ক্যাপ্টেন হার্ডি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীরবে আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আমি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে এবার বললাম–এত অল্পক্ষণের মধ্যে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে নাকি? বাক্সটার সঙ্গে নিজেকে বেঁধে নিয়ে সে যখন পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন কিন্তু আমার মনে খুবই
ক্ষীণ হলেও আশা ছিল শেষমেশ সে প্রাণে বেঁচে যাবে। কিন্তু উফ!
অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিকভাবেই ওরা পানিতেই বাক্সসহ তলিয়ে গেছেন। তবে বলা যেতে পারে খুবই দ্রুত কাজটা ঘটে গেছে।
‘উফ্! কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার!’
‘বাক্সটাসহ তিনি আবার ভেসে উঠবেন লবণগুলো গলে যাবার পর, তার আগে অবশ্যই নয়।
আমি চমকে উঠে বললাম–‘লবণ! কি বললেন, লবণ!
ক্যাপ্টেন নিজেকে সামলে নিয়ে মৃতলোকে স্ত্রী ও বোনকে দেখিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন–এখন ব্যাপারটা চেপে যান। পরে সুযোগ বুঝে এ প্রসঙ্গে কথা বলব।’ বহু কষ্ট ভোগ করলেও পিতৃদত্ত জীবনটা কোনোরকমে রক্ষা পেল। কিন্তু অদৃষ্ট আমাদের এবং বড় নৌকাটার আরোহীদের বিচ্ছিন্ন করে দিল।
শেষমেশ চার চারটি দিন নিরবচ্ছিন্ন অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে আমরা রনোক দ্বীপের বিপরীত দিকের তীরে আধমরা অবস্থায় নৌকা থেকে নামলাম। এই দ্বীপের তীরে আমাদের সাতদিন কাটাতে হল। উদ্ধারকারীরা আমাদের সঙ্গে কোনোরকম দুর্ব্যবহার করল না।
শেষপর্যন্ত আমরা যাতে নিউইয়র্কে পৌঁছাতে পারি সে ব্যবস্থাও হয়ে গেল। একদিন হঠাৎই ব্রডওয়েতে ক্যাপ্টেন হার্ডির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ইন্ডিপেন্ডেন্স’ জাহাজটা ধ্বংস হয়ে যাবার প্রায় একমাস পরের ঘটনা।
তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় প্রসঙ্গক্রমে জাহাজ-দুর্ঘটনার কথা, বিশেষ করে অদৃষ্টবিড়ম্বিত বন্ধুবর ওয়াটের দুর্ভাগ্যের প্রসঙ্গ উঠল।
ক্যাপ্টেন হার্ডির মুখেই তখন এ-কথাগুলো শোনালাম। আমার শিল্পী বন্ধু ওয়াট নিজের স্ত্রীর, দুবোন আর এক পরিচারকের জাহাজের টিকিট কেটেছিল। তাঁর স্ত্রী ছিল যথাযর্থই রূপসি আর গুণবতী। ১৪ জুন, অর্থাৎ যেদিন আমি প্রথম জাহাজে গিয়েছিলাম সেদিন মহিলাটি হঠাৎ রোগগ্রস্থ হয়ে পড়লেন। অল্প রোগভোগের পর হঠাই মারা যায়।
স্ত্রীর অকাল মৃত্যুতে যুবক স্বামী মি. ওয়াট শোকে-দুঃখে পাগলের মতো হয়ে পড়ল। ফলে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার নিউনিয়র্ক যাওয়ার বাধা পড়ল।
