বাড়িটার ভেতরে ঢুকে বাছাবাছি করে ছোট একটা ঘর আমরা বাস করার জন্য বেছে নিলাম। ঘরটায় খুবই সামান্য আসবাবপত্রও সাজানো রয়েছে দেখলাম। ভাবলাম, এতেই দিন কয়েক দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যাবে। অতএব আমরা তাতেই মাথা গুঁজলাম।
আমাদের মাথা গোঁজার ঘরটা বাড়িটার একান্তে–একেবারে এক কোণে অবস্থিত আর একটা বুরুজের তলায়।
ঘরের ভেতরে যে সরঞ্জাম আছে সেগুলোর সংখ্যা তেমন বেশি না হলেও দেখেশুনে খুবই মূল্যবান বলেই মনে হল। দেওয়ালে একটা সুদৃশ্য পর্দা ঝুলছে। তাতে যুদ্ধজয়ের হরেকরকম স্মারক সযত্নে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও আছে অত্যাধুনিক অগণিত ছবি, বহুমূল্য সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো। সব মিলিয়ে বহুমূল্যই বটে।
ছবিগুলো কেবলমাত্র সামনের দেওয়ালেই নয়, ঘরটার কোণাগুলোতেও বেশ কয়েকটা খুবই নিপুণ-হাতে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। তবে এমনও হতে পারে, আমার অসুস্থতার প্রাথমিক প্রলাপের অবস্থার জন্যই সে ছবিগুলোর প্রতি আমার আকর্ষণ একটু বেশি মাত্রায়ই হয়। একের পর এক ছবি দেখে আমি ক্রমেই মুগ্ধ হয়ে উঠতে লাগলাম।
ঘরটার চারদিকে বার-কয়েক চোখের মণি দুটোকে বুলিয়ে নিয়ে ভাবে গদগদ হয়ে আমি খানসামা পেড্রোকে কাছে ডাকলাম।
পেড্রো ঘর গোছানো আর বিছানাপত্র গোছ করতে ব্যস্ত। আমার ডাক শুনে হাতের কাজ ফেলে দৌড়ে এসে আদেশের অপেক্ষায় সামনে দাঁড়াল।
আমি তাকে হুকুম দিলাম–‘ওসব কাজ পড়ে হবে, আগে ঘরের খড়খড়িগুলো টেনে নামিয়ে দাও।
পেড্রো আমার এরকম জরুরি হুকুমের উদ্দেশ্য বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আমার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আমি তার গড়িমসির ব্যাপারে কোনো কথা না বলে বরং মুচকি হেসেই বললাম–‘আরে দেখতে পাচ্ছ না, বাইরে কেমন রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
পেড্রো এবার জানালার দিকে এগিয়ে গেল। টানাটানি করে সব কয়টা জানালার খড়খড়ি নামিয়ে দিল।
আমি বললাম–এবার বিছানার কাছের লম্বা-লম্বা বাতিদানের সব কয়টা মোমবাতি জ্বেলে দাও। তারপর বিছানার ওপরের কুচি-দেওয়া ভেলভেটের মশারিটার দড়িগুলো খুলে ওটাকে ভাঁজ করে একপাশে রেখে দাও।
পেড্রো নিতান্ত অনুগতের মতো ব্যস্ত-হাতে মিনিট কয়েকের মধ্যেই আমার নির্দেশিত কাজগুলো এক করে সেরে ফেলল।
এমন প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক, এসব কাজ সেরে ফেলার জন্য আমি কেন খানসামা পেড্রোকে তাড়া দিলাম, তাই না? আসলে আমি ঘরটায় পা দিয়েই ছবিগুলোকে দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে পড়ি যে,নিদ্রাদেবীর হাতে যদি নিজেকে সঁপে দেওয়া সম্ভব না হয় তবে অন্তত ছবিগুলোকে দেখে, আর বিছানায় মাথার কাছে যে চটি বইটায় ছবিগুলোর পরিচয় ও বিবরণাদি লেখা রয়েছে তার ওপর চোখ বুলিয়েই যেন সারাটা রাত কাটিয়ে দিতে পারি। এ রকম ভেবে আমি অন্তত রাত কাটানোর ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারলাম।
রাতে যৎসামান্য আহারাদি সেরে আমি বিছানা আশ্রয় করলাম।
