কয়েকমুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার ধীরে ধীরে চোখ দুটো মেলোম। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের কোণে টাঙিয়ে রাখা ওই প্রতিকৃতিটার ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম।
আমার মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী ওই প্রতিকৃতিটাকে যে আমি খুব ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছি, অস্বীকার করার উপায় নেই, করতে চেষ্টাও করব না।
সত্যি কথা বলতে কি, ছবিটার ক্যানভাসের গায়ে মোমবাতির সাদা আলো প্রথম পতিত হওয়ামাত্র সে স্বপ্নজনিত অসাড়তা যা আমার ইন্দ্রিয়গুলোকে অবশ,নিষ্ক্রীয় করে ফেলেছিল, তা নিঃশেষে উবে গেল। আচমকা একটা হোঁচট খেয়ে আমি যেন সম্পূর্ণ সংজ্ঞা ফিরে পেলাম,নিদ্রার ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠলাম। সংক্ষেপে বলতে গেলে, হারিয়ে যাওয়া আমাকে যেন আবার আমার মধ্যে ফিরে পেলাম।
আমি আগেই বলেছি, ঘরের কোণে টাঙানো প্রতিকৃতিটা এক উদ্ভিন্ন যৌবন রূপসির। পূর্ণাবয়ব নয়, দেহের কেবলমাত্র মাথা থেকে কাঁধ পর্যন্ত। আর তা আঁকা হয়েছে ফল আর লতাপাতাসহ অঙ্কন-কৌশলে। আর একটু খোলসা করে বললে হয়তো আমার বক্তব্যটা অধিকতর সহজবোধ্য হতে পারে–মালি যে মস্তক অঙ্কন পদ্ধতি অবলম্বন করে ছবি আঁকেন এক্ষেত্রে সে পদ্ধতিই অনুকরণ করা হয়েছে।
প্রতিকৃতিটার বক্ষ, বাহু দুটো আর অত্যুজ্জ্বল ও দীর্ঘ কেশগুচ্ছের অগ্রভাগ প্রভৃতি অঙ্কন-শৈলীর নৈপুণ্যবশত বড়ই চমৎকারভাবে ফুল আর লতাপাতার ছায়াছায়া পরিবেশের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়েছে। আর তার ফ্রেমটা ডিম্বাকৃতি। তার চারদিকে মুরজাতির শিল্পকীর্তিতে সুদৃশ্য করে তোলা হয়েছে। শিল্পকলার কথা বিচার করলে স্বীকার করতেই হয়, ছবিটার চেয়ে ফ্রেমটা অধিকতর মন জয় করার ক্ষমতা রাখে। সত্যি সেটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে আর চোখ ফেরানো দায়।
কিন্তু আমি যে অকস্মাৎ বিস্ময় বোধ করেছি তা কিন্তু মোটেই ছবিটার শিল্পনৈপুণ্য বা ফ্রেমটার মনলোভা কারুকার্য কোনোটারই কারণে নয়। এমনকি মুখটার সৌন্দর্যতা আমাকে এতখানি প্রভাবিত করতে পারেনি।
তবে? তবে কেন আমার মধ্যে এমন আকস্মিক ভাবান্তর ঘটেছিল, তাই না? আবার এমন কথাও তো বলা যাবে না, আমার কল্পনাই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে উঠে প্রতিকৃতিটাকেই একটা প্রাণবন্ত মানুষ ভেবে ভুল করছি। না, এমন কথা বলা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।
