বহুদিন ধরেই ধুমকেতুগুলো গ্রহরাজ বৃহস্পতির আশপাশ দিয়ে আসা-যাওয়া করছে। প্রত্যেক ধূমকেতুর মাথা অর্থাৎ অগ্রভাগ আমাদের জানা সবচেয়ে বিরল গ্যাসের চেয়েও অনেক হালকা। একটা কথা আমার মাথায় কিছুতেই আসছে না
ইরোজকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই চারমিয়ান বলে উঠল–কী কোন্ কথা?
ইরোজ কপালের চামড়ায় চিন্তার ভাঁজ এঁকে বলে উঠল–কথাটা হচ্ছে, এতদিন বৃহস্পতি উপগ্রহদের কোনো ক্ষতিই যখন হয়নি তখন আমাদের এ পৃথিবীর ক্ষতি কীভাবে হতে পারে? আমার তো মনে হয় এরকম আশঙ্কার কোনো কারণই থাকতে পারে না।
জনগণের মন থেকে আতঙ্কের মেঘ কেটে গেল। তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
গির্জার মহামান্য ধর্মগুরুরা বাইবেল খুলে বসলেন। তারা সাধারণ মানুষকে বাইবেলের বাণী শোনাতে লাগলেন। ফায়দা কিন্তু কিছুই হলো না। জনসাধারণের মনে তারা ভীতি সঞ্চার করতে পারলেন না। তারা জোর প্রচার চালালেন–আগুনে পৃথিবী জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ধ্বংসের সাক্ষাদূত আগুনকে বয়ে নিয়ে আসবে।
চমৎকার! চমৎকার কথাই বটে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একটা কথা তো আবালবৃদ্ধবণিতারই জানা আছে।
চারমিয়ান অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করে বলে উঠল–কী? কীসের ইঙ্গিত দিতে চাইছ?
বলছি কি, ধুমকেতুর জঠরে যে আগুনের লেশমাত্রও নেই, এ-কথা তো একটা শিশুরও জানা আছে।
এবার কী বলছি শোন, ধূমকেতুর আবির্ভাব অশুভ লক্ষণ। তার আবির্ভাবে পৃথিবীর বুকে যে মড়ক লাগে তাতে কিছুমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। কেবলমাত্র মড়ক বা ঠিক হবে না, ঘোরতর যুদ্ধও বাঁধে পৃথিবীর বুকে। যা বলে বলুক গে না। যত্তসব কুসংস্কার। ওসব কুসংস্কারে কে-ই বা কান দিচ্ছে।
তবে কথা হচ্ছে, এমন অতিকায় একটা আকাশ-দৈত্য পৃথিবীর মাথার ওপর দিয়ে বহাল তবিয়তে পুচ্ছ নাচাতে নাচাতে দিব্যি চলে গেলে পৃথিবীর গায়ে কিছুটা অন্তত আঁচ তো লাগতেই পারে। আর এটাই তো স্বাভাবিক। পৃথিবীর বুকে যে পরিবর্তনটুকু দেখা যাবে তা হচ্ছে, যৎকিঞ্চিৎ ভৌগোলিক পরিবর্তন তো ঘটাই স্বাভাবিক, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিছু না কিছু হতেই পারে আর একই কারণে গাছগাছালির লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়াটাও কিছুমাত্র অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও একটা কথা জোর দিয়েই বলা চলে, পৃথিবীর বুকে যা-ই ঘটুক না কেন, বড় রকমের কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কিন্তু নেই। একটু-আধটু পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা তো বলামই।