আর খানসামা পেড্রো আহারাদির পর বাসনপত্র গোছগাছ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক কাজকর্ম মিটিয়ে শুয়ে পড়ল।
আমি বিছানা আশ্রয় করে বালিশের ওপর থেকে চটি বইটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। দীর্ঘ সময় একের পর এক পাতা উলটে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়তে লাগলাম।
কয়েক পাতা পড়ে বইটা ভাঁজ করে হাতে রেখে দেওয়ালে-টাঙানো ছবিগুলোর দিকে চোখ ফেরালাম। গভীর মনোযোগ আর শ্রদ্ধার সঙ্গে এক-এক করে সব কয়টা ছবিই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম।
সত্যি, সময় যে কীভাবে কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। অস্বীকার করার উপায় নেই; আমি একাকীত্ব বোধ তো করলামই না বরং খুবই ভালোভাবে সময় কেটে যেতে লাগল।
এক সময় মাঝ-রাত হয়ে এলো।
বাতিদানটা আমার বিছানা থেকে সামান্য দূরে রয়েছে। খানসামা পেড্রোর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। সে ঘুমে বিভোর। ডাকাডাকি করে ঘুম ভাঙিয়ে তাকে বিরক্ত করতে মন চাইল না। ফলে বাধ্য হয়েই বেশ কসরৎ করে হাত বাড়িয়ে সেটাকে টেনে এমন জায়গায় নিয়ে নিলাম যাতে মোমবাতির সবটুকু আলোই আমার বইটার ওপর পড়তে পারে। সেটা যেখানে রয়েছে সেখান থেকে সম্পূর্ণ আলো আমার হাতের বইটার পাতায় পৌঁছাতে পারে না। ফলে অসুবিধা তো একটু-আধটু হচ্ছিলই।
আরে ব্যস! বাতিদানিটা এগিয়ে নিয়ে আসার ফল যে এমন ভয়ঙ্কর হতে পারে তা কিন্তু আমি ঘৃণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি। সত্যি, একেবারেই অভাবনীয় ব্যাপার। খাটের একটা মশারি খাটাবার দণ্ডের ছায়ায় ঘরটার একটা কোণ এতক্ষণ আবছা অন্ধকারে ঢাকা ছিল। বাতিদানিটাকে স্থানান্তরিত করার ফলে অন্ধকার যে-কোণাটায় এবার আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ল।
এতক্ষণ যে-ছবিটা আমার নজরের বাইরে ছিল এমন আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ায় সেটা স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়ল। সেটা এক উদ্ভিন্ন যৌবনা এক রূপসির প্রতিকৃতি।
ছবিটার ওপর মুহূর্তের জন্য চোখের মণি দুটো বুলিয়ে নিয়েই যন্ত্রচালিতের মতো ঝট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। আর সর্বাঙ্গে কেমন যেন অবাঞ্ছিত শিহরণ খেলে গেল। ঘাড়ের কাছ থেকে একটা হিমেল স্রোত দ্রুত শিরদাঁড়া-বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এলো।
কেন যে আমার মধ্যে এমন অভাবনীয় ভাবান্তর ঘটে গেল তা আমি নিজেই নিশ্চিত করে বলতে পারব না। চোখ দুটো বন্ধ করে আমি তো মনে মনে আমার এমন আকস্মিক ভাবান্তরের কারণটাই খুঁজতে লাগলাম। আমি যাতে ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা ভাবনায় লিপ্ত হবার অবসর পাই, নিঃসন্দেহ হতে পারি যে, আমার চোখ দুটো আমার সঙ্গে প্রতারণা করেনি। কারণ আরও আছে, ছবিটাকে যাতে আরও ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার মতো বুকে সাহস সঞ্চয় করতে পারি, নিজের বিক্ষিপ্ত কল্পনাশক্তিকে একত্রিত আর সংযত ও শান্ত রাখার মতো মানসিকতা তৈরি করতে পারি। হ্যাঁ, এরকম উদ্দেশ্য নিয়েই আমি অতর্কিতে চোখ দুটো বন্ধ করে নিশ্চল-নিথরভাবে কয়েক মুহূর্ত কাটিয়ে দিয়েও ছিলাম।