আমি ওই বিশেষ প্রতিকৃতিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই অনেকক্ষণ, প্রায় একটা ঘণ্টা কাটিয়ে ছিলাম। তবে একই অবস্থায় নয়। কখন বিছানার ওপর বসে, কখনও আধ-শোয়া অবস্থায় আবার কখনও বা মেঝেতে দাঁড়িয়ে প্রতিকৃতিটাকে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। শেষমেশ এক সময় প্রতিকৃতিটার দিকে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে থাকার ফলাফলের গোপন কারণটা বুঝতে পেরে আমার মনে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। আমি আনন্দে ডগমগ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আগেকার সে। বিস্ময়ানুভূতি এখন আমার মধ্য থেকে নিঃশেষে উবে গেছে।
প্র্তিকৃতিটার মধ্যে আত্মগোপনকারী প্রকৃতরহস্যটা কী তা যদি বলতে হয় তবে সংক্ষেপে যা বলা সম্ভব তা হচ্ছে, ছবিটার প্রাণময়তা। আর এ বিশেষ গুণটুকুই প্রথমে আমাকে বিস্ময়ে অভিভূত করে ফেলে। আবার আতঙ্কও কম সঞ্চার করেনি। সব মিলে আমাকে একেবারে কুপোকাৎ করে দেবার জোগাড় করেছিল।
ভীতির সঙ্গেই বাতিদানটাকে তুলে নিয়ে আবার আগের জায়গাতেই রেখে দিলাম। আমার চরম উত্তেজনার উৎসটাকে এভাবে নজরের আড়ালে রেখে দিয়ে আমি পুরোপুরি স্বস্তি লাভ করলাম। বালিশের ওপর থেকে চটি বইটাকে আবার তুলে নিলাম।
আমি মনকে নিয়োগ করলাম এসব ছবি আর তাদের অতীত-কাহিনী সমৃদ্ধ বইটার পাতায়।
সূচিপত্র দেখে ডিম্বাকৃতি প্রতিকৃতিটার সংখ্যা খুঁজে বের করলাম। পাতা উলটে নিচের এ অংশটায় প্রতিকৃতিটার সংখ্যা খুঁজে বের করলাম। পাতা উলটে নিচের এ
অংশটায় গভীর মনযোগের সঙ্গে চোখের মণি দুটোকে বুলাতে লাগলাম–
‘সে ছিল একজন যথার্থই রূপসি কুমারী কন্যা। তার রূপ-সৌন্দর্য যতটা ছিল সে তার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি আনন্দময়ী ছিল।
এক অশুভক্ষণে এক চিত্রশিল্পীর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছিল। তাকে মন-প্রাণ সঁপে ভালোবেসেছিল। শেষপর্যন্ত তাকে বিয়েও করেছিল। সে চিত্রশিল্পী ছিল বড় আবেগপ্রবণ, গম্ভীর আর পরিশ্রমীও বটে। আর সে ইতিমধ্যেই চিত্রশিল্পকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। আর সে রূপসি তম্বী যুবতি? সে ছিল একেবারেই বিরল এক রূপের আকর–এক কুমারী।
সে রূপসি যুবতি যত না সুদর্শনা তার চেয়ে বেশি আনন্দে পরিপূর্ণা। তার মুখে কেবলই আলোকচ্ছটার মতো হাসির ঝিলিক সর্বক্ষণ লেগেই থাকে। আর? ছোট্ট হরিণ শিশুর মতোই সে চঞ্চলাও বটে। সবকিছুর প্রতিই তার আন্তরিক আকর্ষণ রয়েছে। ভালোবাসে–তবে কেবলমাত্র তার প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পকলাকে চরম বিতৃষ্ণার সঙ্গে দেখে, ঘৃণা করে। আর চিত্রশিল্পীর তুলি, রঙের পাত্র, রঙ আর অন্যান্য সরঞ্জামগুলোকে দু চোখ পেতে দেখতে পারে না, যারা তাকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করেছে প্রিয়-দর্শন সুখ আর আনন্দ থেকে।
তাই তো যেদিন চিত্রশিল্পী তার কাছে নিজের বাসনার কথা ব্যক্ত করল–রূপসি তষী তরুণী বধূটির প্রতিকৃতি রঙ আর তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসের গায়ে ফুটিয়ে তুলতে আগ্রহী, সেদিন অন্তরের অন্তঃস্থলে তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করল, যারপরনাই মর্মাহত হল।
