপ নিয়ে হাজির হলো। বায়ুর নির্দিষ্ট উপাদানগুলোর অতি দ্রুত পরিবর্তন ঘটতেই পৃথিবীর সর্বত্র, প্রতিটা আনাচে কানাচে অবস্থিত মানুষগুলোর রীতিমত নাভিশ্বাস শুরু হয়ে গেল। ধমনী ধমনীতে লাল রক্তের স্রোত দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে পড়ল।
মানুষের স্বভাবের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল। প্রত্যেকে ভয়াবহ প্রলাপে আচ্ছন্ন হয়ে প্রতিটা মুহূর্ত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল।
হাত দুটো কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে পড়ল। শক্তি যেন একেবারে কর্পূরের মতো উবে গেল। আড়ষ্ট হাত দুটোকে ওপরে, আকাশের লাল গোলকটার দিকে তুলে ধরলাম সত্য। কিন্তু নিষ্কৃতি পেলাম না কিছুতেই।
বেশিক্ষণ নয়, মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে, খুবই ম্লান বিষণ্ণ আলো চরাচর ছেয়ে ফেলল। আর সে স্লান আলো সবকিছুকে বিদীর্ণ করে দিয়ে গেল।
তারপর–হ্যাঁ তারপর মুহূর্তেই স্বয়ং ঈশ্বরই যেন তারস্বরে চিৎকার করে উঠলেন–সে রকম তীব্র আওয়াজ কেউ এর আগে কোনোদিন শুনতে পায়নি। ব্যস, তার পরমুহূর্তেই ইথারে সে আগুন ফেটে পড়ল, যে ইথারের মধ্যে আমাদের অস্তিত্ব বর্তমান। লেলিহান সে আগুনের শিখা বাস্তবিকই বর্ণনার অতীত। আর সেই শেষ, সব শেষ।
দ্য কাস্ক অব অ্যামন্টিলাডো
অস্ত্রাঘাত!
আমি ফর্চুনাটোর অগণিত অস্ত্রাঘাত বুক পেতে নিয়েছি, মুখ বুজে সহ্য করেছি। কিন্তু সে যখন আমাকে অপদস্ত করল তখন আর আমার পক্ষে ব্যাপারটা হজম করা সম্ভব হলো না, কিছুতেই না। আমি শপথ করে বললাম, এ অপমানের বদলা আমি নেবই নেব।
আমার স্বভাব সম্বন্ধে তোমাদের মধ্যে যাদের ভালো ধারণা রয়েছে তারা কিন্তু কিছুতেই ভেবে নিও না যে, সে শপথবাক্য আমি কেবলমাত্র মুখে উচ্চারণ করেই ক্ষান্ত থেকে ছিলাম।
না, সেটাকে অবশ্যই কেবলমাত্র মুখের কথাতেই আমি সীমাবদ্ধ রাখব বলে শপথ করিনি, সে রকম তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই।
অতএব বদলা আমি নেবই, আমাকে নিতেই হবে। আমি একেবারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। তবে সমস্যা হচ্ছে, কথাটা প্রচার করার ঝুঁকিও তো নেওয়া সম্ভব নয়।
আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শাস্তি আমি দেবই দেব। তবে সে কাজটা আমাকে করতে হবে খুবই সতর্কতার সঙ্গে, নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে নিয়ে তবেই। অর্থাৎ যখন নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পারব বলে মনে করব তখনই আমি শপথ পালনের কাজে হাত দেব। তবে আমি বদলা না নেওয়া পর্যন্ত কিছুতেই ক্ষান্ত হচ্ছি না।
আর একটা কথা, অপরাধি যদি পাল্টা বদলা নেবার জন্য তৎপর হয় তবে সে অপরাধের প্রতিকার হয় না। প্রতিকার করা সম্ভব নয়। কিন্তু সোজা কথা, বদলা আমি নেবই নেব।
অতএব ভেবে দেখতে হবে, কথার মাধ্যমে বা কাজে আমি ফর্চুনাটোকে এমন কোনো সুযোগই করে দেইনি যার ফলে আমার ওপর তার মনে কোনো সন্দেহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। আমার মনের জেদকে বাস্তব রূপ দিতে গিয়ে আমি কি না তাকেই সুযোগ করে দেব–আজব কথা তো।
আমার স্বভাবই কথায় কথায় হাসা। ফলে তাকে যখন যেখানেই দেখি, তখনই মুখে স্বভাবসুলভ হাসি ফুটিয়ে তুলি অর্থাৎ হেসে হেসে কথা বলি। সে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও অনুমান করতে পারে না যে আমার এ হাসিটা তাৎপর্যপূর্ণ। তাকে দেখে আমি হাসি এই কথা ভেবে, সে আমার হাতেই খতম হবে, তার ভবলীলা সাঙ্গ হবে।
