তা সত্ত্বেও সে তরুণী ছিল স্বভাবতই বিনম্ৰা বিনয়ী, বিশ্বস্ততার প্রতিমূর্তি। তাই তো সে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধীর-স্থিরভাবে চিত্রালয়ের অন্ধকার ঘরে বসে থেকেছে। যেখানে ইজেলের সঙ্গে সাঁটা ক্যানভাসের গায়ে, তার মাথার ওপর থেকে আলোকচ্ছটা ঠিকড়ে পড়ে।
এমন একটা মন না-চাওয়া পরিবেশে, নিজের ইচ্ছার সম্পূর্ণ বিরোধী কাজের মধ্যে সে জোর করে নিজেকে লিপ্ত রেখেছে।
চিত্রশিল্পী কিন্তু তার নিজের কাজে মগ্ন আর আত্ম-প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন সে কাজের মধ্যেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখে আর থেকে থেকে বিভিন্ন বিস্ময়সূচক শব্দ উচ্চারণ করে নিজের কাজের বাহবা দেয়। ব্যস, এর বেশি কোনো কথা নয়।
সত্যি কথা বলতে কি, চিত্রশিল্পী যথার্থই এক বিচিত্র প্রকৃতির মানুষ। তার কথা সংক্ষেপে বলতে গেলে অসংযত প্রকৃতির, আবেগপ্রবণ আর রীতিমত মেজাজি মানুষ। নিজেকে নিয়ে, নিজের স্বপ্নের মধ্যেই সর্বদা আত্মমগ্ন থাকে।
চিত্রশিল্পী নিজের কাজ নিয়ে সর্বক্ষণ এমনই মজে থাকত যে, ভুলেও সে মুহূর্তের জন্য চোখ ফিরিয়ে দেখত না যে, সে নির্জন ঘরে সে ভৌতিক আলোর রেখাটা এসে পড়ে তার স্পর্শ লেগে নববধূর শরীর আর মন দুই শুকোতে শুকোতে কুঁকড়ে যাচ্ছে। তার চোখ ও মন যে সম্পূর্ণরূপে ক্যানভাসের গায়েই আটকা পড়ে গেছে।
নববধূর শরীরের ক্রমোবনতি আর শুকিয়ে-যাওয়া মনের ব্যাপারটা সবার চোখেই ধরা পড়েছে, একমাত্র চিত্রশিল্পীর উদাসীন চোখ দুটো ছাড়া।
এত অবহেলা সহ্য করেও তরুণী নববধূ কোনোরকম প্রতিবাদ, এমনকি সামান্যতম অভিযোগ পর্যন্ত না করে মুখে হাসির ছোপ অব্যাহত রেখে একের পর এক দিন কাটাতে লাগল। এর কারণ রয়েছে যথেষ্টই। কারণ, সে তো নিজের চোখেই দেখত তার চিত্রশিল্পী স্বামী দেবতাটি তার নিজের কাজ, রক্ত-তুলি নিয়ে মেতে থেকেই পরম আনন্দ পায়। তার রূপসি তম্বী মনোরমা সহধর্মিনীর রূপ ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
অথচ সে প্রেয়সীটি দিনে দিনে দেহ-মনের দিক থেকে শুকিয়ে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।
অথচ এক তিল বাড়িয়ে না বললে, যারাই ইজেলের গায়ে সাঁটা প্রতিকৃতিটিকে দেখে, তারা শিল্পী আর শিল্পকর্মটির প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখে প্রশংসা শুরু করে দিচ্ছে।
সবাই আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বলে এই প্রতিকৃতিটি যেমন চিত্রশিল্পীর শিল্পনৈপুণ্যের পরিচয় বহন করছে, ঠিক তেমনই প্রেয়সীর প্রতি তার গভীর প্রেম প্রীতির সাক্ষদানও করছে। সহধর্মিনীর প্রতি ভালোবাসা গভীর না হলে এমন একটা অনিন্দ্য সুন্দর চিত্র রঙ-তুলির মাধ্যমে কিছুতেই ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