পত্নীহারা স্বামী ভাবল, তার প্রিয় পত্নীর মৃতদেহটাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কুসংস্কারবশত এ কাজটাকে প্রকাশ্যে করাও সম্ভব নয়, অন্য সবার দিক থেকে আপত্তি উঠবেই। এটা তো খুবই স্বাভাবিকই বটে, একটা মৃতদেহ জাহাজে থাকলে তার সঙ্গে যাত্রা করতে হবে, কথাটা প্রচার হয়ে গেলে দশভাগের নয়ভাগ যাত্রী জাহাজ ছেড়ে চম্পট দেবে।
এরকম একটা মহা সমস্যার সমাধান ক্যাপ্টেন হার্ডির মাথা দিয়েই বেরল। তিনি পরামর্শ দিলেন, মৃতদেহটার গায়ে প্রথমে গন্ধতেল মাখিয়ে দিতে হবে। তারপর বড়সড় একটা বাক্সে প্রচুর পরিমাণে লবণ দিয়ে তারপর মৃতদেহটাকে রেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিতে হবে। এবার বাক্সটাকে মালপত্রের মতো জাহাজে তুলে নিতে হবে। ব্যস, কারো মনেই কোনো সন্দেহ জাগবে না।
সবশেষে ক্যাপ্টেন হার্ডি আমার বন্ধুবর ওয়ার্টকে সতর্ক করে দিতে গিয়ে বললেন–‘খবরদার! আপনার স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ যেন ঘুণাক্ষরেও কেউই জানতে না পারে।
আর যেহেতু ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গিয়েছিল যে, আমার শিল্পী বন্ধুবর মি. ওয়াট তাঁর স্ত্রীরও একটা টিকিট কেটেছে। তাই তার স্ত্রী সেজে জাহাজে তাকে সঙ্গদান করতে পারে এমন একজন অবশ্যই জাহাজে যাবে। মৃতার পরিচারিকাকে প্রস্তাব দিতে সে সহজেই সম্মত হল।
প্রথমে যে শোবার ঘরটা পরিচারিকাটার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল, সেটা অবশেষে খালিই রাখতে হল। তবে রোজ রাতে সে পরিচারিকা মেয়েটা তার নকল স্ত্রী, স্ত্রীর অভিনয় করতে গিয়ে সে শোবার ঘরটাতেই শোয়। আর দিনে? দিনের বেলা পরিচারিকা মেয়েটা যথাসাধ্য তার মনিবাণির ভূমিকা পালন করে। অসুবিধার কিছু তো ছিল না। কারণ, জাহাজের অন্য কোনো যাত্রী তো আর তাকে চেনে না।
খুবই বেশি রকম অসর্তকতাই স্বাভাবিকভাবেই আমার ভুল হয়েছিল। আর অস্বাভাবিক আবেগপূর্ণ মনোভাব আর অতিরিক্ত কৌতূহলও আমার ভুলের জন্য কম দায়ী নয়। কিন্তু বর্তমানে আমি খুব কম রাতেই ঘুমোতে পারি। কিছুতেই চোখের পাতাগুলো এক করতে পারি না। একটা মুখ প্রতি মুহূর্তেই আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আর ভৌতিক একটা হাসি সর্বক্ষণ আমার কানে বাজে, চিরদিন একই রকমভাবে বাজবে, চিরদিনই।
দ্য ওভাল পর্ট্রেইট
আমার খানসামার একান্ত ইচ্ছা একটা রাত আমি মুক্ত বাতাসের মধ্যে কাটিয়ে শরীর ও মনটাকে একটু চাঙা করে নেই। এরকম চিন্তা করে সে ধরতে গেলে জোর করেই সে আমাকে নিয়ে সে পল্লী ভবনটায় তোলে সেটা বহুদিন যাবই অ্যাপেলাইন পর্বতমালার ফাঁক ফোকড়ে অবস্থিত, বিষণ্ণতা আর জাঁকজমকের মিশ্রণে গড়ে ওঠা বহু বস্তির মধ্যে সবচেয়ে সেরা।
বাড়িটার পরিস্থিতি এক নজরে দেখে অনায়াসেই অনুমান করে নেওয়া যায় সে, দিন-কয়েক আগেই সেটা কয়েকের দিনের জন্য অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলে যা-কিছু চোখে পড়া সম্ভব, সে রকম তেমন কিছু নজরে পড়ল না।
