ইরোজ বার কয়েক এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল–কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে না যে, আমি স্বপ্নে বিভোর হয়ে রয়েছি।
না, এখন আর স্বপ্ন বলে কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। এখন শুধুই রহস্য আর রহস্য। তোমার মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব বর্তমান, যুক্তির উপস্থিতি দেখে আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে, তা আর বলার নয়! তোমার চোখের ওপরের ছায়ার আস্তরণ অপসারিত হয়ে গেছে। মনকে শক্ত কর, জোর আন আর মন থেকে ভয়-ডরকে দূরে সরিয়ে দাও ইরোজ। এতদিন তুমি গভীর ঘোরের মধ্যে ছিলে, তোমার ভাগে যে দিন কয়টা ভাগে পড়েছিল, এখন আর সে অবস্থা নেই। তোমাকে কাল দীক্ষা দিয়ে তৈরি করে নেব।
দীক্ষা!
হ্যাঁ, দীক্ষা। তোমার মধ্যে যে আশ্চর্য অস্তিত্ব বর্তমান–কেবলই আনন্দ আর বিস্ময়।
দেখ, যাকে তুমি ঘোর বলছ, তা আমার মধ্য থেকে কেটে গেছে। আগেকার সে জমাটবাধা ভয়ঙ্কর অন্ধকারও বিদায় নিয়েছে। দুর্বলতাও আর নেই। ভয়ঙ্কর আওয়াজটাও আর শুনতে পাচ্ছি না। তবুও যেন সবকিছু কেমন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে, ঘুলিয়ে যাচ্ছে। আমার এ-নতুন অস্তিত্বের ক্ষীণ উপলব্ধি আমার ভেতরে যেন প্রতিনিয়ত সূঁচ ফুটিয়ে চলেছে।
চারমিয়ান ক্ষীন হেসে বলল–শোন, মাত্র দিন কয়েকের মামলা। কয়েকদিন এরকম হবার পর সবকিছু কেটে গিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তুমি এখন কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছ, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। ওই একই অবস্থায় আমিও ছিলাম। কবে? কতদিন আগে? পৃথিবীর হিসাব অনুযায়ী দশ বছর আগেকার কথা। আজও কিন্তু আমার সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে। তবে একটা কথা কিন্তু খুবই সত্য যে, দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করতে পেরেছ বলেই তোমার পক্ষে এখানে আসা সম্ভব হয়েছে।
ইরোজ সবিস্ময়ে বলল, এখানে! এখানে বলতে তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই চারমিয়ান বলে উঠল–এ জায়গাটার নাম আইদেন।
কি বললে, আইদেন!
হ্যাঁ, এটা তো আইদেন নামেই পরিচিত।
আইদেন! আমার সবকিছু কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, চারমিয়ান। সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। জানার জগতে অজানা আধিপত্য বিস্তার করছে। রহস্যময় ভবিষ্যৎ এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে আনন্দঘন নিশ্চিত বর্তমানে। অসহ্য! রীতিমত অসহনীয় ব্যাপার।
কেন? এ কথা বলছ কেন? অসহ্য কেন?
এত বোঝা সইতে পারা আমার পক্ষে নিতান্তই অসহনীয় হয়ে পড়েছে চারমিয়ান।
আমার কথা শোন ইরোজ–
তাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই ইরোজ বলে উঠল–কী? কোন কথা?
তুমি এসব অবান্তর ভাবনা-চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। এপ্রসঙ্গে তোমার সঙ্গে কাল কথা বলব–আজ নয়।
কেন? কাল কেন? আজ নয় কেন?
কারণ, আজ তোমার মন বড়ই চঞ্চল। আজ কেবলমাত্র স্মৃতিমন্থন করে যাও, তবেই মনে স্বস্তি আসবে, শান্তি পাবে। আর দেখবে উত্তেজনা প্রশমিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর একটা কথা–।
কী? কীসের কথা বলতে চাইছ?
ভুলেও যেন এদিক-ওদিক তাকাতে চেষ্টা কোরো না। এমনকি সামনেও তাকাবে না। কেবলমাত্র পিছনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখ। আমি কিন্তু তোমার মুখ থেকেই মহাপ্রলয়ের ভয়ঙ্কর ঘটনাটার খুঁটিনাটি বিবরণ শুনতে চাই। যার ফলে তোমাকে এখানে আসতে হয়েছে। হাজির হয়েছ আমাদের সবার মাঝখানে। ইরোজ, কোনো দ্বিধা না করে আমার কাছে সবকিছু খোলসা করে বলো। পিছনে ফেলে-আসা পৃথিবীর চেনা-জানা ভাষা আর ভঙ্গিতে কথা বল, যে পৃথিবী ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে চিরদিনের মতোই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সে পৃথিবীর কথা শোনাও যা আর না শোনাও তাই। ইরোজ, যে পৃথিবীর ভাষার মাধ্যমে তুমি আমার কাছে সব বৃত্তান্ত খুলে বলো।
প্রলয়,মহাপ্রলয়ই বটে। আর লোমহর্ষক ব্যাপার-স্যাপারই বটে। গায়ের হিম হয়ে যাওয়ার মতো মহাপ্রলয়ঙ্কর কাণ্ড! সে কী স্বপ্ন, না কী সত্যি।
সত্যি হলেও তা কিন্তু পুরোপুরি স্বপ্নেরই মতো। তবে এখন কিন্তু সে-স্বপ্ন টুটে গেছে ইরোজ। একটা কথা ভালো করে ভেবে বল তো।
কী? কোন কথা
আমাকে দেখে তোমার কি মনে হয় আমি দুঃখ-যন্ত্রণায় দগ্ধ হচ্ছি? ভালো করে ভেবে বল তো, তাই মনে হয় কী?
এখন তা মনে হচ্ছে না সত্য। কিন্তু শেষের সেদিনের কথা খুব বেশি করে আর ভীষণভাবে মনে পড়ছে চারমিয়ান।
কোন ব্যাপারটার ইঙ্গিত দিচ্ছ বলতো ইরোজ?
শোক তাপের জমাটবাধা ঘন কালো মেঘের আস্তরণ তোমার বাড়ির মাথায় তখন ভেসে বেড়াচ্ছিল!
কেবলমাত্র শেষের সে দিনটার কথাই বা বলছ কেন ইরোজ? সব শেষের যে ভয়ঙ্কর মুহূর্তটার কথা খুলে বলে নিজের মনকে হালকা কর। পৃথিবী জুড়ে রীতিমত প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড, মহাপ্রলয়ের মহা বিপর্যয় উলঙ্গনাচ পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল। ব্যস, একুটুই কেবলমাত্র এটুকই আজ মনে আছে। তারপর কি কি ঘটনা ঘটেছিল, কিছুই স্মৃতির পটে আনতে পারছি না।
তবু বলছি, চেষ্টা কর, চেষ্টা করে দেখ কিছু স্মৃতিতে আনতে পার, কি না।
খুবই অস্পষ্টভাবে হলেও মনে পড়ছে, পৃথিবীর মানুষ জাতটা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে কবরের অন্ধকার অতলগহ্বরে। তখন যে কী দুর্ভোগ, কী অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেছিলাম যা তোমাকেও দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হয়েছে, তার জন্য মোটেই মনের দিক থেকে তিলমাত্রও তৈরি ছিলাম না। যে সব দুর্ভোগকে কোনোরকম পূর্বজ্ঞান দিয়ে কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয়। অথচ ভবিষ্যতের কথা বলার সামান্যতম জ্ঞানও আমার ছিল না।