কিন্তু শেষমেশ যখন চিত্রশিল্পীর সব প্রয়াস ও শ্রম পরিণতির দুয়ারে প্রায় পৌঁছে গেল, সে মুহূর্ত থেকে কাউকেই চিত্রালয়ের সে ঘরটায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলো না। কেন? কারণ, কাজের নেশা চিত্রশিল্পীর মধ্যে চরমভাবে চেপে বসেছে। কাজ, কাজ করে সে প্রায় উন্মাদদশায় পৌঁছে গেছে।
কাজ! কাজ! আর কাজ! ক্যানভাসের গা থেকে চোখ সরাবার ফুরসৎ বা ইচ্ছা। কোনোটাই যে তার নেই। সর্বক্ষণ ক্যানভাসটার ওপরেই সে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। অন্য কারো দিকে তাকাবার কথা তো সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। এমনকি স্ত্রীর মুখের দিকেও মুহূর্তের জন্য চোখ ফেরায় না। এমনকি ক্যানভাসের ওপর সে যে রঙের প্রলেপ দিয়েছে তা-ও যে রূপসি তীর রক্ত-রাঙা গাল দুটো থেকে নেওয়া তা দেখতেও সে এ মুহূর্তে নিতান্ত অনাগ্রহী।
এভাবে রঙ, তুলি আর ক্যানভাস নিয়ে যখন বেশ কয়েক সপ্তাহ গড়িয়ে গেল, শিল্পকর্মটা শেষ হতে আর সামান্যই অবশিষ্ট, কেবলমাত্র সুন্দর মুখটার ওপর মাত্র একটা তুলির টান, আর চোখের ওপর সামান্য একটু রঙ তুললেই কাজটা শেষ হয়ে যায়–ঠিক তখনই গরম তেলে পানির ছিটা পড়ার মতোই রূপসি তরুণী মনের দশা সইতে না পেরে ছ্যাৎ করে উঠল।
আর ঠিক তখনই…চিত্রশিল্পী ক্যানভাসটার গায়ে তুলিটা বুলিয়ে দিল। রঙের প্রলেপটা দিয়ে দিল। আর মুহূর্তের জন্য নিজের তুলির টানে ফুটিয়ে তোলা শিল্প কর্মটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল।নিশ্চল নিথর পাথরের মূর্তির মতো সে দাঁড়িয়েই থাকল কয়েক মুহূর্ত ধরে।
কিন্তু তারপর। পরমুহূর্তে, পাথরের মূর্তির মতো অটল অনড়ভাবে দাঁড়িয়েনিস্পলক চোখে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই তার সর্বাঙ্গ তির তির করে কাঁপতে লাগল। চকের মতোই ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে গেল তার মুখটা। পরমুহূর্তেই গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল–এটাই, এটাই তো জীবন।
অকস্মাৎ যন্ত্রচালিতের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে তার প্রেয়সীর দিকে তাকাল, তার প্রাণবায়ু তখন দেহ ছেড়ে গেছে, সে মৃত।
দ্য কনভারসেসন অব ইরোজ অ্যান্ড চারমিয়ান
ইরোজ বলল–আমাকে কেন ইরোজ নামে সম্বোধন করছ?
চারমিয়ান বলল–হ্যাঁ, এখন থেকে তোমাকে এ নামেই সম্বোধন করা হবে। মনে কর, তোমার ফেলে-আসা পৃথিবীর নামটা হারিয়ে গেছে। আমি নিজের যেমন পৃথিবীর নামটাকে ভুলে যেতে আগ্রহি, তোমাকেও তাই করতে হবে। শোন, এখন থেকে আমার নাম হবে, চারমিয়ান। এ নামেই আমাকে সম্বোধন করবে, বুঝলে।