এরকম বহু যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়েই ধূমকেতুর চেহারার পরিবর্তন ঘটে গেল। সবাই তার চেহারা সম্বন্ধে যা-কিছু ভেবেছিল, জল্পনা-কল্পনা করেছিল, বাস্তবে দেখা গেল সবই ভুল। সবাই নিজনিজ জ্ঞান-বুদ্ধি অনুযায়ী তার দৈহিক গড়নের যে বিবরণ এতদিন দিয়েছে, কার্যত দেখা গেল, তার চেহারার সঙ্গে সে সবের কিছুই মিলছে না। ধূমকেতুটা ক্রমেই এগিয়ে আসতে লাগল। সেটা যতই পীথবীর কাছাকাছি আসতে লাগল ঝাপসা ভাবটা কেটে গিয়ে ততই স্পষ্টতর হয়ে উঠতে লাগল। তার চেহারাটা সবার চোখের সামনে আরও বড় হয়ে উঠল। তার অতিকায় দেহটা চকচকে ঝকঝকে হয়ে উঠতে লাগল। ব্যাপারটা চাক্ষুষ করেই পৃথিবীর যত মানুষ, সবাই যেন কেমন মিইয়ে গেল। এমনটা হওয়া তো বিচিত্র কিছু নয়। এতদিনের ভাবনা চিন্তা জল্পনা কল্পনা যদি হঠাৎ করে এমন নস্যাৎ হয়ে যায় তবে তো স্বাভাবিকভাবেই তাদের মুখ ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে উঠতে বাধ্য।
ইতিপূর্বে পৃথিবীবাসী তো আরও বার কয়েক ধূমকেতুর আবির্ভাব চাক্ষুষ করেছে। কিন্তু আজকের ধুমকেতুটার সঙ্গে সেগুলোর সাদৃশ্য তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, সম্ভবও নয়। কারণ, এর আগে তো কোনো ধূমকেতু এমন বিশাল দেহ নিয়ে আমাদের চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করেনি।
এতদিন পৃথিবীর বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যত্তসব আজেবাজে মন্তব্য করে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে। যারা এরকম মন্তব্য করেছিলেন, তারা বর্তমানে ধূমকেতুটাকে চাক্ষুষ করে রীতিমত শিউরে উঠলেন।
ধ্বংসের সাক্ষাৎ অবতার বিচিত্র দেহধারী অতিকায় ও ভয়ঙ্কর ধূমকেতুটাকে চোখের সামনে দেখামাত্র তাদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া দ্রুততর হয়ে গেল। মস্তিষ্কের কন্দরে কন্দরে ঘোরতর কালো ছায়া দেখা দিল, ছেয়ে ফেলল।
উফ্! কী সর্বনাশা চেহারা রে বাবা! সবার মনই যারপরনাই বিষিয়ে উঠল। বড় রকমের একটা অঘটন যে ঘটতে চলেছে তাতে আর কারো মনে এতটুকু সন্দেহ রইল না। পৃথিবী তোলপাড় না হয়ে যাচ্ছে না। কারণ, অতি দ্রুত আগুনের অতিকায় গোলার রূপ নিয়েছে মহাকাশের বিভীষিকা। তার সুবিশাল দেহটা দিগন্ত জুড়ে লেলিহান অগ্নিশিখা ছড়িয়ে দিয়ে অনবরত দাপিয়ে চলেছে। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য!
এ জীবনটা রক্ষা পাবে নাকি, শেষ হয়ে যাবে, এরকম দোটানা মনোভাবটা একদিন কেটে যাওয়ায় মানসিক স্বস্তি ফিরে পেলাম।
একদিন নিঃসন্দেহ হলাম, আমরা ধূমকেতুর আওতায় এসে গেছি। মানসিক অস্থিরতা কেটে গিয়ে স্থিরতা ফিরে এলো। দেহ-মনে বল ফিরে পেলাম। মন থেকে জমাটবাধা আতঙ্ক কেটে যাওয়ায়, স্বস্তি ফিরে পাওয়ায় এবার সহজভাবেই লক্ষ্য করলাম গাছগাছালির মধ্যেও পরিবর্তন আসছে। গাছে গাছে সবুজপাতার এমন বিচিত্র সমারোহ এর আগে তো কোনোদিন নজরে পড়েনি। আর রঙ-বেরঙের ফুল, এতসব কুঁড়ির মেলা তো কোনোদিনই এর আগে দেখতে পারেনি। নিঃসন্দেহ হতে পারলাম, আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটতে আরম্ভ করেছে।
