ইরোজ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–ঠিকই বলেছ তুমি। প্রতিটা মানুষের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কথা আগে থেকে বিন্দু-বিসর্গও জানা সম্ভব হয়নি। তবে একটা কথা কিন্তু খুবই সত্য যে, মানুষের চরম দুর্গতি কিভাবে আসবে তা নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহুদিন আগেই যথেষ্ট হিসাব-নিকাশে মেতে ছিলেন, বহু তথ্যই দিয়ে গেছেন।
সত্য। শতকরা একশো ভাগ সত্য কথাই বলেছ।
তবে একটা কথা, চারমিয়ান, তুমি যখন আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে সরে এলে তখন থেকেই কিন্তু পণ্ডিতরা মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেছিলেন না।
কোন মতামতের কথা বলছ চারমিয়ান?
জ্ঞানীরা বলতে শুরু করেছিলেন, ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে পবিত্র গ্রন্থে যা-কিছু বলা আছে তা দেখছি এখন থেকে ফলতে শুরু হয়ে গেছে? ধ্বংসের আগুনে সৃষ্টি কি ধ্বংস হয়ে যাবে? সবকিছু কি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়েই যাবে? সে ভয়ঙ্কর আগুনটা লাগবে কিভাবে অর্থাৎ কোন উপায়ে যে পৃথিবীটা ধ্বংস হবে এ প্রসঙ্গে বড় বড় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জ্ঞান-বুদ্ধি আর বিচার-বিশ্লেষণ ক্ষমতার মধ্যেও প্রথমাবস্থা থেকেই ফাঁক থেকে গিয়েছিল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল, ধূমকেতুতে আগুনের ভয়-ভীতি নেই। সেগুলোর অর্থাৎ মহাকাশে অবস্থানরত সে সব বিভীষিকার মোটামুটি একটা ঘনত্ব হিসাব নিকাশের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছিল।
ধূমকেতুগুলো মহাকাশে বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহদের আশপাশ দিয়ে ধেয়ে যায় খুবই সত্য কিন্তু তারা অবশ্যই গ্রহ বা উপগ্রহগুলোর কারো চেহারায় কোনোই পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে যায় না। শুধু কি এ-ই? এমনকি তাদের কক্ষপথেরও পরিবর্তন ঘটানো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ধূমকেতুগুলো কি দিয়ে গঠিত, তাই না? তারা অবশ্যই বায়বীয় পদার্থের সম্বন্বয়ে গঠিত। তারা যদি আচমকা পৃথিবীকে ধাক্কা মারে, অর্থাৎ পৃথিবীর ওপর আছড়ে পড়ে তবে পৃথিবীর সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারবে না–এ বিশ্বাসই আমরা করেছিলাম।
তবে ধূমকেতু আর পৃথিবীর মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধতে পারে বা ধূমকেতু পৃথিবীর ওপর কোনোদিন হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে এরকম আশঙ্কা কোনোদিনই আমাদের মনে দানা বাঁধেনি।
কেন আমরা এরকম আশঙ্কার শিকার হইনি? এর কারণও রয়েছে অনেকই। কেন? কারণ, আমাদের তো জানাই ছিল, মহাকাশের ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলে পর্যটকদের শরীরটা কোন্ কোন্ মালমশলা দিয়ে তৈরি। তাদের পেটে যে আগুন তৈরির মাল মশলা থাকা সম্ভব এমন কোনো কথা আমাদের মনে কোনোদিনই জাগেনি। আর জাগবেই বা কি করে? আমরা এমন কোনো ব্যাপার যে নিতান্তই অসম্ভব ও অবাস্তব বলেই আমাদের ধারণা ছিল।
কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে দেখ। মানুষ বিস্মিত হতে, বিস্ময়ের ঘোরে ডুবে থাকতে পছন্দ করে। তারা অসম্ভব কিছুর কল্পনায় মজে থাকতেই সবচেয়ে বেশি আগ্রহি। তখন কী যে তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে গিয়েছিল তা আর বলার নয়। ধূমকেতু ধেয়ে আসছে খবরটা চাউর হয়ে যাওয়ামাত্র কিছুসংখ্যক মানুষ ভয়ে রীতিমত জড়সড় হয়ে গিয়েছিল খুবই সত্য। আর অধিকাংশ মানুষ অস্বাভাবিক উত্তেজনার শিকার হয়ে বুকভরা অবিশ্বাস নিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণে মেতে গিয়েছিল।
কাগজ-কলম নিয়ে জোর হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ফলাফলও তখনই নির্ণয় হয়ে গিয়েছিল। হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছিল, ধূমকেতুর আঁচ পৃথিবীর গায়ে কমবেশি লাগবেই লাগবে। দু-তিনজন দ্বিতীয় শ্রেণির জ্যোতির্বিজ্ঞানী মন্তব্য করেছিলেন, ওই ছন্নছাড়া বাউণ্ডুলেটা অভাগা পৃথিবীটাকে গোত্তা মারার জন্যই ধেয়ে আসছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে সংশয়ের অন্ত ছিল না। এর কারণও ছিল যথেষ্টই। কোন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সে হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে কতটুকু জানতে পেরেছেন–এটাই ছিল তাদের মনের দানা-বাঁধা সংশয়ের কারণ।
আর এ রকম সংশয় আর আতঙ্কের জন্যই সাধারণ মানুষ তেমন সন্ত্রস্ত হতে পারেনি। কেবলমাত্র অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে তারা দিন রাতের একটা বড় ভগ্নাংশই কাটিয়ে দিত।
পর পর সাত-আটটা দিন একই রকমভাবে আকাশ-পর্যবেক্ষণ পর্ব দারুণভাবে চলল। কিন্তু আতঙ্কের আঁধার সে ধূমকেতুটা আবছা ঘোলাটে ভাব নিয়ে দেখা দিয়ে আবার নজরের আড়ালে চলে গেছে। তার নিজের অংশটাও আবছা, ছায়া-ছায়া ভাবে দেখা গেছে। মাঝে-মধ্যে খুব সামান্যই রঙ পাল্টেছে।
ব্যাপারটা ওই রকমভাবে ঘটে যাওয়ার পর পণ্ডিতরা নড়ে চড়ে বসলেন। তারা আসল ব্যাপারটা ফাঁস করলেন। এবারই সাধারণ মানুষ জানতে ও বুঝতে পারল প্রকৃত ঘটনাটা কি ঘটতে চলেছে।
প্রকৃত ঘটনাটা সম্বন্ধে কিছু আঁচ পাওয়ার পরও কিন্তু প্রায় সবাই দো-মনা অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে লাগল, অর্থাৎ পণ্ডিতদের বক্তব্য বাস্তবরূপ পেতে পারে, আবার না-ও পেতে পারে।
দ্বিতীয় শ্রেণির পণ্ডিতরা হিসাব-নিকাশের ফলে গৃহীত যে সিদ্ধান্তের কথা ব্যক্ত করেছেন–ধুমকেতু আচমকা সংঘর্ষের ফলে পৃথিবীতে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে তছনছ করে দিতে পারে। সাধারণ মানুষ কিন্তু এ-ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর আদৌ তেমন আস্থা রাখতে পারেনি।
দ্বিতীয় শ্রেণির পণ্ডিতদের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর আস্থা রাতে না পারার কারণ ছিল, প্রথম সারি পণ্ডিতরা যুক্তির মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, এমন একটা অসম্ভব ব্যাপার ঘটা সম্ভব নয়–কিছুতেই নয়।
